অনলাইন ইনকাম: আমার অভিজ্ঞতা, ব্যর্থতা ও সফল হওয়ার চেষ্টা

অনলাইন ইনকাম

অনলাইন ইনকাম সম্পর্কে এখন কমবেশি সবাই জানি। অনলাইনে যে সত্যিই আয় করা যায়, এটা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। তবে অনলাইন থেকে ইনকাম করাটা মোটেও সহজ নয়। এখানে অনেক ধৈর্য ধরতে হয়, অনেক পরিশ্রম করতে হয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে লেগে থাকতে হয়। তবেই অনলাইন থেকে সত্যিকারের আয় করা সম্ভব।

অনেকেই মনে করেন, একটি কম্পিউটার বা স্মার্টফোন কিনে কয়েকটি ভিডিও দেখে অনলাইনে কাজ শুরু করলেই আয় আসতে শুরু করবে। বাস্তবতা কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন। অনলাইনে আয় করতে হলে আগে একটি নির্দিষ্ট দক্ষতা অর্জন করতে হয়, সেই দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে নিয়মিত প্র্যাকটিস করতে হয় এবং সময়ের সঙ্গে নিজেকে আপডেট রাখতে হয়। আমার নিজের জীবনও এর একটি উদাহরণ।

আমার অনলাইন ইনকামের যাত্রা শুরু হওয়ার আগের গল্প

আমার একটু প্রিভিয়াস হিস্টরি শুনুন। আমি ইন্টারমিডিয়েট পাস করেছি ২০১৩ সালে। এরপর আর কোচিং করা হয়নি। তবে বেশ কিছু বই কিনেছিলাম, বাড়িতে পড়েই প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য। তখন পরিবার থেকে আমাকে বলা হলো—দ্রুত কম্পিউটার শিখতে হবে, তারপর ঢাকায় আসতে হবে। চাকরির পাশাপাশি পড়াশোনা করতে হবে।

সত্য কথা হলো, তখন আমাদের পরিবার বেশ অসচ্ছল ছিল। আমি মনে মনে ভাবলাম, কম্পিউটার অপারেটর পদে চাকরি করব এবং পাশাপাশি পড়াশোনা করতে পারব—খারাপ কী! অফারটা তো ভালোই।

আমি দ্রুত কম্পিউটার শেখা শুরু করলাম। দেবীগঞ্জে কম্পিউটার শিখেছি। আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ছিলেন রেজানুর উল্লাহ। আমি সন্ধ্যাবেলা যেতাম এবং সারারাত প্র্যাকটিস করতাম। সকালে আবার চলে আসতাম। তিনি খুব যত্নসহকারে আমাকে শিখিয়েছেন। তাঁর কাছে আমি সারাজীবনের জন্য কৃতজ্ঞ। বর্তমানে দেবীগঞ্জে তাঁর একটি কম্পিউটার সেন্টার রয়েছে, যা সুনামের সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে।

তিন মাসে কম্পিউটার শেখা এবং ঢাকায় যাত্রা

তিন মাসে বেসিক কম্পিউটারের প্রায় সবকিছুই শিখেছিলাম। এরপর আমি, মা ও ছোট বোন একসঙ্গে ঢাকায় চলে এলাম। যে চাচা আমাকে কম্পিউটার অপারেটর পদে চাকরি নিয়ে দেবেন, তাঁর আর কোনো খবর নেই। তিনি এই ব্যাপারে আমাকে কোনো সহযোগিতা করেননি। তখন আমি বেশ বিপদে পড়ে যাই।

ঢাকা শহরে তো আর কেউ এমনি এমনি খাওয়ায় না। আর চাকরি ছাড়া কতদিনই বা বেকার থাকব! এরপর কোয়ালিটি ইন্সপেক্টর পদে চাকরি খোঁজা শুরু করি। সেই চাকরিও পাচ্ছিলাম না। বোনেরও চাকরি হচ্ছিল না।

অর্থাৎ নিজের পরিচিত কেউ যদি গার্মেন্টসে চাকরি করত, তাহলে চাকরি পাওয়া তুলনামূলকভাবে সহজ হতো। কিন্তু আমার গ্রামের অনেক লোক চাকরি করা সত্ত্বেও আমার চাকরি হচ্ছিল না। এভাবে প্রায় এক মাস কেটে যায়।

