টিকটক কবিরাজের মরণকামড়: মা-বাবার ভালোবাসা পেতে গিয়ে ২৭ ভরি স্বর্ণ হারালো কিশোরী

টিকটক কবিরাজ প্রতারণা

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টিকটকের মোহ আর অন্ধবিশ্বাসের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক ভয়ংকর প্রতারণার শিকার হয়েছে ১২ বছরের এক কিশোরী। মা-বাবার ভালোবাসা পাওয়ার প্রবল আকুতিকে পুঁজি করে এক ভণ্ড কবিরাজ চক্র হাতিয়ে নিয়েছে প্রায় ২৭ ভরি স্বর্ণালংকার এবং কয়েক লক্ষ নগদ টাকা। সম্প্রতি পিবিআই (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) এই চক্রের মূল হোতাসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করার পর বেরিয়ে এসেছে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য।

ঘটনার প্রেক্ষাপট: আবেগের সুযোগ নিয়ে প্রতারণা

শেরপুরের জনৈক কাপড় ব্যবসায়ীর মেয়ে লুবানা (১২), যে স্থানীয় সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। বয়সের কারণেই হোক বা অন্য কোনো মানসিক চাপে, লুবানার মনে দীর্ঘদিনের এক ভুল ধারণা জন্মায়—তার মা-বাবা তাকে ছোট ভাই-বোনদের তুলনায় কম ভালোবাসেন। এই মানসিক একাকীত্ব থেকে মুক্তি পেতে সে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসক্ত হয়ে পড়ে এবং টিকটকে ‘খুরশেদ কবিরাজ’ নামের এক তান্ত্রিকের প্রোফাইল খুঁজে পায়।

যেভাবে চলতো ভণ্ডামির কারবার

ভণ্ড কবিরাজ নিজেকে অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী দাবি করে লুবানাকে আশ্বস্ত করে যে, কিছু বিশেষ ‘তদবির’ বা ঝাড়ফুঁকের মাধ্যমে সে তার মা-বাবার পূর্ণ ভালোবাসা ফিরিয়ে দিতে পারবে। ইমো অ্যাপের মাধ্যমে কিশোরীর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে কৌশলে একের পর এক টাকা দাবি করতে থাকে চক্রটি।

বিকাশের মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে পূজা বা কবিরাজি সামগ্রী—যেমন খাসি, চন্দন কাঠ, জায়নামাজ ও আগরবাতি কেনার অজুহাতে প্রথম দফায় লুবানার কাছ থেকে ২ লাখ ৪৩ হাজার ১৫০ টাকা হাতিয়ে নেয় প্রতারক চক্রটি। এরপরও লুবানার মনে মা-বাবার ভালোবাসা প্রাপ্তির নিশ্চয়তা না আসায়, চক্রটি আরও বড়সড় চাল চালে। গত ১০ই মার্চ তারা কৌশলে লুবানাকে প্রলুব্ধ করে বাড়ি থেকে ২৭ ভরি স্বর্ণালংকার এবং আরও ১ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়।

পর্দা ফাঁস ও পুলিশের তৎপরতা

প্রতারণার এখানেই শেষ ছিল না। সর্বশেষ ঝাড়ফুঁকের বাহানায় আরও ১ লাখ টাকা দাবি করা হলে লুবানা বিকাশের দোকানে যায়। একজন কিশোরীর এত বিশাল অংকের টাকা লেনদেনের বিষয়টি দোকানদারের সন্দেহ জাগায়। তিনি তাৎক্ষণিক লুবানার বাবাকে বিষয়টি অবহিত করলে পুরো ঘটনাটি প্রকাশ পায়।

পরবর্তীতে লুবানার বাবা শেরপুর সদর থানায় মামলা করলে তদন্তভার গ্রহণ করে জামালপুর পিবিআই। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় পিবিআই গাজীপুর থেকে মুছা মিয়া ও রফিকুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে। তাদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী ময়মনসিংহের মাসকান্দা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় এই চক্রের মূল হোতা মনির হোসেনকে।

উদ্ধারকৃত মালামাল ও আইনি ব্যবস্থা

পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার পঙ্কজ দত্ত জানান, গ্রেপ্তারের পর মনির হোসেনের বাড়ির পাশের বাগান থেকে মাটি খুঁড়ে ২৫ ভরি ৯ আনা ৪ রতি স্বর্ণালংকার উদ্ধার করা হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৬৪ লাখ টাকা। এছাড়া প্রতারণায় ব্যবহৃত ৫টি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে। এই ঘটনাটি বর্তমানে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে এবং সাইবার জগতে কিশোর-কিশোরীদের নিরাপত্তার বিষয়টি আবারও সামনে এনেছে।

আরও পড়ুন: মধ্যপ্রাচ্য সংকট: ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের সাম্প্রতিক আপডেট

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top