সেই প্রাচীন যুগের মানুষ, মধ্যযুগের মানুষ আর শেষ যুগের মানুষের মধ্যে কত তফাৎ কত পরিবর্তন! অথচ সবাই কিন্তু মানুষ। আমি মূলত মানসিক অবস্থা ও চরিত্রের কথা বলছি। বুদ্ধির কথা না হয় বাদই দিলাম। আমরা বলা চলে মধ্যযুগের মানুষ। কিন্তু এই ৩০ বছরে পা দিয়ে মনে হচ্ছে—এখনকার যারা ছেলে-মেয়ে, তারা মনে হয় আমাদের মতো না। আমাদের সাথে তাদের বিস্তর তফাৎ অর্থাৎ বিস্তর পরিবর্তন।
চরিত্রের কথাই বলি একটু। আমি মাধ্যমিক স্কুলে পড়েছি ২০০৬ থেকে ২০১১ পর্যন্ত। তখন আমরা স্যারদের খুব ভয় পেতাম। রাস্তায় দেখলে অবশ্যই সালাম (প্রয়োজনে সাইকেল থেকে নেমে) দিতাম। বড় ভাইদের সম্মান করতাম। বড়দের সামনে মাথা নিচু করে চলতাম। অর্থাৎ চরিত্রবান থাকার চেষ্টা করতাম সবাই।
কিন্তু আপনি যদি এখনকার ছেলেমেয়েদের কথা বলেন, তাহলে উত্তরটা হবে উল্টো। এরা মূলত বেশিরভাগই উচ্ছৃঙ্খল। এদের কাছে বড় বলে কোনো কথা নেই। এরা বড়দের সামনেই সিগারেট খায়। স্যারদের সালাম দেয় না। স্যার কিছু বললে এরা স্যারদেরও মারার হুমকি দেয়। ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করে। আরও কত কী!
আমি আসলে সবার কথা বলছি না। কিন্তু বেশিরভাগেরই এই অবস্থা। অল্পসংখ্যক ছাত্রছাত্রী আছে, যারা সবাইকে সম্মান দিয়ে কথা বলে। তারা তাদের চরিত্রটা হয়তো ধরে রাখতে পেরেছে। তাদের সবার জন্য আমার তরফ থেকে শুভকামনা। তারা জীবনে অবশ্যই ভালো কিছু করবে।
মধ্যযুগে যে খারাপ ছেলেমেয়ে ছিল না, বিষয়টা এমন নয়। কিন্তু সংখ্যাটা খুবই নগণ্য। কিন্তু এখন যে অবস্থা, এটা নিয়ন্ত্রণ করাটা খুব কঠিন। এরা পাচ্ছে না ভালো একটা পরিবেশ, পাচ্ছে না শাসন, আর তাই যাচ্ছেতাই অবস্থা হয়ে যাচ্ছে।
আমরা ছোটবেলায় দেখেছি, বিকেল হলেই সবাই খেলার মাঠে চলে যেতাম। মনের আনন্দে ছোট-বড় সবাই মিলে খেলতাম। সন্ধ্যা হয়ে এলে সবাই বাসায় ফিরে আসতাম এবং বই পড়তে বসতাম। একবাড়ি থেকে আরেকবাড়িতে পড়ার শব্দ শোনা যেত। স্কুলে স্যাররা কড়া শাসন করতেন। খারাপ কোনো কিছু দেখলে আগে নিজেরাই শাসন করতেন। তারপর প্রয়োজনে বাবা-মাকে ডাকতেন।
বাবা-মায়েরাও স্যারদের কথায় খুব গুরুত্ব দিতেন এবং সম্মান করতেন ওনাদের। তাই ছেলেমেয়েরা খারাপ কিছু করার সাহস পেত না খুব একটা। এলাকায় যারা গণ্যমান্য ছিলেন, তাদেরও সবাই সম্মান করত। কারণ, তারাও মান্য ব্যক্তি হিসেবে তাদের চরিত্র ধরে রেখেছিল। তখন তাদের মধ্যে খুব খারাপ পরিবর্তন এতো সহজে হয়নি।
উপরের কথাগুলোর সাথে এখনকার যুগের কথা যদি আপনি মিলাতে চান, তবে পাবেন ভয়ংকর এক উল্টো চিত্র। এখনও কিছু কিছু শিক্ষক আছেন, যারা ছাত্রছাত্রীদের শাসন করতে চান—কিন্তু তারা পারেন না। কারণ, এটা নিষিদ্ধ করা আছে সরকারিভাবে। আবার, কোনো শিক্ষক যদি নিজের মতো একটু শাসন করেও ফেলেন, তবে ওই ছাত্র/ছাত্রীর বাবা-মা স্কুলে এসে ওই শিক্ষকের অবস্থা খারাপ করে ফেলবে। বাবা-মায়ের কথা বাদই দিলাম। যে ছাত্র/ছাত্রীকে শাসন করা হয়েছে, ওই আবার তার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে এসে শিক্ষকের ওপর আক্রমণ করবে।
