ভালো থাকার মানে শুধু নিজে ভালো থাকা নয়

ভালো থাকার মানে

ভালো থাকার মানে যদি আমরা সত্যিকার অর্থে বুঝতাম, তাহলে চারদিকে এত হট্টগোল, মারামারি, কাটাকাটি হয়তো হতো না। ভালো থাকার মানে কেবল নিজে ভালো থাকা নয়; বরং চারপাশের মানুষগুলোকে নিয়েও ভালো থাকা। যে শুধু বলবে, ভালো থাকা মানে নিজের ভালো থাকা—সে আসলে বোকার স্বর্গে বাস করছে।

সবাই ভালো থাকতে চায়

ছাত্রছাত্রীরা তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভালো থাকতে চায়। শিক্ষক তার ছাত্রছাত্রীদের কাছে ভালো থাকতে চান। সরকার জনগণের কাছে ভালো থাকতে চায়, আবার জনগণও সরকারের কাছে ভালো থাকতে চায়। কিন্তু এই ভালো থাকতে চাওয়ার অবস্থাটা যদি পরিবর্তিত না হয়, যদি তা কখনো পূর্ণতা না পায়, আর যদি ভালো থাকার ইচ্ছা কেবল মুখের কথাতেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে কখনোই কেউ সত্যিকার অর্থে ভালো থাকতে পারবে না।

ভালো থাকা আসলে একতরফা কোনো বিষয় নয়। একজনের ভালো থাকা অনেকাংশেই অন্য একজনের আচরণ, দায়িত্ববোধ, সহানুভূতি ও সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে। তাই শুধু নিজের ভালো থাকার চিন্তা করলে হবে না; আমাদের ভাবতে হবে, আমার কারণে অন্য মানুষটি ভালো আছে কি না।

কর্মক্ষেত্রেও ভালো থাকার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ

আমি একজন বেসরকারি চাকরিজীবী। আমি আমার বসের কাছে ভালো থাকতে চাই। কিন্তু আমার বস যদি আমাকে নীতিবিরোধী কোনো কাজের চাপ দেন, তাহলে আমি তার কাছে কীভাবে ভালো থাকব? সেই অবস্থায় বসের কাছে আমার ভালো থাকা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

একজন কর্মচারী যেমন তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছ থেকে সম্মান, সহযোগিতা ও ন্যায়সংগত আচরণ প্রত্যাশা করেন, তেমনি একজন কর্মকর্তারও উচিত তার অধীনস্থ কর্মীদের প্রতি মানবিক ও ন্যায়সংগত আচরণ করা। কারণ ভালো সম্পর্ক কখনো শুধু একজনের চেষ্টায় তৈরি হয় না; দুজনের পারস্পরিক সম্মান ও বোঝাপড়ার প্রয়োজন হয়।

আন্দোলনের পেছনেও থাকে ভালো থাকার আকাঙ্ক্ষা

কোটা সংস্কার আন্দোলন হয়েছিল। লাখো শিক্ষার্থী সেই আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল। তারা নিশ্চয়ই অযৌক্তিক কোনো কারণে আন্দোলনে নামেনি। তাদের দাবির মধ্যে যৌক্তিক কোনো বিষয় থাকলে তা সরকারের বিবেচনা করা উচিত ছিল এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল।

একজন শিক্ষার্থী যখন নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়ে, তখন তার ভেতরে হতাশা তৈরি হয়। সে যখন নিজের ন্যায্য অধিকার ও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা চায়, তখন তার কথাগুলো শোনা প্রয়োজন। একজন শিক্ষার্থী যদি নিজের দেশেই নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিরাপদ ও আশাবাদী বোধ না করে, তাহলে সে কীভাবে ভালো থাকবে?

তাই কোনো আন্দোলনকে শুধু আন্দোলন হিসেবে না দেখে তার পেছনের কারণটাও বোঝা জরুরি। মানুষ কেন রাস্তায় নামে, কেন প্রতিবাদ করে, কেন নিজের কণ্ঠস্বর তুলে ধরে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পারলে হয়তো অনেক সমস্যার সমাধান আগেই করা সম্ভব।

পরিবারেও ভালো থাকার অর্থ একে অপরকে বোঝা

একটি শিশু কেবল তার মা-বাবার কাছেই ভালো কিছু প্রত্যাশা করে। একজন সাধারণ মানুষ তার পরিবার, প্রতিবেশী ও গ্রামের মানুষের কাছেও ভালো থাকার প্রত্যাশা করে। সামগ্রিকভাবে কোনো আন্দোলন যখন হয়, তখন তার পেছনেও অনেক সময় মানুষের ভালোভাবে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা কাজ করে।

খুব গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, একজন স্ত্রী যদি তার স্বামীর মনের অবস্থা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে না পারেন, তাহলে তিনি হয়তো স্বামীকে সত্যিকার অর্থে ভালো রাখতে পারছেন না। “আমি ভালো নেই”—এই কথাটি কয়জন স্বামী তার স্ত্রীকে মুখ ফুটে বলেন? বললেও খুব কম মানুষই বলেন।

