গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলায় এক বীভৎস হত্যার ঘটনায় স্তব্ধ হয়ে গেছে এলাকাবাসী। শুক্রবার দিবাগত গভীর রাতে রাউতকোনা গ্রামের একটি ভাড়া বাসায় একই পরিবারের পাঁচজনকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন একজন নারী, তার তিনটি শিশুকন্যা এবং তার ছোট ভাই।
কারা নিহত হলেন
নিহতরা হলেন — গাড়িচালক মো. ফোরকানের স্ত্রী শারমিন খানম (৪০), তাদের তিন মেয়ে মিম (১৬), মারিয়া (৮) ও দুই বছর বয়সী ফারিয়া এবং শারমিনের ছোট ভাই রসুল (২২)। শারমিন গোপালগঞ্জের সদর উপজেলার পাইকান্দি গ্রামের বাসিন্দা মো. শাহাদাত মোল্যার মেয়ে।
শনিবার দুপুরে পাঁচটি মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
ফোনে জানালেন ‘সব শেষ’
শনিবার সকালে স্বজনরা হত্যার খবর পান ফোরকানের নিজের ফোন থেকেই। সে তাদের জানায়, “সব শেষ। সবাইরে মাইরা ফেলছি।” এরপর থেকে তার মোবাইল ফোন বন্ধ রয়েছে এবং নিজের ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে পালিয়ে গেছেন তিনি।
খবর পেয়ে ছুটে আসেন স্বজনরা। ঘরে প্রবেশ করে পাঁচটি মরদেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন সবাই। মুহূর্তেই ঘটনাস্থলে ভিড় জমে যায় স্থানীয় মানুষের।
পরিকল্পিত হত্যার আলামত
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের ধারণা, এটি কোনো আবেগের বশে করা হত্যাকাণ্ড নয়। বরং বেশ আগে থেকেই পরিকল্পনা করে এই হত্যা সংঘটিত হয়েছে।
ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হয়েছে —
- মদের খালি বোতল
- একটি চাপাতি
- কম্পিউটারে টাইপ করা অভিযোগপত্রের পাঁচটি অভিন্ন কপি
প্রতিটি মরদেহের ওপর একটি করে অভিযোগপত্র রাখা ছিল। চিঠিগুলো লেখা হয়েছিল গোপালগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার উদ্দেশে। তবে এতে কোনো সই বা সিল না থাকায় এটি আনুষ্ঠানিকভাবে দাখিল করা হয়েছিল কিনা, তা যাচাই করছে পুলিশ।
এছাড়া, হত্যার আগে নিহতদের চেতনানাশক কোনো কিছু খাওয়ানো হয়েছিল বলেও সন্দেহ করা হচ্ছে। ঘটনার দিন ওই বাসায় গরুর মাংস, পায়েশসহ বিভিন্ন খাবার রান্না হয়েছিল বলে জানা গেছে।
কী লেখা ছিল অভিযোগপত্রে?
অভিযোগপত্রে ফোরকান লিখেছেন — তার উপার্জিত প্রায় ১০ লাখ টাকা তার স্ত্রী শারমিন ও শ্বশুর মিলে আত্মসাৎ করে নিজেদের নামে জমি কিনেছেন। একইসঙ্গে শারমিনের খালাতো ভাই রাজু আহমেদের সঙ্গে তার অবৈধ সম্পর্কের অভিযোগও তোলা হয়েছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার পর গত ৫ মে শারমিন তার লোকজন নিয়ে ফোরকানকে বেঁধে রেখে মারধর করেন।
পুলিশ এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করছে।
টঙ্গী ছেড়ে কাপাসিয়ায় কেন?
গোয়েন্দাদের ধারণা, হত্যার পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই ফোরকান কয়েক মাস আগে টঙ্গী থেকে পরিবার নিয়ে কাপাসিয়ার এই প্রত্যন্ত এলাকায় চলে আসেন। প্রবাসী মনির হোসেনের বাড়িতে গত পাঁচ মাস ধরে ভাড়া থাকলেও আশপাশের মানুষের সঙ্গে তাদের তেমন কোনো যোগাযোগ ছিল না।
ঘটনার আগের সন্ধ্যায় ফোরকান ছোট মেয়েকে কোলে নিয়ে পাশের দোকান থেকে কিসমিস ও চিপস কিনে এনেছিলেন — যা হত্যার পরিকল্পনার আড়ালে স্বাভাবিক আচরণের একটি চিত্র।
নিহত বড় মেয়ে মিম স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করত।
তদন্তে একাধিক সংস্থা
এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে এখন মাঠে নেমেছে জেলা পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), সিআইডি এবং পিবিআই — প্রত্যেকে আলাদাভাবে তদন্ত পরিচালনা করছে।
ইতোমধ্যে সন্দেহভাজন দুই ব্যক্তিকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়েছে। তবে তাদের পরিচয় এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
গাজীপুর জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, অচিরেই পলাতক ফোরকানকে গ্রেপ্তার করে পুরো ঘটনার রহস্য উন্মোচন করা সম্ভব হবে বলে তারা আশাবাদী।
আরও পড়ুন: সিআইএর গোপন রিপোর্ট ফাঁস: ট্রাম্পের দাবি মিথ্যা প্রমাণ করে ইরানের ৭০% ক্ষেপণাস্ত্র এখনো অক্ষত