আর এলাকার গুরুজনেরা তো এখন টাকার কাছে অসহায়। কোনো একটা বিচার-শালিস নিয়ে যাবেন, যে পক্ষ থেকে তারা বেশি টাকা নিতে পারবে, সেই পক্ষের জন্য রায় দেবে। এসব কিন্তু ধ্রুব সত্য।
এখন, হাতেগোনা দু-একজন ভালো মানুষ থাকতে পারে। কিন্তু ওই একশো জনের মধ্যে একজন ভালো মানুষের গণনা করে কোনো লাভ নেই। ওই একজনও এখন ভালো আছে কি না, সন্দেহ! ওই মানুষটারও পরিবর্তন হওয়াটা সময়ের ব্যাপার মাত্র।
মূলত বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে যে আমূল পরিবর্তন হয়েছে, সেটা হচ্ছে নৈতিকতার। বিশ্বের অন্যান্য দেশেও তো পরিবর্তন হয়েছে। তারা উন্নত হয়েছে, সভ্য হয়েছে বিভিন্ন দিক থেকে। কিন্তু বাংলার মানুষগুলো অসভ্য হয়েছে মনুষ্যত্বের দিক থেকে। এরা ভালো শিক্ষা অর্জন করতে পারেনি।
এরা এখন কী অর্জন করেছেন জানেন! এরা অর্জন করেছে কীভাবে কেবল রাজনীতি করেই জীবন পার করা যাবে। কীভাবে গরিবের হক মেরে খাওয়া যাবে। কীভাবে অহংকার আর শারীরিক শক্তি দিয়ে জীবন পার করা যাবে। কীভাবে কারও ওপর খুব সহজেই জুলুম করা যাবে, সহ আরও ইত্যাদি।
আগে ধরেন, ১০০টা ছেলের মধ্যে ১০টা খারাপ থাকত। আর এখন একদম উল্টো। ১০০টার মধ্যে ৯০টাই খারাপ আর ১০টা ভালো। ওই ১০টাও যে কোনো সময় খারাপ হয়ে যাবে, তার কোনো ঠিক নেই। ভবিষ্যৎ খুবই অন্ধকার। যাদের মধ্যে হিতাহিত জ্ঞান কাজ করে না, তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। আর অন্ধকারে বেঁচে থাকাটাও খুব দুষ্কর।
যদি আজকে দেশের সরকার সব ব্যাপারে কঠোর হতো, যেমন—দেশের কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোনো রাজনীতি চলবে না, কোনো ছাত্র-ছাত্রী শিক্ষককে লাঞ্ছিত করে পার পেয়ে যাবে না, কেউ ইভটিজিং করে রেহাই পাবে না ইত্যাদি, তাহলে দেখতেন কতটা ভালো পরিবেশ তৈরি হতো। কেউ খারাপ কোনো কিছু করার সাহস পেত না।
এখন তো ধর্ষণ করলেও শাস্তি হয় না। বরং জেলে গিয়ে আরামসে দিন পার করে। কিছু টাকা-পয়সা থাকলে তো বের হয়ে আসাটা খুবই সহজ। হ্যাঁ, হাতে গোনা কিছু বিচার হয়। কিন্তু নব্বই শতাংশ বিচারই হয় না। টাকার কাছে হেরে যায় সবকিছু।
মধ্যযুগের ছেলেমেয়েদের চেয়ে এই যুগের ছেলেমেয়েরা খুবই ভয়াবহ। এদের দেখলেই যেন ভয় করে। এরা এখন দল তৈরি করেছে। সেই দল নিয়ে নিরীহ মানুষের ওপর মন চাইলেই হামলা করে। সবকিছু কেড়ে নেয়। আইনের শাসন নেই। আর তাই এই অবস্থা। তবে যত পরিমাণ খারাপ মানুষ তৈরি হয়ে গেছে, এ থেকে উত্তরণের কোনো পথ আমার জানামতে নেই।
তাই, আসুন আমরা সবাই সাবধান থাকি। নিজের ছেলেমেয়েদের যত্নে রাখি। তারা কোথায় যায়, কী করে—লক্ষ্য রাখি। আল্লাহর বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করি। হয়তো আল্লাহ চাইলে আমাদের মাফ করবেন এবং আমরা সুন্দরভাবে এই পৃথিবীর জীবন পরিসমাপ্তি করতে পারব।
লিখেছেন: মোঃ আজগর আলী
