যুদ্ধের দামামা, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার শিকল আর চলমান অর্থনৈতিক সংকটের ত্রিমুখী চাপে ইরানের সাধারণ মানুষের জীবন এখন অসহনীয় কঠিন হয়ে উঠেছে। দেশটিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে শুরু করে প্রযুক্তি পণ্য পর্যন্ত সবকিছুর দাম হু হু করে বাড়ছে। এরই মধ্যে বাজারে আলোচনার ঝড় তুলেছে অ্যাপলের সর্বশেষ স্মার্টফোন — আইফোন ১৭ প্রো ম্যাক্স-এর আকাশছোঁয়া মূল্য। আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের কিছু দোকানে এই ফোনটির দাম উঠেছে প্রায় ৫০০ কোটি ইরানি রিয়াল, যা মার্কিন ডলারে রূপান্তর করলে দাঁড়ায় প্রায় ২,৭৫০ ডলার।
মার্কিন দামের দ্বিগুণেরও বেশি দামে বিকোচ্ছে আইফোন ১৭ প্রো ম্যাক্স
অ্যাপলের আইফোন ১৭ প্রো ম্যাক্স (২৫৬ জিবি) মডেলটি যুক্তরাষ্ট্রে আনুষ্ঠানিকভাবে বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১,২০০ ডলারে। অথচ সেই একই ফোন ইরানের বাজারে পৌঁছাতে পৌঁছাতে তার দাম বেড়ে হয়ে যাচ্ছে প্রায় ৫০০ কোটি রিয়াল, যা প্রায় ২,৭৫০ ডলারের সমতুল্য। অর্থাৎ মূল দামের তুলনায় ইরানে এই ফোনের দাম প্রায় ১৩০% বেশি।
এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির মূল কারণ হলো আমেরিকার দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা। ইরানে অ্যাপলের কোনো অফিসিয়াল পরিবেশক নেই, ফলে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে পণ্য আনতে হয়, যেখানে প্রতিটি স্তরে যোগ হয় বাড়তি খরচ ও ঝুঁকি। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে মুদ্রামান পতন এবং আমদানি জটিলতা।
ইতিহাসের সর্বনিম্নে ইরানি রিয়াল
ইরানের মুদ্রা ‘রিয়াল’ বর্তমানে তার ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ১ মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের মান প্রায় ১৮ লাখ ৪০ হাজার রিয়াল পর্যন্ত নেমে এসেছে — যা কয়েক বছর আগেও ছিল কল্পনার বাইরে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মুদ্রামান পতনের পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ:
- দীর্ঘমেয়াদী মার্কিন নিষেধাজ্ঞা: ইরানের ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত বৈশ্বিক লেনদেন ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন।
- আঞ্চলিক যুদ্ধ পরিস্থিতি: মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।
- বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট: রপ্তানি আয় কমে যাওয়ায় দেশটির ডলার মজুদ দ্রুত কমছে।
- সরকারি অব্যবস্থাপনা: আর্থিক নীতি প্রণয়নে দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করছে।
শুধু প্রযুক্তি নয়, সব পণ্যেই আগুনের দাম
ইরানের বাজারে শুধু ইলেকট্রনিক পণ্যের দামই বাড়েনি, বরং পরিস্থিতি আরও ব্যাপক। খাদ্য, ওষুধ, গাড়ি এবং পেট্রোকেমিক্যাল পণ্যেও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে।
খাদ্য ও ওষুধ: আমদানি নির্ভর অনেক ওষুধ এখন দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে কয়েক গুণ। দরিদ্র পরিবারগুলো তিনবেলা সুষম খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খাচ্ছে।
গাড়ি: দেশীয় গাড়ি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় এবং আমদানি গাড়ির সরবরাহ কমে যাওয়ায় যানবাহনের মূল্য লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে গেছে নিজস্ব গাড়ির স্বপ্ন।
ইলেকট্রনিকস: আইফোনের পাশাপাশি ল্যাপটপ, ট্যাবলেট ও অন্যান্য স্মার্টডিভাইসের দামও বেড়েছে অস্বাভাবিকভাবে।
কর্মসংস্থান সংকট: ছাঁটাইয়ের ঢেউ থামছে না
অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের প্রভাব পড়েছে শ্রমবাজারেও। ইরানের বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি কোম্পানি ও ইস্পাত কারখানাগুলো একের পর এক কর্মী ছাঁটাই করছে অথবা উৎপাদন কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে।
কর্মসংস্থান সংকটের ফলে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে হতাশা ও বেকারত্ব বাড়ছে। অনেক মেধাবী তরুণ দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে, যা ইরানে “মস্তিষ্ক পাচার” বা Brain Drain-এর সমস্যাকে আরও তীব্র করছে। উচ্চশিক্ষিত পেশাদারদের এই দেশত্যাগ দীর্ঘমেয়াদে দেশের উন্নয়ন সক্ষমতাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
ইন্টারনেট শাটডাউন: সংকটের মধ্যে আরেক সংকট
পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে ইরান সরকার বারবার ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে, যা ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগে নতুন বিপদ ডেকে এনেছে। ডিজিটাল অর্থনীতির উপর নির্ভরশীল ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অনলাইন ব্যবসা বন্ধ, ফ্রিল্যান্সিং কাজে বিঘ্ন এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগে প্রতিবন্ধকতা সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে স্থবির করে দিচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের পক্ষ থেকে ইন্টারনেট বন্ধ রাখার এই সিদ্ধান্ত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাধারণ মানুষের জীবন: আয়-ব্যয়ের মধ্যে পাহাড়সম ব্যবধান
আল-জাজিরার প্রতিবেদনে সাক্ষাৎকার দেওয়া স্থানীয়রা জানিয়েছেন, তাদের মাসিক আয় যেটুকু বাড়ছে, তার চেয়ে অনেক দ্রুত গতিতে বাড়ছে জীবনযাত্রার খরচ। বেতন হয়তো বছরে ২০-৩০% বেড়েছে, কিন্তু মূল্যস্ফীতি তার চেয়ে বহুগুণ বেশি। ফলে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমছে প্রতিদিন।
অনেক পরিবার এখন বিলাসবহুল পণ্য তো দূরের কথা, মৌলিক চাহিদা মেটাতেও সঞ্চয় ভাঙতে বাধ্য হচ্ছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণি নিম্নবিত্তে পরিণত হচ্ছে, আর যারা আগে থেকেই দরিদ্র ছিল, তাদের অবস্থা আরও শোচনীয় হয়ে পড়েছে।
ভবিষ্যৎ কী?
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই অর্থনৈতিক সংকট থেকে মুক্তি পেতে হলে দরকার আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানো এবং দেশীয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় আমূল সংস্কার। তবে বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই সম্ভাবনা কতটুকু বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
ইরানের মানুষ আজ যে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি, আইফোন ১৭ প্রো ম্যাক্সের ৫০০ কোটি রিয়ালের দাম সেই বাস্তবতারই একটি প্রতীকী প্রতিফলন মাত্র। এটি নিছক একটি ফোনের মূল্যতালিকা নয় — এটি একটি জাতির আর্থিক যন্ত্রণার জীবন্ত দলিল।
আরও পড়ুন: ২০২৬ সালের সেরা ৬ স্মার্টফোন: কোনটি আপনার জন্য সঠিক?

