আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আমরা অসংখ্য কথা বলি। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছি, এই কথাগুলো আমাদের পরকালে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে? ইসলামে জিহ্বার হেফাজত বা কথায় সংযম একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটি শুধু আমাদের ইহকালীন জীবনকে সুন্দর করে না, বরং পরকালীন মুক্তির পথও সুগম করে। আজকের এই বিস্তারিত আলোচনায় আমরা জানবো—কথায় সংযম কেন জরুরি, এর ফজিলত কী, এবং একজন মুমিন হিসেবে আমাদের কোন কথাগুলো পরিহার করা উচিত।
জিহ্বা: আশীর্বাদ না অভিশাপ?
আল্লাহ তায়ালা মানুষকে কথা বলার অসাধারণ ক্ষমতা দিয়েছেন, যা অন্য কোনো প্রাণীর নেই। এই ক্ষমতা যেমন মানুষকে সর্বোচ্চ মর্যাদায় নিয়ে যেতে পারে, তেমনি অপব্যবহারে তাকে সর্বনিম্ন স্তরেও নামিয়ে আনতে পারে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“মানুষ যখন সকালে উঠে, তখন সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ জিহ্বার কাছে বিনম্রভাবে বলে—আমাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। কারণ আমরা তোমার সাথে আছি। তুমি সঠিক থাকলে আমরা সঠিক থাকবো, আর তুমি বাঁকা হলে আমরাও বাঁকা হয়ে যাবো।” (তিরমিজি)
এই হাদিস থেকে স্পষ্ট যে, জিহ্বার নিয়ন্ত্রণ সমগ্র দেহ ও আত্মার পরিশুদ্ধির চাবিকাঠি।
ইসলামে কথায় সংযমের গুরুত্ব
১. জান্নাত লাভের সহজ পথ
হাদিসে বর্ণিত আছে, হযরত সাহল ইবনে সাদ (রা.) থেকে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন:
“যে ব্যক্তি তার দুই চোয়ালের মধ্যবর্তী (জিহ্বা) এবং দুই পায়ের মধ্যবর্তী অঙ্গের (লজ্জাস্থান) নিশ্চয়তা দিতে পারবে, আমি তার জন্য জান্নাতের নিশ্চয়তা দিচ্ছি।” (বুখারি: ৬৪৭৪)
অর্থাৎ, মাত্র দুটি অঙ্গের সংযম—জিহ্বা ও লজ্জাস্থান—একজন মুমিনকে জান্নাত পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারে। এর চেয়ে বড় ফজিলত আর কী হতে পারে?
২. পাপ থেকে সুরক্ষা
কথার অসংযম মানুষকে অজান্তেই বড় বড় গুনাহের দিকে ঠেলে দেয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- গীবত বা পরনিন্দা: আল্লাহ কুরআনে এটিকে মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সাথে তুলনা করেছেন (সুরা হুজুরাত: ১২)
- মিথ্যা বলা: কবিরা গুনাহগুলোর মধ্যে অন্যতম
- চোগলখোরি বা দুই মুখো কথা: সমাজে বিভেদ সৃষ্টির মূল কারণ
- অশ্লীল ও কটু কথা: অন্যের মনে কষ্ট দেওয়া ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ
- অপ্রয়োজনীয় বাদানুবাদ ও বিতর্ক: এটি সময় ও শক্তির অপচয় এবং সম্পর্ক নষ্টের কারণ
৩. মানসিক প্রশান্তি ও আত্মিক উন্নতি
