দেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা শিখন ঘাটতি এবার কঠোর পদক্ষেপের মুখোমুখি হতে চলেছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্তে জানিয়েছে, চলতি বছরের জুলাই মাসের মধ্যে যদি কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বাংলা ও ইংরেজি সাবলীলভাবে পড়তে না পারে এবং গণিতের মৌলিক চারটি প্রক্রিয়া—যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগ—আয়ত্ত করতে না পারে, তাহলে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন বন্ধ করে দেওয়া হবে।
কেন এই সিদ্ধান্ত? পেছনের কারণ কী?
বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৯৮ শতাংশ শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়—এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন। তবে ভর্তির এই উচ্চহার মানসম্পন্ন শিক্ষার নিশ্চয়তা দিচ্ছে না। বিশ্বব্যাংক, ইউনিসেফসহ একাধিক দেশি-বিদেশি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জরিপে উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক তথ্য—দেশের প্রায় ৬৫ শতাংশ শিক্ষার্থী সঠিকভাবে বাংলা পড়তে পারে না। ইংরেজি ও গণিতে দুর্বলতা এর চেয়েও বেশি।
শুধু তাই নয়, ইউনিসেফ পরিচালিত সাম্প্রতিক এক গবেষণায় প্রকাশ পেয়েছে, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া অধিকাংশ শিক্ষার্থী পঞ্চম শ্রেণির মৌলিক দক্ষতাই অর্জন করতে পারেনি। বিশেষ করে গণিতের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ। এই বাস্তবতা প্রমাণ করে, সংখ্যায় শিক্ষার্থী বাড়লেও শিক্ষার গুণগত মান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা: কী বলা হয়েছে চিঠিতে?
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সাখাওয়াত্ হোসেন সম্প্রতি দেশের সব জেলার প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে একটি ভার্চুয়াল বৈঠকে বসেন। সেই বৈঠকে সুস্পষ্টভাবে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। এরপর জেলার প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তারা স্ব স্ব জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়ে দিয়েছেন।
চিঠিতে স্পষ্ট করা হয়েছে:
- জুলাই ২০২৫-এর মধ্যে শতভাগ শিক্ষার্থীকে বাংলা ও ইংরেজিতে সাবলীলভাবে পড়তে সক্ষম করতে হবে
- একই সময়ের মধ্যে গণিতের চারটি মৌলিক প্রক্রিয়া (যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ) সম্পূর্ণরূপে রপ্ত করাতে হবে
- এই লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন স্থগিত করা হবে
শিক্ষামন্ত্রীর হতাশা ও স্বীকারোক্তি
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর বনানীতে একটি হোটেলে ইউনিসেফ আয়োজিত ‘ফ্রম এভিডেন্স টু অ্যাকশন: স্ট্রেনদেনিং লার্নিং, ইনক্লুশন অ্যান্ড ইনোভেশন ইন ক্লাসরুম ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণা ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন গভীর হতাশা প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরেও দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সমস্যাগুলো আজও বিদ্যমান। শিক্ষার্থীদের শেখার সক্ষমতা, শিক্ষকতার মান এবং মাঠপর্যায়ের কার্যকারিতা নিয়ে তিনি সরাসরি প্রশ্ন তোলেন। উল্লেখযোগ্যভাবে, তিনি নিজে প্রায় ২০ বছর আগে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তারপরও তিনি স্বীকার করেন, এত বছরে তিনি কোনো দৃশ্যমান বড় পরিবর্তন দেখতে পাননি।
একইসঙ্গে তিনি জানান, পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৫) বাস্তবায়নে প্রায় ৫১ হাজার কোটি টাকার কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এর আগের কর্মসূচিতেও ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা। এত বিশাল বিনিয়োগের পরেও কাঙ্ক্ষিত ফলাফল না পাওয়ার জবাবদিহিতার প্রশ্ন তুলেছেন মন্ত্রী নিজেই।
ইউনিসেফের গবেষণায় শিক্ষকদের সংকটের চিত্র
২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পরিচালিত এই বিস্তারিত গবেষণায় দেশের ১৪২টি বিদ্যালয়, ১৫ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী এবং ৮০০-এর বেশি শিক্ষক অংশগ্রহণ করেছেন। গবেষণাটি পরিচালনা করেছে ইউনিসেফ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) এবং কয়েকটি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান।
গবেষণার ফলাফলে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে:
- দেশের ৯০ শতাংশ শিক্ষক পাঠ্যসূচি শেষ করার চাপে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত সময় দিতে পারছেন না
- প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ শিক্ষক সারা বছর প্রয়োজনীয় শিক্ষণ উপকরণ ব্যবহারের মতো পর্যাপ্ত সময় পান না
- অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষণসামগ্রী দেরিতে শিক্ষকদের কাছে পৌঁছেছে
- ৬০ শতাংশ শিক্ষক মনে করেন, ঘন ঘন পাঠ্যক্রম পরিবর্তন শিক্ষার মানোন্নয়নে বড় বাধা
এই গবেষণার ফলাফল তুলে ধরেছেন ইউনিসেফের শিক্ষা ব্যবস্থাপনাবিষয়ক গবেষণা দলের প্রধান থমাস ওয়েলস ড্রেসেন এবং গবেষণা দলের পরামর্শক অনিন্দিতা নুগ্রহ।
শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি: কতটা গভীর সংকট?
