টাকা-পয়সা সব সুখ দিতে পারে—এ কথা অনেকেই বলবেন। অনেকের কাছেই টাকাই যেন সবকিছু। প্রচলিত একটি কথা আছে, “টাকা হলে বাঘের চোখও মেলে।” কিন্তু একটু চিন্তা করে দেখুন তো—আদতে বাঘের চোখের কী প্রয়োজন আমাদের? সত্যিকার অর্থে বাঘের চোখের আমাদের জীবনে কোনো মূল্য নেই।
সুতরাং টাকাকে এমন একটি জিনিসের সঙ্গে তুলনা করে তার মূল্য বাড়ানো হচ্ছে, যার বাস্তবে আমাদের কোনো প্রয়োজন নেই। অথচ সেই বাঘের চোখের উদাহরণ দিয়ে টাকাকে সবচেয়ে উঁচু স্থানে বসানো হয়েছে। কিন্তু একটা কথা মনে রাখবেন—একসময় টাকা ছিল না, তখনও সমাজব্যবস্থা চলেছে। এখন টাকা আছে, এখনও সমাজব্যবস্থা চলছে। ভবিষ্যতে টাকার বর্তমান রূপ হয়তো থাকবে না; হয়তো ভার্চুয়াল বা অন্য কোনো মাধ্যমে লেনদেন হবে। তবুও মানুষের সমাজ কোনো না কোনোভাবে চলবে।
টাকা সব সুখ দিতে পারে না
আমি এক লাইনে আপনাকে বলতে চাই—টাকা সব সুখ দিতে পারে না।
যদি টাকা দিয়েই জীবনের সব সুখ কেনা সম্ভব হতো, তাহলে অর্থবান মানুষের জীবনে কখনো হতাশা থাকত না। ধনী মানুষের জীবনেও মানসিক কষ্ট, একাকিত্ব, সম্পর্কের টানাপোড়েন কিংবা হতাশা দেখা যেত না। কিন্তু বাস্তবতা আমাদের ভিন্ন কথাই বলে। মানুষের জীবনের অনেক সমস্যার সমাধান টাকা দিয়ে করা সম্ভব হলেও সব সমস্যার সমাধান টাকা দিয়ে করা যায় না।
এর মানে এই নয় যে টাকা অপ্রয়োজনীয়। বরং বাস্তব জীবনে টাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খাবার, চিকিৎসা, বাসস্থান, শিক্ষা, পোশাক, যাতায়াতসহ জীবনের অসংখ্য প্রয়োজন মেটাতে টাকার প্রয়োজন হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয়তা আর সর্বোচ্চ সুখ—এই দুটি বিষয় এক নয়।
বস্তুগত সুখ অনেকটাই টাকা দিয়ে কেনা যায়
পৃথিবীর বস্তুগত অনেক সুখ টাকা দিয়ে কেনা সম্ভব। যেমন—বিলাসবহুল গাড়ি, সুন্দর বাড়ি, অলংকার, জমি-জায়গা, দামি পোশাক, ভ্রমণসহ আরও অনেক কিছু।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, একজন মানুষের সব সুখ কি এসব জিনিসের ওপর নির্ভর করে?
উত্তর হলো—কখনোই না।
সব সুখ যদি এসব বস্তু বা সম্পদের ওপর নির্ভর করত, তাহলে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী মানুষগুলোর প্রত্যেকেই হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ হতেন। কিন্তু বাস্তবে সম্পদ থাকা আর মানসিকভাবে সুখী থাকা এক বিষয় নয়। আমার এই কথাটি কোনো ব্যক্তিকে বিচার করার জন্য নয়; বরং মানুষের জীবনের সাধারণ বাস্তবতা থেকেই বলছি।
সুখ আসলে কোথায়?
একজন মানুষ কীভাবে সুখে থাকে জানেন?