হঠাৎ একদিন দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা। তিনি আমাকে দেখে অবাক হয়ে গেলেন। আমি তাঁকে সব ঘটনা খুলে বললাম। তিনি বললেন, “তোমার চাকরির অভাব? কালকেই তোমার চাকরি হয়ে যাবে।”

বাইপাইল পার হয়ে যে ইপিজেড, সেই ইপিজেডে আমি চাকরি খুঁজছিলাম। আমি কথাগুলো কেন বলছি, তার পেছনে অনেক কারণ আছে। ধৈর্য ধরে পড়তে থাকুন—অনেক কিছুই জানতে পারবেন।

গার্মেন্টসে চাকরি এবং আমার প্রথম বড় হতাশা

পরের দিন সত্যিই আমার চাকরি হয়ে গেল। মাঝখানে আরও কিছু ঘটনা ছিল, কিন্তু সেগুলো স্কিপ করলাম। আমি কোয়ালিটি ইন্সপেক্টর পদে চাকরি পেয়ে গেলাম।

২০১৩ সালে আমার বেতন ছিল প্রায় ১২ হাজার টাকা। সেই সময় ওই টাকা দিয়ে ঢাকা শহরে মোটামুটি সুন্দরভাবেই জীবনযাপন করা সম্ভব ছিল। এখন অবশ্য ৩০ হাজার টাকা দিয়েও ভালোভাবে চলা কঠিন। কিন্তু গার্মেন্টসের এই চাকরি করতে গিয়ে আমি যেন আর কিছুই করতে পারছিলাম না। পড়াশোনা করা তো প্রায় অসম্ভব ছিল।

ভোর ৫টায় উঠে গোসল করে, প্রস্তুত হয়ে খাওয়া-দাওয়া করে বের হতাম। প্রায় ৫ কিলোমিটার হেঁটে এসে মেইন রোডে উঠতাম। এরপর গাড়িতে করে গার্মেন্টসে যেতাম। আবার বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত সাড়ে ৮টা থেকে ৯টা বেজে যেত।

সারাদিনের পরিশ্রমে শরীর ক্লান্ত হয়ে থাকত। খাওয়া-দাওয়া করে খুব তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়তাম। কারণ, সকালে আবার উঠতে হবে। তখন আমার হাতে কোনো স্মার্টফোনও ছিল না।

আমি যে উদ্দেশ্য নিয়ে ঢাকা শহরে পাড়ি জমিয়েছিলাম, সেই উদ্দেশ্য সফল হয়নি। আমি যা করতে চাইনি, সেটাই যেন করছিলাম। এই চাকরি আমার ভালো লাগছিল না। একাকিত্ববোধ করতাম। নিজের মনকে বোঝাতে পারতাম না।

কম্পিউটারের প্রতি আমার ভালোবাসা

কম্পিউটারের প্রতি আমার এতটাই ঝোঁক ছিল যে, আমার এক চাচার কম্পিউটার ছিল। শুধু সেটি একটু টিপাটিপি করার জন্যও প্রায় ৩ কিলোমিটার হেঁটে যেতাম।

সেখানে কোনো রকমে মাইক্রোসফট অফিসের কাজ প্র্যাকটিস করে আবার চলে আসতাম। খুব কষ্ট হতো আমার। অথচ প্রতি শুক্রবার আমি এমনটাই করতাম।

এভাবে প্রায় চার মাস চাকরি করেছি। তারপর আর কন্টিনিউ করিনি। গোপনে চাকরি ছেড়ে চলে এসেছি এবং আর যাইনি। আমার সেই দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের স্ত্রী আমাকে চাকরিটা নিয়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁকেও বলে আসিনি। তিনিও খুব মনঃক্ষুণ্ন হয়েছিলেন। আমি আসলে তাঁর কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।

পড়াশোনার সুযোগও হাতছাড়া হয়ে গেল

চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পর কী করি, তা নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেলাম। ওহ, আরেকটি ঘটনা শেয়ার করি।

আমার তো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গার্মেন্টসে চাকরি নেওয়ার পর আমি সেই চিন্তা মাথা থেকে বাদ দিয়ে দিয়েছিলাম। কারণ, সেটা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। আমি কোনো প্রস্তুতিই নিতে পারিনি।

তখন আমি অনার্সে কোনো একটি কলেজে ভর্তি হওয়ার ইচ্ছা করলাম। আমার পাশেই ছিল ধামরাই সরকারি কলেজ। আমি মূলত পল্লী বিদ্যুৎ মেইন রোড থেকে প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরে মাজার এলাকায় থাকতাম।

কোনো এক শুক্রবার একটি কম্পিউটারের দোকানে গিয়ে ধামরাই সরকারি কলেজের জন্য একটি ফরম উঠাই। এরপর কম্পিউটার অপারেটরকে বললাম, “এটা এখন কী করব?”

