কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার সদ্য প্রত্যাহারকৃত ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সিরাজুল মোস্তফার বিরুদ্ধে ভয়াবহ দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। মাত্র পাঁচ মাসের কার্যকাল শেষ না হতেই তিনি মাদক ব্যবসায়ী, চোরাকারবারি সিন্ডিকেট এবং পরিবহন খাত থেকে মাসোহারা বাবদ প্রায় আড়াই কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রত্যাহারের পর এলাকাবাসী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো মুখ খুলতে শুরু করায় একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে।
যেভাবে শুরু হয় দুর্নীতির রাজত্ব
গত বছরের ৭ ডিসেম্বর ওসি সিরাজুল মোস্তফা কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানায় যোগদান করেন। থানায় পা দেওয়ার পর থেকেই তিনি সংঘবদ্ধ মাদক ব্যবসায়ী ও চোরাকারবারিদের সঙ্গে অঘোষিত যোগাযোগ শুরু করেন বলে জানা গেছে। দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এলাকায় অন্তত ১৮ থেকে ২০টি চোরাকারবারি সিন্ডিকেট নতুনভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। প্রশাসনিক ছত্রচ্ছায়ায় তারা নির্বিঘ্নে তাদের অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনা করতে থাকে।
গত ৫ মে তাকে থানা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করা হয়। তার বিদায়ের পরই ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা সাহস করে মুখ খুলতে শুরু করেছেন।
ভারত সীমান্তবর্তী থানায় চোরাচালানের স্বর্গরাজ্য
কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানা একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এলাকায় অবস্থিত। একদিকে ভারতের সঙ্গে স্থলসীমান্ত, অন্যদিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কৌশলগত অবস্থান থানাটিকে পণ্য পারাপারের এক গুরুত্বপূর্ণ করিডোরে পরিণত করেছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ওসি সিরাজুল মোস্তফা চোরাকারবারিদের কাছ থেকে মাসোহারা সংগ্রহের একটি সুশৃঙ্খল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
কনেশতলা, মুড়াপাড়া, ধনপুর, কৃষ্ণনগর, যাত্রাখিল, সোনাইছড়ি, একবালিয়া, তালপট্টি, সুবর্ণপুর ও চৌয়ারাসহ একাধিক সীমান্তপথ দিয়ে ভারত থেকে অবাধে পণ্য ঢুকত। মোবাইল ফোন সেট, ইলেকট্রনিকস পণ্য, শাড়ি, থ্রিপিস, লেহেঙ্গা, আতশবাজি, কসমেটিকস, মসলা এবং বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য এসব পথে পাচার হতো। প্রতিটি চোরাকারবারি সিন্ডিকেট মাসে ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত মাসোহারা দিত।
পরিচিত মুখগুলো: কারা ছিল ওসির ছত্রচ্ছায়ায়?
সূত্র থেকে জানা যায়, ওসি সিরাজুলের প্রত্যক্ষ আশ্রয়ে যাঁরা সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ছিলেন তাঁদের মধ্যে রয়েছেন কোটবাড়ীর চোরাকারবারি কাউছার হোসেন, উলুরচর মোহাম্মদপুরের আলকাছ মিয়ার পুত্র মিজানুর রহমান ও তার ভাই বিল্লাল হোসেন, কবির হোসেন, একাধিক মামলার আসামি মাহাবুল হক, ধনাজোর গ্রামের সোহাগ, সুমন ও ওয়ালিদ এবং মথুরাপুরের কুখ্যাত মাদক ব্যবসায়ী জালাল উদ্দিন সিন্ডিকেট।
মাসোহারা সংগ্রহের ক্ষেত্রে থানার ওয়্যারলেস অপারেটর মো. কাইয়ুম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া বিদায়ি কনস্টেবল আব্দুল্লাহ, সিএনজিচালক দুলাল, মুন্সী ফারুক এবং এএসআই দেলোয়ারের মাধ্যমেও বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে নিয়মিত অর্থ আদায় হতো। পদুয়ার বাজার এলাকার একাধিক বাস কাউন্টার ও সিএনজিস্ট্যান্ড থেকেও মাসোহারার খাত ছিল।
ইয়াবা ধরে ছেড়ে দেওয়া এবং মাদক বিক্রির অভিযোগ
শুধু মাসোহারা নয়, সরাসরি মাদক পুনর্বিক্রির অভিযোগও উঠেছে এই ওসির বিরুদ্ধে।