এর উত্তর হিসেবে বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন কথা বলবেন। যার যেমন অভিজ্ঞতা, যার জীবনে যেটা গুরুত্বপূর্ণ, সে হয়তো সেভাবেই সুখের সংজ্ঞা দেবে। তবে আমার কাছে একজন মানুষের সুখী থাকার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ আছে।
মানুষ সুখী থাকে যদি তার অপ্রয়োজনীয় ঋণের বোঝা না থাকে, যদি সে অল্পে তুষ্ট হতে পারে, যদি তার জীবনে চরম আর্থিক অনটন না থাকে এবং তার মন ও শরীর স্বাভাবিক থাকে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি বলা হয়নি। সেটি হলো—আল্লাহর প্রতি ঈমান, সৎ আমল এবং মানুষের প্রতি ভালো আচরণ।
যে মানুষ ছোটদের স্নেহ করে, বড়দের সম্মান করে, মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ায়, অন্যের ক্ষতি করতে চায় না এবং আল্লাহর ওপর বিশ্বাস ও ভরসা রাখে—আমার কাছে প্রকৃত সুখের পথ অনেকটাই তার মধ্যেই নিহিত।
বর্তমান সমাজে সুখের সবচেয়ে বড় সংকট
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন অনেক মানুষ মিথ্যাকে নিজের সঙ্গী ও পুঁজি করে নিয়েছে। কোথাও কোথাও একটি মামলা বছরের পর বছর চলতে থাকে, অথচ মানুষ ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় থাকে। আদালত মানুষের ন্যায়বিচারের আশ্রয়স্থল, কিন্তু বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ হলে সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়ে।
আবার এমনও দেখা যায়, মানুষ বিপদে পড়লে তাকে সহযোগিতা করার চেয়ে তার দুর্বলতার সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে কেউ কেউ। অথচ একজন মানুষ যখন সত্যিকার অর্থে কষ্টে থাকে, তখন তার প্রয়োজন হয় এমন একজন মানুষের, যে তার কথা মন দিয়ে শুনবে, পাশে থাকবে এবং প্রয়োজনের সময় সহযোগিতা করবে।
একবার অসুস্থ হয়ে পড়লে কিংবা বড় কোনো বিপদে পড়লে মানুষ অনেক কিছুই নতুন করে বুঝতে পারে। তখন বোঝা যায়—জীবনে শুধু টাকা পয়সা নয়, ভালো মানুষও কতটা প্রয়োজন।
টাকা পয়সা দিয়ে মানুষ রাখা যায়, ভালোবাসা কেনা যায় না
হয়তো টাকা-পয়সা দিয়ে কিছু মানুষকে আপনার কাছে রাখা সম্ভব। কিন্তু যারা সত্যিকার অর্থে আপনাকে ভালোবেসে আপনার পাশে দাঁড়াবে, তারা শুধু আপনার টাকা দেখবে না। তারা দেখবে আপনার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক, ভালোবাসা ও আত্মিক বন্ধন।
এই কারণে, যাদের সঙ্গে আপনার সত্যিকারের সম্পর্ক রয়েছে, তাদের সঙ্গে সবসময় ভালো কিছু করার চেষ্টা করুন। তাদের জন্য যতটুকু সম্ভব সময় দিন, সহযোগিতা করুন এবং সামর্থ্য অনুযায়ী খরচ করুন। কারণ বিপদ কখনো বলে-কয়ে আসে না। আজ আপনি ভালো আছেন, কাল হয়তো আপনারই কারও সহযোগিতার প্রয়োজন হতে পারে।
টাকা পার্থিব সুখ দিতে পারে, আত্মিক সুখ নয়
টাকা পয়সা আপনাকে মূলত পার্থিব অনেক সুখ দিতে পারবে। কিন্তু আত্মিক শান্তি শুধু টাকা দিয়ে কেনা সম্ভব নয়। আত্মিক শান্তি পেতে হলে নিজের আত্মারও যত্ন নিতে হবে। সেই যত্নের জন্য সরাসরি অনেক টাকার প্রয়োজন হয় না। বরং প্রয়োজন হয় আত্মশুদ্ধি, ভালো কাজ, সৎ জীবনযাপন, প্রিয়জনের সঙ্গে সুন্দর সম্পর্ক এবং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা।
