ইতালিতে ছোট ভাইকে নৃশংসভাবে হত্যা — বড় ভাইয়ের পরকীয়া, দ্বিতীয় বিয়ে ও টাকার দ্বন্দ্বই কাল হলো নয়নের

ইতালিতে নয়ন ফকির হত্যা বড় ভাই হুমায়ুন

মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ী উপজেলার পশ্চিম সোনারং গ্রামটি এখন শোকে স্তব্ধ। প্রবাসের মাটিতে সহোদর ভাইয়ের হাতে প্রাণ হারানোর এই মর্মান্তিক ঘটনা গোটা এলাকায় তীব্র শোক ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। ইতালির লেইজ শহরে বড় ভাই হুমায়ুন ফকিরের ছুরির আঘাতে নিহত হয়েছেন ছোট ভাই নয়ন ফকির। দিন যত গড়াচ্ছে, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের জটিল কাহিনি ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। তদন্তে এবং পরিবারের বক্তব্যে উঠে এসেছে পরকীয়া, গোপন দ্বিতীয় বিয়ে এবং পারিবারিক অর্থ বিরোধের এক বহুস্তরীয় সংকটের চিত্র।

পরকীয়া থেকে গোপন বিয়ে — শুরু যেখানে

জানা যায়, হুমায়ুন ফকিরের প্রথম স্ত্রী আমেনা আফরিন দেশেই বসবাস করতেন। কিন্তু এরই মধ্যে হুমায়ুন তার নিজের চাচাতো বোন তায়েবার সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে অবৈধ সম্পর্ক বজায় রাখছিলেন। তিন বছর আগে আমেনাকে টেলিফোনে বিয়ে করলেও, মাত্র দুই বছর আগে দেশে ছুটিতে এসে গোপনে তায়েবাকে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে বিয়ে করেন হুমায়ুন।

এই দ্বিতীয় বিয়েটি পরিবারের কেউ মেনে নেননি। হুমায়ুনের বাবা-মা সরাসরি এই বিয়ের বিরোধিতা করেন। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে, তায়েবাকে বাড়িতে তোলার খবর পেয়ে হুমায়ুনের বাবা দেলোয়ার হোসেন ক্রোধবশত ওই ঘরের বিদ্যুৎ সংযোগ পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন করে দেন। এই ঘটনা হুমায়ুনের মনে পরিবারের প্রতি — বিশেষত ছোট ভাই নয়নের প্রতি — গভীর বিদ্বেষের বীজ বপন করে।

প্রথম স্ত্রীকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা, মানসিক নির্যাতন

আমেনা আফরিন অভিযোগ করেছেন, হুমায়ুন তাকে কখনো ভরণপোষণ দিতেন না এবং নিয়মিত মানসিক নির্যাতন চালাতেন। এমনকি প্রথম স্ত্রীকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে পাঁচ লাখ টাকার বিনিময়ে একটি সমঝোতাও করতে চেয়েছিলেন হুমায়ুন। একটি পরিবারের ভেতরে এভাবে স্বার্থের আগুন ছড়িয়ে পড়ছিল ধীরে ধীরে।

১৩ লাখে বিদেশ, কিন্তু হিসাব মেলেনি

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বড় ভাই হুমায়ুনই ১৩ লাখ টাকা খরচ করে নয়নকে ইতালিতে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেই ঋণ শোধ করতে নয়ন দীর্ঘ সময়ে বিভিন্ন কিস্তিতে প্রায় ২০ লাখ টাকা বড় ভাইকে ফেরত দিয়েছিলেন — অর্থাৎ মূল পাওনার চেয়ে অনেক বেশি। এরপরও হুমায়ুন সম্প্রতি নতুন এক দাবি তোলেন। তিনি বলেন, দেশে মা-বাবার ভরণপোষণে তার ১৬ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে, সেই খরচের অর্ধেক — অর্থাৎ ৮ লাখ টাকা — নয়নকে দিতে হবে।

পরিবারের দাবি, নয়ন সেই টাকা দিতেও রাজি হয়েছিলেন। তবু হুমায়ুন থামেননি। পরিকল্পিতভাবেই তিনি ছোট ভাইকে হত্যার পথ বেছে নেন।

বৈদ্যুতিক সাইকেল চার্জ দিতে গিয়ে মৃত্যু

বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ইতালির স্থানীয় সময় বিকেল ৫টায় নয়ন ফকির তার বড় ভাই হুমায়ুনের বাড়ির নিচে বৈদ্যুতিক সাইকেল চার্জ দিতে যান। যখন নয়ন প্লাগ লাগাতে সামান্য নিচু হন, তখনই পেছন থেকে ঝাঁপিয়ে পড়েন হুমায়ুন। ছুরি দিয়ে একের পর এক আঘাত করেন নয়নের পিঠে ও মাথায়। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় নয়নের।

হত্যাকাণ্ডের পর হুমায়ুন আরও এক নিষ্ঠুর কাজ করেন — ভিডিও কলে দেশে থাকা বাবা-মাকে নিজের হাতে খুন করা ছোট ছেলের লাশ দেখান। এই ঘটনায় পরিবারের সদস্যরা মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েন।

পরিবারের দাবি — ফাঁসি চাই

নিহত নয়ন ও ঘাতক হুমায়ুনের একমাত্র বোন দিলারা আক্তার স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, তিনি বড় ভাইয়ের সর্বোচ্চ শাস্তি, অর্থাৎ ফাঁসি চান। এই নৃশংস হত্যার বিচার দেশে-বিদেশে যেখানেই হোক, অপরাধীর যেন কঠোর শাস্তি নিশ্চিত হয় — এটাই এখন পরিবারের একমাত্র প্রত্যাশা।

বর্তমানে হুমায়ুন ফকির ইতালি পুলিশের হেফাজতে আছেন এবং তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

প্রবাসে বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

এই ঘটনা আবারও প্রবাসী বাংলাদেশিদের পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের বিষয়টি সামনে এনেছে। বিদেশে একা থাকতে থাকতে অনেক প্রবাসী মানসিক চাপ, পারিবারিক কলহ এবং অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে ভেঙে পড়েন। নয়ন ফকিরের মৃত্যু যেন সেই বাস্তবতারই এক করুণ পরিণতি।

আরও পড়ুন: রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনকে অপসারণ ও গ্রেপ্তারের দাবি: সংসদে কড়া বক্তব্য রাখলেন নাহিদ ইসলাম

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top