তিনি আমাকে বললেন, পরীক্ষার দিন যেন আমি এটা সঙ্গে নিয়ে যাই। আমি বিষয়টি নিয়ে কয়েকজন বন্ধু ও এক বড় ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম। তাঁরাও একই কথা বললেন। কলেজে যে আগে ফরম জমা দিতে হয়, বিষয়টি আমার বোধগম্যের বাইরে ছিল।

আমি সেই ফরম বাসায় রেখে দিলাম এবং পরীক্ষার দিন শুক্রবার সেটা নিয়ে পরীক্ষা দিতে গেলাম। কলেজে যাওয়ার পর গেটের বাইরে রয়ে গেলাম। কারণ, আমার সিট ছিল একদম লাস্ট। অর্থাৎ আমার পরে আর কেউ ফরম তুলেনি। কিন্তু আমি তো টাকা ও কাগজপত্র জমা দিইনি। তাই আমার পরীক্ষা নেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না।

আমি কলেজের অধ্যক্ষকে অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু পরীক্ষা শুরু হওয়ার মাত্র কয়েক মিনিট বাকি ছিল। তাই তাঁদের পক্ষেও আসলে কিছু করার ছিল না। পরীক্ষা আর দিতে পারলাম না। ফিরে এলাম নীড়ে। বাসার কাউকে এই ঘটনা খুলে বলিনি। খুলে বললে আমার মা অনেক কষ্ট পেতেন।

বেকার অবস্থায় রাজমিস্ত্রির কাজ

আপনারা শুনলে অবাক হবেন, চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পর আমি বেকার হয়ে পড়েছিলাম। ইজ্জত বাঁচানোর জন্য রাজমিস্ত্রির কাজে গিয়েছিলাম এবং সারাদিনে ২৫০ টাকা আয় করেছিলাম।

জীবনে মাত্র একদিন এই কাজ করেছি। যাঁর অধীনে রাজমিস্ত্রির কাজ করেছিলাম, তিনি একটু-আধটু ভুলের জন্য আমাকে সেদিন অনেক কথা বলেছিলেন। কিন্তু যখন জানতে পেরেছিলেন যে আমি ইন্টারমিডিয়েট পাস করেছি, তখন তিনি আমার সঙ্গে অনেক ভালো ব্যবহার করেছিলেন। আমি তাঁকে সারাজীবন মনে রাখব।

ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপনে ৪৫০০ টাকা হারানো

এরপর আর কী করার! বাসাতেই রয়ে গেলাম। ছোট বোন চাকরি করছিল এবং তার টাকা দিয়েই আমাদের ঢাকার সংসার চলছিল। এরপর ঘটে গেল আরেকটি অঘটন।

আমি পত্রিকায় একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখে অনলাইনে আবেদন করে ফেলি। সেটি ছিল বাংলালিংক নেটওয়ার্কিংয়ে চাকরির বিজ্ঞপ্তি। বিকাশে তাদের ৪৫০০ টাকাও পাঠিয়েছিলাম।

পরে বুঝতে পারি, প্রকৃতপক্ষে চাকরির বিজ্ঞপ্তিগুলো ভুয়া ছিল। এখন বুঝি, চাকরির নামে এ ধরনের প্রতারণা থেকে সতর্ক থাকা কতটা জরুরি। তারপরও এই বিজ্ঞাপনগুলো পত্রিকায় কীভাবে ছাপা হতো, সেটা আমি বুঝতাম না। হাজার হাজার তরুণ প্রতিনিয়ত এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

ওরা আমার কাছ থেকে শুধু টাকা নিয়েই ক্ষান্ত হয়নি; বরং আমাকে আমার জেলা পঞ্চগড় পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিল। যখন দেবীগঞ্জ পার হয়ে লক্ষ্মীরহাটে পৌঁছেছি, তখন তারা আমার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।

আসলে তখন এসব চাকরির প্রতারণা সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই ছিল না। বেকার ছিলাম, তাই হুজুগে সামনে যা পেয়েছি, তাই করার চেষ্টা করেছি।

গ্রামের বাড়িতে কম্পিউটারের দোকান

এরপর গ্রামের বাড়ি থেকে আমার বড় ভাই ঢাকায় এসেছিলেন। তিনি সিদ্ধান্ত দিলেন, আমি আবার গ্রামে চলে যাই এবং সেখানেই কিছু একটা করি। সত্যিই তাই হলো। কিছুদিন পর আমরা সবাই আবার গ্রামের বাড়িতে চলে গেলাম।

সেখানে আমি একটি কম্পিউটারের দোকান দিলাম। তখন মেমোরি লোড, ফটোকপি, প্রিন্ট, ইন্টারনেট সেবা এবং আরও টুকিটাকি কাজ করতাম। কোনো মতে দিন চলত।

আর পড়াশোনা?