এই পৃথিবীতে যারা অনেক টাকার মালিক, তাদের জীবনও একবার কাছ থেকে দেখুন। বাইরে থেকে দেখে আমাদের মনে হতে পারে তারা খুব সুখী। কিন্তু মানুষের ভেতরের গল্প সবসময় বাইরে থেকে দেখা যায় না।
টাকার পেছনে অবিরাম ছুটবেন না
টাকার পেছনে যারা অবিরাম ছুটতে থাকে, তারা অনেক সময় সারাজীবন ছুটতেই থাকে। আজকের লক্ষ্য পূরণ হলে আগামীকালের আরেকটি লক্ষ্য সামনে আসে। এভাবেই একসময় জীবনের অনেকটা সময় পার হয়ে যায়।
জীবন আসলে শুধু অর্থ উপার্জনের জন্য নয়। আপনি জীবনে যাই করুন না কেন, মাঝে মাঝে থামবেন। নিজের জীবন নিয়ে ভাববেন। পরিবারের খোঁজ নেবেন। চারপাশের মানুষদের খোঁজ নেবেন। কেউ না খেয়ে থাকলে তাকে খাবার দেবেন। কোনো মানুষ বিপদে পড়লে সামর্থ্য অনুযায়ী তাকে সাহায্য করবেন।
কারণ জীবন এক গতিতে ছুটে যাওয়ার নাম নয়। জীবন হলো চলার পাশাপাশি থামা, ভাবা, উপলব্ধি করা এবং অন্যের জন্য কিছু করার নাম।
অন্যের প্রতি হিংসা নয়, নিজের প্রতি মনোযোগ দিন
পৃথিবীতে ভালো থাকতে হলে আপনাকে অনেকটাই নিঃস্বার্থ হতে হবে। অন্যের কোনো কিছু দেখে অযথা হিংসা করা যাবে না। মনের মধ্যে সবসময় যদি এই প্রশ্ন ঘুরতে থাকে—“আল্লাহ এটা তাকে দিয়েছেন, আমাকে কেন দেননি?”—তাহলে আপনার নিজের শান্তিই নষ্ট হবে।
হ্যাঁ, আপনি পরিশ্রম করে জীবনে অনেক কিছু অর্জন করতে পারেন। নিজের অবস্থার উন্নতি করার চেষ্টা করবেন। কিন্তু যা অর্জন করেছেন, তা নিয়ে অহংকার করা যাবে না। অন্যের সম্পদ দেখে কষ্ট পাওয়ার চেয়ে নিজের অবস্থান থেকে কীভাবে আরও ভালো মানুষ হওয়া যায়, সেটাই ভাবা উচিত।
অবৈধ টাকা পয়সা কখনো প্রকৃত সুখ দিতে পারে না
চারপাশে তাকালে দেখবেন, কেউ কেউ অল্প সময়ের মধ্যেই অনেক সম্পদের মালিক হয়ে যায়। আবার কারও বিরুদ্ধে অবৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জনের অভিযোগও শোনা যায়।
কিন্তু অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ যতই বেশি হোক, সেটি মানুষের মনে প্রকৃত শান্তি এনে দেবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং অন্যায়ভাবে অর্জিত অর্থ অনেক সময় ভয়, অপরাধবোধ, সামাজিক চাপ এবং অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।
একজন মানুষ তার জীবনের অনেক ঘটনা সবার কাছ থেকে গোপন করে রাখতে পারে। বাইরে থেকে তাকে সফল মনে হলেও ভেতরে তার জীবন কেমন চলছে, সেটা আমরা জানি না। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা সম্মান দেন এবং যাকে ইচ্ছা পরীক্ষা করেন। তাই সম্পদকে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ মনে করা উচিত নয়।
টাকা পয়সা না থাকলেও সুখ কঠিন, আবার অতিরিক্ত ঋণ থাকলেও সুখ কঠিন
