তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় রচিত হচ্ছে। বলিউড-কলিউডের গণ্ডি পেরিয়ে লক্ষ কোটি মানুষের হৃদয়ে যিনি রাজত্ব করেছেন বছরের পর বছর, সেই থালাপতি বিজয় এবার রাজনীতির মঞ্চেও প্রমাণ করলেন — জনতার ভালোবাসা শুধু রুপোলি পর্দায় আটকে থাকে না। মাত্র দুই বছরের রাজনৈতিক পথচলায় তাঁর গড়া দল তামিলাগা ভেত্রি কাজাগাম (টিভিকে) তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। এই অভূতপূর্ব সাফল্যে কেঁদে-হেসে একাকার হয়েছেন বিজয়ের বাবা-মা।
বাবার চোখে ছেলের ৩০ বছরের স্বপ্নপূরণ
প্রখ্যাত তামিল চলচ্চিত্র নির্মাতা এস এ চন্দ্রশেখর — যিনি একই সঙ্গে বিজয়ের বাবা ও প্রথম পরিচালক — এই ঐতিহাসিক ফলাফলে রীতিমতো আবেগে ভেসে গেছেন। তাঁর কথায় পরিষ্কার, এই সাফল্য কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘ প্রস্তুতি ও নিরন্তর সংকল্পের ফসল।
চন্দ্রশেখর বলেন, “একজন মানুষ কেবল তখনই মহান হতে পারেন, যখন তাঁর ভেতরে শুধু নিজের জন্য নয় — সমাজের জন্য কিছু করার তীব্র ইচ্ছা জন্মায়। বিজয়ের মধ্যে সেই আগুন ছিল বহু বছর ধরেই। গত তিন দশক ধরে ওর মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরত — তামিলনাড়ুর মানুষের জন্য সরাসরি কিছু করা যায় কি না?”
সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই বিজয় ২০২৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে পদার্পণ করেন এবং তামিলাগা ভেত্রি কাজাগাম প্রতিষ্ঠা করেন। আর আজ সেই পথচলাই তাঁকে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রীর আসনের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।
একক লড়াইয়ের ‘ঐতিহাসিক’ সিদ্ধান্ত — যা সবাইকে চমকে দিয়েছিল
তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে জোটের সংস্কৃতি বহু পুরনো। ডিএমকে, এআইএডিএমকে-সহ প্রায় সব বড় দলই জোট বেঁধে লড়াই করে। এই প্রেক্ষাপটে বিজয়ের একাই লড়ার ঘোষণাটি অনেকের কাছে রীতিমতো রাজনৈতিক আত্মহত্যার মতো মনে হয়েছিল। কিন্তু চন্দ্রশেখর সেদিনও বিশ্বাস রেখেছিলেন ছেলের বিচক্ষণতায়।
তিনি জানান, “দল গঠনের প্রথম দিন থেকেই বিজয় ঘোষণা করেছিলেন — কোনো জোট নয়, কোনো আপোষ নয়। নিজের শক্তিতে, নিজের মানুষের ভরসায় লড়বেন। অনেকে সন্দেহ করেছিলেন, অনেকে হাসিও করেছিলেন। কিন্তু বিজয় জানত, তার শক্তি কোথায়। আজ সেই সাহসী সিদ্ধান্তের ফলই মানুষ দেখছে।”
২৩৪ আসনের তামিলনাড়ু বিধানসভায় সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ন্যূনতম ১১৮ আসন। টিভিকে ইতিমধ্যে প্রায় ১০৮টি আসনে জয় নিশ্চিত করেছে এবং আরও একাধিক কেন্দ্রে এগিয়ে রয়েছে। একক বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করায় ছোট দলগুলোর সমর্থনে সরকার গঠনের সম্ভাবনা এখন প্রায় নিশ্চিত।
মানুষের আবেগই বিজয়ের আসল পুঁজি
বিজয় কেন এত জনপ্রিয়? শুধু কি তাঁর চলচ্চিত্রের কারণে? নাকি এর পেছনে আরও গভীর কোনো সংযোগ আছে? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে চন্দ্রশেখর যা বললেন, তা সত্যিই ভাবনার খোরাক দেয়।
তাঁর ভাষায়, “তামিলনাড়ুর মানুষ বিজয়কে শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে দেখেন না। কেউ ওকে নিজের ছেলের মতো ভালোবাসেন, কেউ ছোট ভাইয়ের মতো আগলে রাখেন, আবার বয়স্ক মানুষেরা নাতির মতো স্নেহ করেন। এই বহুমাত্রিক আবেগের বন্ধনই ওকে সাধারণ মানুষের এত কাছের করে তুলেছে।”