গবেষণায় উঠে আসা সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, ষষ্ঠ শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়া বেশিরভাগ শিক্ষার্থী আসলে পঞ্চম শ্রেণির মৌলিক দক্ষতাই অর্জন করতে পারেনি। এর মানে হলো, এই শিক্ষার্থীরা কাগজে-কলমে পরের ক্লাসে উঠলেও তাদের ভেতরের শিখনের ভিত্তি অত্যন্ত দুর্বল। এই ধরনের শিখন ঘাটতি (Learning Gap) একটি শিশুর সারা জীবনের মেধা বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রাথমিক স্তরে পাঠের ভিত মজবুত না হলে উচ্চতর শ্রেণিতে গিয়ে শিক্ষার্থীরা আরও বেশি পিছিয়ে পড়ে। এই চক্রটি ভাঙতে না পারলে শুধু বিনিয়োগ বাড়িয়ে কোনো ফল আসবে না।
বেতন বন্ধের সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর হবে?
সরকারের এই কঠোর পদক্ষেপকে অনেকেই ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন। দীর্ঘদিন ধরে জবাবদিহিতার অভাবে যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, সেটি ভাঙতে হলে দৃঢ় পদক্ষেপের প্রয়োজন আছে বলে তারা মনে করেন। তবে একইসঙ্গে বিশেষজ্ঞ মহলে একটি প্রশ্নও উঠছে—শুধু চাপ দিলেই কি শিক্ষার মান বাড়বে, নাকি শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, উপকরণ সরবরাহ এবং সহায়তার ব্যবস্থাও করতে হবে?
শিক্ষকরা নিজেরাও অনেক সময় পরিকাঠামোগত সমস্যার শিকার। সিলেবাসের চাপ, শিক্ষণ সামগ্রীর অভাব এবং ঘন ঘন পাঠ্যক্রম পরিবর্তনের ধাক্কা সামলাতে গিয়ে অনেক শিক্ষক নিজেরাই হিমশিম খাচ্ছেন। তাই এই সিদ্ধান্তের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে কার্যকর পর্যবেক্ষণ ও সহায়তার ব্যবস্থা না করলে কেবল শাস্তির ভয় দিয়ে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা কঠিন হবে।
করণীয় কী? সমাধানের পথ
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:
১. নিয়মিত প্রশিক্ষণ: শিক্ষকদের নিয়মিত ও কার্যকর প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে ২. সময়মতো উপকরণ সরবরাহ: শিক্ষণসামগ্রী যেন বছরের শুরুতেই পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে হবে ৩. পাঠ্যক্রম স্থিতিশীলতা: ঘন ঘন পাঠ্যক্রম পরিবর্তন বন্ধ করে একটি সুস্থিতিশীল কাঠামো তৈরি করতে হবে ৪. দুর্বল শিক্ষার্থীর প্রতি মনোযোগ: পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা পাঠ পরিকল্পনা ও মনোযোগ দরকার ৫. নিয়মিত মূল্যায়ন: শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে
উপসংহার
প্রাথমিক শিক্ষা একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ার মূল ভিত্তি। বিপুল বিনিয়োগের পরেও যদি শিশুরা সাবলীলভাবে পড়তে না পারে, গণিতের সহজ হিসাব না বোঝে, তাহলে সেই বিনিয়োগ অর্থহীন। সরকারের বেতন বন্ধের সিদ্ধান্তটি একটি সাহসী পদক্ষেপ, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী সাফল্যের জন্য শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন একটি সমন্বিত, টেকসই এবং শিক্ষক-বান্ধব সংস্কার কার্যক্রম, যেখানে জবাবদিহিতার পাশাপাশি সহায়তার হাতও বাড়িয়ে দেওয়া হবে। তবেই হয়তো স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরেও যে সমস্যাগুলো রয়ে গেছে, সেগুলো থেকে মুক্তি মিলবে।
আরও পড়ুন: প্রাথমিকের ১৪ হাজার ৩০০ শিক্ষককে শর্তসাপেক্ষে নিয়োগ দেওয়া হবে শিগগিরই: শিক্ষামন্ত্রী