ঘটনা-১: গত ২০ এপ্রিল থানা পুলিশ কচুয়ারপাড় এলাকায় মাদক ব্যবসায়ী আমানকে ১০ হাজার পিস ইয়াবাসহ আটক করে। কিন্তু কোনো আইনি ব্যবস্থা না নিয়ে ওসির নির্দেশে পাঁচ লাখ টাকার বিনিময়ে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। জব্দকৃত ১০ হাজার ইয়াবা পরবর্তীতে বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঘটনা-২: ১১ এপ্রিল শ্রীপুর শূন্য চৌমুহনী এলাকায় অ্যাপোলো-২ ডিউটি টিম ২ হাজার পিস বার্মিজ ইয়াবাসহ কচুয়ারপাড়ের মনির হোসেন এবং শ্রীপুরের স্বপনকে আটক করে। পরবর্তীতে ওসির নির্দেশে আড়াই লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে দুজনকেই ছেড়ে দেওয়া হয়। জব্দকৃত ইয়াবাগুলো ২ লাখ ৮০ হাজার টাকায় স্থানীয় এক মাদক কারবারির কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। ওই ইয়াবা চালানটি সোয়াগাজীর বিল্লাল নামে আরেক মাদক ব্যবসায়ীর কাছে পৌঁছানোর কথা ছিল।
মাদক ব্যবসায়ী মনির হোসেন সরাসরি অভিযোগ করে বলেন, এর আগে একবার ৩ হাজার এবং আরেকবার ৫ হাজার পিস ইয়াবা থানা পুলিশ আত্মসাৎ করেছে। ওসি সিরাজুল মোস্তফা এই বিষয়গুলো সম্পূর্ণ অবগত ছিলেন।
ঘটনা-৩: উপজেলার বিজয়পুর বাজারসংলগ্ন একটি ফিলিং স্টেশন থেকে এসআই নজরুল ইসলাম ও এসআই আব্দুল হক মাদক ব্যবসায়ী হারু মিয়ার ছেলে রবিনকে ১০০ পিস ইয়াবাসহ আটক করেন। পরে ওসির নির্দেশে ৪০ হাজার টাকা ঘুষ নিয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং সেই ইয়াবা অন্য মাদক ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করা হয়।
চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার থেকেও ‘সেফ প্যাসেজ’
আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, ওসির সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে চট্টগ্রাম থেকে কচ্ছপের চালান এবং কক্সবাজার থেকে ইয়াবার বড় বড় চালান এই থানা এলাকার ভেতর দিয়ে নিরাপদে পারাপার হতো। অর্থাৎ কেবল স্থানীয় চোরাচালান নয়, বরং দেশের অন্য অংশ থেকে আসা মাদকের ট্রানজিট রুট হিসেবেও এই থানাকে ব্যবহার করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করা হলে ওয়্যারলেস অপারেটর মো. কাইয়ুম বলেন, “আমাকে এসব প্রশ্ন করে লাভ নেই। ওসি স্যার যা বলেছেন, আমি তাই করেছি।” এই বক্তব্য পরোক্ষভাবে উচ্চতর নির্দেশেই কাজ হয়েছে বলে ইঙ্গিত দেয়।
এএসআই দেলোয়ার হোসেন অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে বলেন, “তথ্যটি সঠিক নয়। মাদক ব্যবসায়ীরা পুলিশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাতেই পারে।”
ওসি সিরাজুল মোস্তফা নিজে বলেন, “আমি মাসোহারা নিয়েছি এমন কোনো প্রমাণ নেই। এগুলো মাদক ব্যবসায়ী ও চোরাকারবারিদের বানোয়াট অপপ্রচার। আমি অনৈতিক মাসোহারা বা মাদক বিক্রির সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত নই।”
তবে সদর দক্ষিণ সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মোস্তাইন বিল্লাহ ফেরদৌস জানিয়েছেন, “অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয়দের ক্ষোভ ও দাবি
মথুরাপুর এলাকার বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, “ওসি সিরাজুল মোস্তফার আশ্রয়ে থেকে সীমান্তবর্তী মাদক ব্যবসায়ী ও চোরাকারবারিরা সম্পূর্ণ বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল। তিনি চলে গেলেও তাদের কার্যক্রম এখনো থামেনি।” এলাকার সচেতন মহল দাবি করছেন, কেবল প্রত্যাহার নয়, ওসি সিরাজুল মোস্তফার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তসহ ফৌজদারি মামলা করা উচিত এবং তার সঙ্গে জড়িত সকল পুলিশ সদস্য ও অ্যাসোসিয়েটদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি নষ্টের শঙ্কা
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন সদস্যের এই ধরনের কর্মকাণ্ড পুরো পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি নষ্ট করে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী থানায় যেখানে মাদক ও চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ সবচেয়ে জরুরি, সেখানে দায়িত্বরত ওসির সঙ্গেই যদি কারবারিদের আঁতাত থাকে, তাহলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা কঠিন হয়ে পড়ে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
আরও পড়ুন: শুভেন্দু অধিকারীর ব্যক্তিগত সহকারী চন্দ্রনাথ রথকে গুলি করে হত্যা, আহত গাড়িচালক