কম কথা বলার মধ্যে এক অলৌকিক শান্তি আছে। যখন আমরা অর্থহীন কথাবার্তা থেকে বিরত থাকি, তখন আমাদের মন ও মস্তিষ্ক অযথা চাপমুক্ত থাকে। আত্মিক পরিশুদ্ধির জন্য যারা সাধনা করেন, তারা জানেন—মৌনতা বা কম কথা বলার অভ্যাস আত্মার গভীরতা বাড়ায় এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভে সহায়তা করে।
৪. সামাজিক শান্তি ও সম্প্রীতি রক্ষা
পারিবারিক কলহ, বন্ধুত্বে ভাঙন, প্রতিবেশীর সঙ্গে বিরোধ—এর বেশিরভাগই কথার কারণে হয়। একটি অসতর্ক মন্তব্য বছরের পর বছরের সম্পর্ক ধ্বংস করে দিতে পারে। তাই কথায় সংযমী হওয়া মানে শুধু নিজেকে রক্ষা করা নয়, বরং পুরো পরিবার ও সমাজকে রক্ষা করা।
৫. ফেরেশতারা প্রতিটি কথা লিখে রাখেন
আল্লাহ তায়ালা বলেন:
“মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তার কাছে একজন পর্যবেক্ষক প্রস্তুত থাকে।” (সুরা ক্বাফ: ১৮)
এই আয়াতটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমাদের প্রতিটি শব্দ—ভালো হোক বা মন্দ—রেকর্ড হচ্ছে। কিয়ামতের দিন সেই রেকর্ড আমাদের সামনে উপস্থাপন করা হবে।
যে কথাগুলো একজন মুমিনকে অবশ্যই পরিহার করতে হবে
🚫 ১. আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে শপথ করা
“তোমার মাথার কসম,” “দেশের কসম,” “মায়ের কসম”—এ ধরনের শপথ ইসলামে নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “যে ব্যক্তি শপথ করতে চায়, সে যেন কেবল আল্লাহর নামেই শপথ করে।” (বুখারি ও মুসলিম)
🚫 ২. আল্লাহর কাছে দোয়া করার সময় সংশয় বা দুর্বলতা প্রকাশ করা
“হে আল্লাহ, যদি তুমি চাও তাহলে আমাকে ক্ষমা করো”—এ ধরনের দোয়া করতে নিষেধ করেছেন রাসুল (সা.)। আল্লাহর কাছে পূর্ণ আস্থা ও দৃঢ়তার সাথে চাইতে হবে। কারণ, আল্লাহকে বাধ্য করার কেউ নেই, তাই দৃঢ়ভাবে চাওয়াই তাঁর শানে সম্মানজনক।
🚫 ৩. কারো শারীরিক ত্রুটির কারণে তাকে অভিশাপ দেওয়া
কেউ কালো, খাটো, মোটা বা কোনো শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত—এই কারণে তাকে অভিশাপ দেওয়া বা ব্যঙ্গ করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এটি আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি অসম্মান।
🚫 ৪. অপরাধ গোপন করতে আল্লাহর নাম ব্যবহার করা
“আল্লাহর কসম, আমি এটা করিনি”—এভাবে মিথ্যা শপথ করা কবিরা গুনাহ। এটি শুধু একটি মিথ্যা নয়, বরং এটি আল্লাহর পবিত্র নামকে মিথ্যার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা, যা অত্যন্ত ভয়ানক।
🚫 ৫. কোনো মানুষকে বরকতের উৎস বলা
“অমুক পীর সাহেবের কদমে বরকত আছে” বা “অমুকের ছোঁয়ায় কল্যাণ হবে”—এ ধরনের বিশ্বাস ও কথা শিরকের দিকে নিয়ে যায়। বরকতের একমাত্র উৎস হলেন আল্লাহ তায়ালা।
🚫 ৬. আল্লাহর বিরুদ্ধে অবিচারের অভিযোগ আনা
