বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলমান প্রশাসনিক অস্থিরতা এবার চরম রূপ নিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) অধ্যাপক মোহাম্মদ তৌফিক আলমকে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছেন আন্দোলনরত শিক্ষকরা। একইসঙ্গে সমস্ত একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রেখে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ ঘোষণা করা হয়েছে, যা সোমবার (১১ মে) থেকে কার্যকর হয়েছে।
রোববার (১০ মে) বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষকদের এক জরুরি সভায় এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সভার সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করেছেন কোস্টাল স্টাডিজ অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হাফিজ আশরাফুল হক।
সিন্ডিকেট সভায় ‘একক সিদ্ধান্ত চাপানো’র অভিযোগ
শিক্ষকদের দাবি, চলমান সংকট নিরসনে গত ৩০ এপ্রিল ভিসি, সিন্ডিকেট সদস্য, বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার ও ডিনদের অংশগ্রহণে একটি ত্রিপক্ষীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই সভায় পরবর্তী সিন্ডিকেট সভায় বিদ্যমান আইন ও নীতিমালা মেনে সংকট সমাধানের সুস্পষ্ট আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, ভিসি অধ্যাপক তৌফিক আলম শুক্রবার রাত ১০টায় হঠাৎ করে নোটিস পাঠিয়ে শনিবার সকাল ১১টায় এজেন্ডাবিহীন জরুরি সিন্ডিকেট সভা আহ্বান করেন। শিক্ষকদের অভিযোগ, ওই সভায় অধিকাংশ সদস্যের মতামতকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ শিক্ষকরা রোববার সাধারণ সভায় মিলিত হয়ে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করতে বাধ্য হন।
শিক্ষকদের পক্ষ থেকে দেওয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট করা হয়েছে, সিন্ডিকেট সভায় কোনো কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত না আসায় এই কর্মসূচি ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিল না।
প্রশাসনিক পদ থেকে দুই শিক্ষকের পদত্যাগ
এই অচলাবস্থার মাঝে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও সিন্ডিকেট সদস্য পদ থেকে দুইজন শিক্ষক পদত্যাগ করেছেন। তারা হলেন—
- মো. রাহাত হোসাইন ফয়সাল — কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক (প্রক্টর পদ থেকে পদত্যাগ)
- মুহাম্মাদ তানভীর কায়ছার — ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক (সিন্ডিকেট সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ)
পদত্যাগ প্রসঙ্গে প্রক্টর রাহাত হোসাইন ফয়সাল বলেন, “এই পদে থেকে কাজ করেও কোনো ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না। ভিসির কার্যক্রমে আমরা সবাই গভীরভাবে হতাশ। বারবার অনুরোধ করার পরও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে দায়িত্বে থাকার আর কোনো অর্থ নেই, তাই পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছি।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মো. হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, প্রক্টরের লিখিত পদত্যাগপত্র ইতোমধ্যে পাওয়া গেছে এবং তা ভিসির কাছে পাঠানো হয়েছে। তবে সিন্ডিকেট সদস্য তানভীর কায়ছারের পদত্যাগের বিষয়টি মৌখিকভাবে জানা গেলেও এখনো লিখিত পদত্যাগপত্র হাতে পৌঁছায়নি।
ভিসির ব্যাখ্যা ও দাবি
ভিসি অধ্যাপক মোহাম্মদ তৌফিক আলম বিষয়টি ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তানভীর কায়ছারের পদত্যাগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ এবং চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাচ্ছেন বলে সাময়িকভাবে পদত্যাগ করেছেন। চিকিৎসা শেষে ফিরে এলে পুনরায় দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।”
শনিবারের সিন্ডিকেট সভা প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে আগামী দুই মাসের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবিধি প্রণয়ন করে শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের পদোন্নতির বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হবে। ভিসি প্রশ্ন তোলেন, এই সিদ্ধান্তের পরও কেন এই ধরনের কর্মসূচি দেওয়া হলো।
পদোন্নতিজনিত দীর্ঘ বঞ্চনাই মূল ক্ষোভের কারণ
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জানান, এই সংকটের মূলে রয়েছে পদোন্নতি নিয়ে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও ইচ্ছাকৃত বিলম্ব। বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী কোনো শিক্ষক পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জনের পর ৪৫ দিনের মধ্যে আপগ্রেডেশন বোর্ডের সভা আহ্বান করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু প্রশাসন বারবার সেই বিধান লঙ্ঘন করেছে।
দীর্ঘ টালবাহানার পর ২০২৫ সালের অক্টোবরে সহযোগী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক পদে পদোন্নতির বোর্ড সভা শুরু হলেও অনুমোদনের জন্য সিন্ডিকেট সভা আহ্বানে অকারণে বিলম্ব করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষকরা। এছাড়া সহকারী অধ্যাপক থেকে সহযোগী অধ্যাপক পদে উন্নীত করার জন্য বোর্ড সভাই আয়োজন করা হয়নি, যা শিক্ষকদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম দিয়েছে।
শিক্ষার্থীরা পড়লেন বিপাকে
‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির ফলে সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ক্লাস, পরীক্ষা ও সব ধরনের একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় হাজার হাজার শিক্ষার্থীর পড়াশোনা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। দ্রুত এই সংকটের সমাধান না হলে শিক্ষা কার্যক্রমে দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সার্বিক পরিস্থিতিতে উচ্চ শিক্ষা সংশ্লিষ্ট মহল এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা।
আরও পড়ুন: অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডারে যুগান্তকারী পরিবর্তন: এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা এখন থেকে ডিসেম্বরেই!