এই আবেগময় সংযোগই যে নির্বাচনের ফলাফলে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে — সেটা আজ ফলাফলের সংখ্যায় স্পষ্ট।
পরিশ্রম, শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্ব — সাফল্যের তিন স্তম্ভ
চলচ্চিত্র জগতে বিজয়ের দীর্ঘ ক্যারিয়ার সম্পর্কে বাবা চন্দ্রশেখর বলেন, তামিল ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে যাঁরাই বিজয়ের সঙ্গে কাজ করেছেন, তাঁদের কেউই তাঁর সময়নিষ্ঠা বা কাজের প্রতি নিষ্ঠা নিয়ে একটিও অভিযোগ করতে পারবেন না। এই একই শৃঙ্খলা তিনি রাজনীতিতেও বজায় রেখেছেন।
দল গঠনের পর মাত্র দুই বছরেই তামিলনাড়ুর কোণে কোণে টিভিকের সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলা — এটি কম কথা নয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও মানছেন, এই সংগঠন-দক্ষতা বিজয়ের টিমওয়ার্ক ও পরিকল্পনার প্রমাণ।
মায়ের চোখে ছেলে — প্রথম ভক্ত থেকে গর্বিত মা
বিজয়ের মা শোভা চন্দ্রশেখর সবসময়ই ছেলের সবচেয়ে কাছের মানুষ। পরিবারের সূত্রে জানা গেছে, তিনি কেবল মা নন — বিজয়ের জীবনের প্রথম ও সবচেয়ে বিশ্বস্ত ভক্তও। ছেলের প্রতিটি সিনেমা, প্রতিটি সাফল্য, প্রতিটি সংকটে তিনি সবচেয়ে আগে পাশে থেকেছেন। আজ ছেলে যখন তামিলনাড়ুর ক্ষমতার শীর্ষে, তখন তাঁর আনন্দ ভাষায় প্রকাশের বাইরে।
পরিবারের অন্য সদস্যরাও বিজয়ের নেতৃত্বে রাজ্যে ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রত্যাশায় উদ্বেলিত। তাঁরা মনে করেন, বিজয় মুখ্যমন্ত্রী হলে তামিলনাড়ু একটি নতুন প্রশাসনিক দিগন্ত দেখবে।
দ্রাবিড় রাজনীতির সমীকরণ বদলে দিচ্ছেন বিজয়
তামিলনাড়ুর রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে ডিএমকে ও এআইএডিএমকে-র দ্বন্দ্বে আবর্তিত। কিন্তু এবারের ফলাফল স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে — সেই দ্বিদলীয় আধিপত্যের যুগ হয়তো শেষের মুখে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিজয় এখন সেই বিরল তালিকায় জায়গা করে নিচ্ছেন — যেখানে রয়েছেন অন্ধ্র প্রদেশের কিংবদন্তি এন টি রামা রাও, তামিলনাড়ুর চলচ্চিত্র-রাজনীতির পথিকৃৎ এম জি রামাচন্দ্র এবং অদম্য জে ললিতা। তারকা থেকে শাসক — এই রূপান্তরের গল্পটি দক্ষিণ ভারতীয় রাজনীতিতে নতুন নয়, কিন্তু বিজয়ের ক্ষেত্রে এর গতি ও মাত্রা সত্যিই অসাধারণ।
প্রথমবার নির্বাচনে অংশ নিয়েই টিভিকে-র এই ফলাফল প্রমাণ করেছে — চলচ্চিত্রের পর্দায় অর্জিত জনপ্রিয়তা, যদি সঠিক পরিকল্পনা ও সততার সঙ্গে রাজনীতিতে রূপান্তরিত হয়, তাহলে তা অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে।
‘এটা শুরু, শেষ নয়’ — বাবার চোখে ছেলের ভবিষ্যৎ
ছেলের এই ঐতিহাসিক সাফল্য প্রসঙ্গে চন্দ্রশেখর বলেন, “আজ বিজয় যে উচ্চতায় দাঁড়িয়েছে, সেটা কোনো গন্তব্য নয় — এটা একটি নতুন যাত্রার সূচনা। মুখ্যমন্ত্রী হওয়া মানে দায়িত্ব শেষ নয়, বরং আসল পরীক্ষাটা তখনই শুরু হয়। তামিলনাড়ুর কোটি মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে হবে — এটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।”
থালাপতি বিজয়ের রাজনৈতিক উত্থান তামিলনাড়ুর ইতিহাসে একটি মাইলফলক। একটি নতুন প্রজন্মের তরুণরা যে রাজনীতিতে আগ্রহী হচ্ছে, সেই পরিবর্তনের পেছনে বিজয়ের অবদান অনস্বীকার্য। পর্দার নায়ক থেকে জনতার নেতা — এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার গল্পটি এখন পাঠ্যপুস্তকে জায়গা পাওয়ার যোগ্য।