বিপদে পড়লে অনেকে বলে থাকেন, “আল্লাহ আমার সাথে অন্যায় করেছেন।” এটি সম্পূর্ণ ভুল এবং ঈমানবিরোধী কথা। আল্লাহ তায়ালা বলেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ কারো প্রতি বিন্দুমাত্র অবিচার করেন না।” (সুরা নিসা: ৪০)
🚫 ৭. তাকদির বা ভাগ্য নিয়ে আপত্তি করা
“যদি আমি এটা না করতাম, তাহলে এটা হতো না”—এ ধরনের কথা আল্লাহর নির্ধারণের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করে। রাসুল (সা.) বলেছেন, এ ধরনের “যদি” শয়তানের দরজা খুলে দেয়।
🚫 ৮. সময় বা যুগকে অভিশাপ দেওয়া
“এই যুগটাই খারাপ,” “সময়টা মন্দ”—এ ধরনের কথা বলা নিষিদ্ধ। কারণ, সময়ের মালিক আল্লাহ। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন: “আদমের সন্তান সময়কে কষ্ট দেয়, অথচ আমিই সময়।” অর্থাৎ সময়কে গালি দেওয়া আল্লাহকে কষ্ট দেওয়ার মতো।
🚫 ৯. নিজের লেখা বা তৈরি বিষয়কে “সৃষ্টি” বলা
“আমি এটা সৃষ্টি করেছি” বলার বদলে বলা উচিত “আমি তৈরি করেছি” বা “বানিয়েছি।” সৃষ্টি করার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহরই আছে। আমরা শুধু একত্রিত করি বা রূপ দিই।
🚫 ১০. আল্লাহর ক্ষমা নিয়ে নিশ্চিন্তে পাপ করা
“আল্লাহ তো ক্ষমাশীল, মাফ করে দেবেন”—এই মানসিকতায় ইচ্ছাকৃত পাপ করতে থাকা অত্যন্ত বিপজ্জনক। আল্লাহর রহমতের পাশাপাশি তাঁর আজাবকেও ভয় করতে হবে।
কথায় সংযমের ব্যবহারিক উপায়সমূহ
কথায় সংযম অর্জন শুধু ইচ্ছা করলেই হয় না, এর জন্য ধারাবাহিক অনুশীলন দরকার। নিচে কিছু কার্যকর উপায় দেওয়া হলো:
১. কথা বলার আগে ভাবুন: প্রতিটি কথা বলার আগে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন—এটা কি সত্য? এটা কি প্রয়োজনীয়? এটা কি কল্যাণকর?
২. বেশি বেশি জিকির করুন: মুখকে আল্লাহর স্মরণে ব্যস্ত রাখলে অনর্থক কথা বলার সুযোগ কমে।
৩. মৌনতার অভ্যাস গড়ুন: প্রতিদিন কিছুটা সময় নীরব থাকার অভ্যাস করুন।
৪. সঙ্গ বেছে নিন: যাদের সাথে থাকলে ভালো কথা হয়, তাদের সাথে মিশুন।
৫. নিয়মিত আত্মসমালোচনা করুন: দিন শেষে ভাবুন—আজকের কোন কথাটি বলা উচিত হয়নি।
উপসংহার
কথায় সংযম কোনো কঠিন সাধনা নয়, বরং এটি একটি সচেতন অভ্যাস গড়ে তোলার বিষয়। ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয়—“উত্তম কথা বলো অথবা চুপ থাকো।” এই একটি মূলনীতি যদি আমরা জীবনে প্রয়োগ করতে পারি, তাহলে অনেক গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন অনেক সহজ হয়ে যায়।
মনে রাখবেন, একটি ভালো কথা সদকার সমতুল্য, আর একটি মন্দ কথা মানুষের জীবন ধ্বংস করতে পারে। তাই আসুন, আমরা প্রতিজ্ঞা করি—আমাদের জিহ্বাকে আল্লাহর ইবাদতে ব্যবহার করবো এবং যা কল্যাণকর নয় তা থেকে বিরত থাকবো।
আল্লাহ আমাদের সকলকে জিহ্বার হেফাজত করার তাওফিক দিন। আমিন।
আরও পড়ুন: মেসেজে ‘কবুল’ লিখলে কি বিয়ে হয়ে যায়? ইসলামি শরিয়াহ কী বলে জেনে নিন



