২০৮ প্রবাসী জুলাই যোদ্ধাকে ২৫ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রশ্নে হাইকোর্টের রুল জারি

প্রবাসী জুলাই যোদ্ধা ক্ষতিপূরণ হাইকোর্ট রুল

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকা রাখার কারণে বিদেশে কারাভোগ ও নির্যাতনের শিকার হওয়া ২০৮ জন প্রবাসী জুলাই যোদ্ধাকে প্রত্যেককে ২৫ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ কেন প্রদান করা হবে না — এই মর্মে রুল জারি করেছেন মহামান্য হাইকোর্ট। সোমবার বিচারপতি ফাতেমা নজীব এবং বিচারপতি এ এফ এম সাইফুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই ঐতিহাসিক রুল জারি করেন। জারি করা রুলে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে যথাযথ জবাব দাখিল করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আদালতে শুনানি ও রুল জারির পটভূমি

সোমবারের শুনানিতে রিটকারীদের পক্ষে আদালতে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার এইচ এম সানজিদ সিদ্দিকী। শুনানি শেষে সাংবাদিকদের সামনে এক সংক্ষিপ্ত ব্রিফিংয়ে তিনি রুল জারির বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেন।

ব্যারিস্টার সানজিদ সিদ্দিকী জানান, দেশে প্রত্যাবর্তন করা ২০৮ জনের মধ্যে জুলাই আন্দোলনের উত্তাল সময়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতে (UAE) বিভিন্ন মামলায় সাজাপ্রাপ্ত ৫৭ জন শ্রমিক অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। এই ৫৭ জনসহ মোট ২০৮ জনকে বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে “জুলাই যোদ্ধা” হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছে, যা তাদের আন্দোলনে অবদানের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির প্রমাণ বহন করে।

তিনি আরও জানান, হাইকোর্ট শুনানি শেষে ২০৮ জন রেমিট্যান্স যোদ্ধার প্রত্যেককে কেন ২৫ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না — সেই বিষয়ে রুল জারি করেছেন। একইসঙ্গে আদালত জানিয়েছেন, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় বরাবর ক্ষতিপূরণ প্রদানের যে আবেদন করা হয়েছিল, তা আগামী ৩০ (ত্রিশ) দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে।

কারা এই প্রবাসী জুলাই যোদ্ধা?

২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশে কোটা সংস্কার আন্দোলন যখন তীব্র আকার ধারণ করে এবং পরবর্তীতে তা ব্যাপক গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়, তখন শুধু দেশের ভেতরে নয়, বিদেশেও বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন। বিশেষত সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE) এবং সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকরা প্রকাশ্যে বিক্ষোভে অংশ নেন এবং দেশের ছাত্র-জনতার পক্ষে সোচ্চার হন।

তবে মধ্যপ্রাচ্যের কঠোর আইনি পরিবেশে এই প্রতিবাদের মাশুল গুনতে হয় তাদের। আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি শ্রমিক গ্রেপ্তার হন এবং স্থানীয় আদালতে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা পান। তাদের কারামুক্তির পথ সুগম করতে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়।

ড. ইউনূসের হস্তক্ষেপে মুক্তি ও দেশে প্রত্যাবর্তন

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরাসরি কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ ও ব্যক্তিগত উদ্যোগের ফলে কারাগারে আটক প্রবাসী শ্রমিকদের মুক্তির ব্যবস্থা হয়। পর্যায়ক্রমে মুক্তি পেয়ে মোট ২০৮ জন প্রবাসী বাংলাদেশে ফিরে আসেন।

কিন্তু দেশে ফেরার পরই শুরু হয় তাদের নতুন সংকট। দীর্ঘ কারাভোগের কারণে বিদেশে চাকরি হারানো, জমানো অর্থ শেষ হয়ে যাওয়া এবং পরিবারের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়া এই প্রবাসী যোদ্ধারা অর্থনৈতিকভাবে দারুণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। এই প্রেক্ষাপটে তারা ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আশায় আদালতের দ্বারস্থ হন।

হাইকোর্টে রিট আবেদন ও আইনি লড়াই

ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসী জুলাই যোদ্ধাদের পক্ষ থেকে হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়ের করা হয়। রিটে প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীকে ২৫ লাখ টাকা করে রাষ্ট্রীয় ক্ষতিপূরণ প্রদানের দাবি জানানো হয়। এই দাবির আইনি ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয় যে, রাষ্ট্রের পক্ষে আন্দোলনে অংশগ্রহণের কারণে তারা বিদেশে কারাভোগ করেছেন এবং তাদের জীবন ও জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাই রাষ্ট্রের দায় রয়েছে তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার।

আদালত এই রিটের প্রাথমিক শুনানি গ্রহণ করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জবাব দিতে বলায় মামলাটি এখন গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।

ক্ষতিপূরণের দাবির যৌক্তিকতা

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবাসী জুলাই যোদ্ধারা কেবল নিজেদের অধিকারের জন্য নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করতে গিয়ে বিদেশে চাকরি, আয় ও স্বাধীনতা হারিয়েছেন। তারা যে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন তা শুধু আর্থিক নয়, মানসিক ও সামাজিকভাবেও গভীর। বিদেশে সাজা খাটা এবং নিয়োগকর্তার দ্বারা চাকরিচ্যুত হওয়া তাদের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের পথকেও কঠিন করে দিয়েছে।

এই পরিপ্রেক্ষিতে ২৫ লাখ টাকার ক্ষতিপূরণের দাবি আইনি ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত যুক্তিসংগত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পরবর্তী পদক্ষেপ

হাইকোর্টের রুল জারির পর এখন সরকারের পক্ষ থেকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জবাব দাখিল করতে হবে। পাশাপাশি প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত আবেদন নিষ্পত্তি করতে বলা হয়েছে। আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট মহল আশা করছেন, এই রুলের মাধ্যমে প্রবাসী জুলাই যোদ্ধাদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পাওয়ার পথ আরও সুগম হবে এবং সরকার দ্রুত ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।

আরও পড়ুন: ঢাকা-সিলেট রেলপথে ডাবল লাইন স্থাপনের ঘোষণা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top