অনেক পুরুষ নিজের কষ্টের কথা সহজে প্রকাশ করতে পারেন না। সংসারের দায়িত্ব, অর্থনৈতিক চাপ, কর্মক্ষেত্রের সমস্যা কিংবা ব্যক্তিগত হতাশা—সবকিছু নিজের মধ্যে রেখে দেন। বাইরে থেকে তাকে স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরে ভেতরে তিনি হয়তো অনেক কিছু সহ্য করছেন। একজন জীবনসঙ্গীর দায়িত্ব হলো শুধু সুখের সময় পাশে থাকা নয়, নীরব কষ্টের সময়টাও বুঝতে চেষ্টা করা।

ঠিক একইভাবে, একজন স্বামী যদি তার স্ত্রীর মনের গভীরের কথাগুলো বুঝতে না পারেন, তার কষ্টের সময়গুলো অনুভব করতে না পারেন, তাহলে সেই স্বামীও ব্যর্থ। কোনোভাবেই তিনি তার স্ত্রীকে সত্যিকার অর্থে ভালো রাখতে পারলেন না।

আর স্ত্রীকে ভালো না রেখে তিনি নিজেই কীভাবে ভালো থাকবেন? এই ভালো থাকার মধ্যে আমি কোনো পূর্ণতা খুঁজে পাই না।

ভালো থাকা মানে পারস্পরিক দায়িত্ব

জীবনের প্রতিটি স্তরেই লড়াই করতে হয়। জীবনের প্রতিটি সিঁড়ি অতিক্রম করতেও লড়াই করতে হয়। তা না হলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই কালের অতল গহ্বরে হারিয়ে যায়। ভালো থাকার মানে তখন মলিন হয়ে যায়।

নিষ্ঠুর এই পৃথিবীতে আপনি যদি সবসময় চুপ করে থাকেন, তাহলে শেষমেশ অনেক সময় আপনার ওপরই দোষ চাপানো হবে। কারণ মানুষ সবসময় আপনার নীরবতার অর্থ বুঝবে না। কখনো কখনো নিজের ন্যায্য অধিকারের জন্য কথা বলতে হয়, প্রতিবাদ করতে হয় এবং নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে হয়।

তবে সেই লড়াই যেন অন্যের ক্ষতির কারণ না হয়—সেটাও আমাদের মনে রাখতে হবে। নিজের ভালো থাকার পাশাপাশি অন্যের ভালো থাকার অধিকারকেও সম্মান করতে হবে। কারণ আমার অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি অন্য মানুষের অধিকারও গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারের দায়িত্ব কেন বেশি

শেষ কথা হিসেবে বলতে চাই, ভালো থাকা মানে শুধু নিজে ভালো থাকা নয়। পাশের মানুষটাকেও ভালো রাখতে হবে। যে সমাজে একজন ভালো থাকে আর অন্যজন প্রতিনিয়ত কষ্টে থাকে, সেই সমাজকে সত্যিকার অর্থে ভালো সমাজ বলা যায় না।

আমি আগেই বলেছি, সরকারের উচিত জনগণের দিকটি বিবেচনা করা, আবার জনগণেরও উচিত সরকারের দিকটি বিবেচনা করা। রাষ্ট্র ও জনগণ একে অপরের প্রতিপক্ষ নয়; বরং তারা পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।

তবে জনগণের ভালো থাকার ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব তুলনামূলকভাবে বেশি। কারণ প্রশাসনিক ক্ষমতা, আইন প্রয়োগের ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে সরকার চাইলে অনেক ধরনের অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। জনগণের বিভিন্ন সমস্যা দেখার জন্য রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও পর্যায়ে যথেষ্ট লোকবলও রয়েছে।

সুতরাং জনগণের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, অধিকার ও ভালো থাকার পরিবেশ তৈরির বড় দায়িত্ব সরকারের ওপরই বর্তায়। সরকার যদি জনগণের কথা শোনে, জনগণের সমস্যাগুলো বোঝার চেষ্টা করে এবং ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে সাধারণ মানুষের জীবন অনেকটাই স্বস্তির হতে পারে।

শেষ কথা

আমরা সবাই ভালো থাকতে চাই। কিন্তু শুধু নিজের ভালো থাকা দিয়ে ভালো থাকা সম্পূর্ণ হয় না। আপনি ভালো থাকবেন, আপনার পরিবার ভালো থাকবে, আপনার প্রতিবেশী ভালো থাকবে, আপনার সহকর্মী ভালো থাকবে—তবেই আপনার ভালো থাকাটা পূর্ণতা পাবে।

ভালো থাকা কোনো একক মানুষের বিষয় নয়; এটি একটি পারস্পরিক দায়িত্ব। আপনি অন্যকে ভালো রাখার চেষ্টা করুন, অন্যরাও আপনাকে ভালো রাখার চেষ্টা করবে। পরিবার থেকে সমাজ, কর্মক্ষেত্র থেকে রাষ্ট্র—সব জায়গায় যদি আমরা একে অপরের অবস্থাটা একটু বোঝার চেষ্টা করি, তাহলে হয়তো অনেক অশান্তি, অনেক বিরোধ এবং অনেক কষ্ট এমনিতেই কমে যাবে। কারণ শেষ পর্যন্ত ভালো থাকার আসল অর্থ হলো—নিজে ভালো থাকা এবং অন্যকেও ভালো রাখার চেষ্টা করা।

আরও পড়ুন: এইচএসসির ফলাফল, অভিমান আর চট্টগ্রামের সেই যাত্রা—যেখান থেকে ফিরে এসেছিলাম

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top