আবার এটাও সত্য যে, একেবারেই টাকা না থাকলে সুখী থাকা কঠিন। অর্থের অভাবে মানুষকে বিভিন্ন জায়গায় অপমানিত হতে হয়, প্রয়োজনের সময় চিকিৎসা করাতে পারে না, পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে পারে না। তাই অর্থের প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—আপনার টাকা পয়সা কম হতে পারে, কিন্তু যদি আপনার বড় কোনো ঋণ না থাকে এবং প্রয়োজনগুলো সীমিত থাকে, তাহলে আপনি তুলনামূলকভাবে শান্তিতে থাকতে পারেন।
কিন্তু আপনার আয় নেই, অথচ বড় ঋণের বোঝা আছে—তাহলে জীবন অনেক কঠিন হয়ে যায়। নিজের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি অন্যের পাওনাও পরিশোধ করতে হয়। ফলে মানসিক চাপও বাড়তে থাকে। তাই শুধু বেশি টাকা নয়, ঋণমুক্ত ও সুশৃঙ্খল জীবনও সুখের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ভালোবাসার সুখ টাকা দিয়ে কেনা যায় না
পৃথিবীর অনেক বস্তুগত সুখ টাকা পয়সা দিয়ে কেনা সম্ভব। কিন্তু অন্তরের সুখ আপনি টাকা পয়সা দিয়ে কিনতে পারবেন না।
একজন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যে ভালোবাসা, বিশ্বাস, মায়া ও আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়, সেই সুখের মূল্য কি টাকা দিয়ে নির্ধারণ করা যায়? মানুষের সত্যিকারের ভালোবাসা, বিশ্বাস ও বিশ্বস্ততা কোনো বাজারে বিক্রি হয় না। টাকা এখানে হয়তো একটি মাধ্যম হতে পারে, কিন্তু সুখের আসল উৎস নয়।
টাকার মাধ্যমে আপনি অনেক ভালো কাজ করতে পারেন। পরিবারকে ভালো রাখতে পারেন, অসুস্থ মানুষের চিকিৎসায় সাহায্য করতে পারেন, দরিদ্রকে খাবার দিতে পারেন, কাউকে শিক্ষার সুযোগ করে দিতে পারেন। অর্থাৎ টাকা নিজে সুখ নয়, কিন্তু সঠিকভাবে ব্যবহার করা টাকা সুখের কারণ হতে পারে।
সৎভাবে টাকা পয়সা আয় করুন, মানুষের উপকারে ব্যয় করুন
আপনি যদি সৎভাবে আয় করেন এবং সেই টাকা সৎভাবে ব্যয় করেন, মানুষের উপকারে কাজে লাগান, দান করেন এবং নিজের পরিবার ও সমাজের জন্য ভালো কিছু করেন—তাহলে সেই অর্থ আপনার জীবনে কল্যাণ বয়ে আনতে পারে।
জীবনে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিভিন্ন পরীক্ষা আসতে পারে। এটি স্বাভাবিক। দুঃখের সময়ে ধৈর্য ধরতে হবে এবং সুখের সময়ে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
তাই জীবনে শুধু “টাকা, টাকা আর টাকা” করবেন না। টাকা উপার্জন করুন, কারণ টাকা প্রয়োজন। কিন্তু টাকাকে জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য বানাবেন না।
সুখ একটি আপেক্ষিক বিষয়। শুধুমাত্র টাকার অঙ্ক দিয়ে সুখকে মাপা যায় না।
আপনার জীবনে টাকা পয়সা থাকুক, তবে সেই টাকা পয়সার সঙ্গে থাকুক শান্তি। আপনার ঘরে সম্পদ থাকুক, তবে তার সঙ্গে থাকুক ভালোবাসা। আপনার জীবনে সাফল্য আসুক, তবে তার সঙ্গে থাকুক বিনয়। আর সবশেষে—আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং সৎভাবে বেঁচে থাকার শক্তি যেন আপনার জীবনে থাকে। আপনার জীবন সুখের হোক—এই প্রত্যাশায় আজকের মতো ইতি টানলাম।
আরও পড়ুন: আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা মানুষকে অনেক দূর নিয়ে যায়
