মদনে মাদ্রাসাছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ: পলাতক শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগর অবশেষে গ্রেপ্তার

মাদ্রাসা শিক্ষক গ্রেপ্তার ধর্ষণ নেত্রকোণা

নেত্রকোণার মদন উপজেলায় এক নির্মম ঘটনা সমগ্র দেশকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। মাত্র ১১ বছর বয়সী একটি মাদ্রাসাছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত মাদ্রাসা শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগরকে অবশেষে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। দীর্ঘ তল্লাশি অভিযানের পর গত মঙ্গলবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে র‍্যাব-১৪ এর একটি বিশেষ দল ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।

বুধবার সকালে মদন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তরিকুল ইসলাম গ্রেপ্তারের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেন। র‍্যাব-১৪ এর মিডিয়া বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কোম্পানি কমান্ডার ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সামসুজ্জামান জানান, গ্রেপ্তারের বিষয়ে বুধবার দুপুর ১২টায় ময়মনসিংহের আকুয়া বাইপাস এলাকায় র‍্যাব ব্যাটালিয়ন সদরে একটি প্রেসব্রিফিং আয়োজন করা হয়।

কে এই আমান উল্লাহ সাগর?

অভিযুক্ত শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগর নেত্রকোণার মদন উপজেলার কাইটাইল ইউনিয়নের পাছহাট গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা। তিনি প্রায় চার বছর আগে এলাকায় একটি মহিলা কওমি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেই প্রতিষ্ঠানেই শিক্ষকতার আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিলেন। স্থানীয়রা তাকে একজন ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে চিনত, যা পরবর্তীকালে ওই শিশুর পরিবারের জন্য বিশ্বাস স্থাপনে সহায়ক হয়েছিল।

যেভাবে ঘটেছিল নির্মম এই ঘটনা

ভুক্তভোগী শিশুটির মায়ের বয়ানে উঠে আসা ঘটনার বিবরণ অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। শিশুটির বাবা পরিবার ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার কারণে তার মা জীবিকার সন্ধানে সিলেটে একটি বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ নেন। মেয়েকে রেখে যান নানার বাড়িতে, যেখান থেকে সে ওই মাদ্রাসায় লেখাপড়া করত।

শিশুটির মা বলেন, গত বছরের ২ নভেম্বর বিকেলে মাদ্রাসা ছুটির পর ওই শিক্ষক মেয়েটিকে মাদ্রাসা-সংলগ্ন মসজিদ ঝাড়ু দেওয়ার নির্দেশ দেন। ওই সময় অন্যান্য শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বাড়ি চলে যাওয়ার সুযোগে নিঃসঙ্গ পরিবেশ তৈরি করা হয়। ঝাড়ু শেষ হলে শিশুটিকে তার নিজের কক্ষে ডেকে ভয়ভীতি দেখিয়ে ধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পর শিশুটির শরীরে অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় এবং সে অসুস্থ বোধ করতে শুরু করে। খবর পেয়ে মা সিলেট থেকে ছুটে এলে মেয়ে তাকে পুরো ঘটনা খুলে বলে। গত ১৮ এপ্রিল মদন উপজেলার একটি ক্লিনিকে চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হলে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া যায় যে শিশুটি সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা — যে তথ্য সমগ্র সমাজকে হতবাক করে দেয়।

মামলা ও গ্রেপ্তার অভিযান

চিকিৎসকের নিশ্চিতকরণের পরেই শিশুটির মা বাদী হয়ে মদন থানায় আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করেন। মামলা রুজুর পর থেকেই পুলিশ ও র‍্যাব যৌথভাবে অভিযুক্ত শিক্ষককে গ্রেপ্তারে তৎপর হয়ে ওঠে। তবে আসামি দ্রুত এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যায়।

এই সুযোগে অভিযুক্ত শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগর অজ্ঞাত স্থান থেকে ফেসবুক লাইভে এসে নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে বক্তব্য দেন। মঙ্গলবার সকাল থেকে ওই ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে জনমনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। শেষ পর্যন্ত মঙ্গলবার রাত তিনটার দিকে গৌরীপুর থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়।

শিশু সুরক্ষায় বাড়তি সতর্কতার আহ্বান

এই ঘটনা আবারও দেশের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে সামনে এনেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যথাযথ তদারকির অভাব এবং অভিভাবকদের সচেতনতার ঘাটতি এ ধরনের ঘটনার পথ তৈরি করে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি উঠেছে, মাদ্রাসাসহ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষা নীতি কার্যকর করতে হবে এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।

এই মামলার দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের জঘন্য অপরাধ কেউ সংঘটিত করার সাহস না পায়।

আরও পড়ুন: ভারতে চলন্ত ট্রেনে নির্যাতনের পর ইমামকে ধাক্কা দিয়ে হত্যা — উত্তরপ্রদেশে চাঞ্চল্যকর ঘটনা

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top