গ্রামের বাড়িতে পৌঁছানোর কয়েকদিন পর জানতে পারলাম, ডিগ্রিতে তখনও আবেদন করা যাবে এবং ভর্তি হওয়া যাবে। তাই কিছু না ভেবেই ডিগ্রিতে ভর্তি হয়ে গেলাম। পড়াশোনাটা কোনো রকমে চলতে লাগল আরকি!

বিয়ে এবং নিজের ব্যবসা

এর কিছুদিন পরেই আমি বিয়ে করে ফেলি। আসলে বিয়েটা আমি ইচ্ছা করে করিনি; বাসা থেকে চাপ দিচ্ছিল। পরে সবকিছু বিবেচনা করে বিয়েতে মত দিই এবং বিয়ে করি।

কম্পিউটারের দোকানটি দুজন মিলে করতাম। অর্থাৎ আমার একজন পার্টনার ছিল। তাঁর নাম ওসমান। তিনি সত্যিকার অর্থেই খুব ভালো মানুষ। তাঁর পরিবারের সবাইও খুব ভালো মানুষ।

কিন্তু ব্যবসাটা একসঙ্গে আর করা হয়ে উঠল না। কিছু বিষয় নিয়ে দুজনের মধ্যে অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত আমরা আলাদা হয়ে যাই এবং আমি আলাদা দোকান দিই। আর এখান থেকেই মূল গল্পটা শুরু।

ইউটিউব থেকে আমার প্রথম অনলাইন ইনকাম

আমি যখন আলাদা দোকান দিই, তখন ওয়াই-ফাই সংযোগ ছিল না। আমার হাতে ছিল সিম্ফনি ব্র্যান্ডের একটি অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন। অবশ্য ফোনটির ক্যামেরা বেশ ভালো ছিল। সেই ক্যামেরা দিয়ে আমি ফানি ভিডিও তৈরি করা শুরু করি। এলাকার ছেলে-মেয়েরা আমাকে সহযোগিতা করত।

তখন ইউটিউবে মনিটাইজেশনের নিয়মকানুন এখনকার মতো ছিল না। চ্যানেল তৈরি করে ভিডিও আপলোড করার পর তুলনামূলক সহজেই মনিটাইজেশন চালু করা যেত।

তখন আমার একটু একটু আয় হচ্ছিল। সেটা আসলে খুবই কম। ধরে নিতে পারেন, ১ ডলার আয় করতে আমার প্রায় ১৫ দিন সময় লাগত। অর্থাৎ মাসে মাত্র ২ ডলারের মতো।

কিছুদিন পর ইউটিউব তাদের নিয়মে পরিবর্তন নিয়ে এল। তখন চ্যানেল মনিটাইজেশনের জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক সাবস্ক্রাইবার ও ভিউয়ের শর্ত পূরণ করতে হতো। আমার চ্যানেলে তখন এসব শর্ত পূরণ ছিল না। পরে একটু ভালোভাবে কাজ করে কিছুদিনের মধ্যেই সেই শর্ত পূরণ করে ফেলি। তখন বেশ আয় হচ্ছিল। মাসে অন্তত ৪০ ডলার। তিন মাস পরে আমি ১০০ ডলার উইথড্র করি। এরপর আবার বিভিন্ন ধরনের ভিডিও তৈরি করা শুরু করি।

কম রিসোর্সে ইউটিউবের কাজ

কিন্তু আমার কোনো সাপোর্ট ছিল না। ডুয়াল-কোর কম্পিউটার দিয়ে কাজ করতাম। ক্যামটেশিয়া ভিডিও এডিটিং সফটওয়্যার কোনো রকমে চলত। আমার কোনো এইচডি ক্যামেরাও ছিল না।

তখন ইউটিউবের রুলস ও রেগুলেশন তেমনভাবে জানতাম না। সত্যি বলতে, জানার জন্য তেমন চেষ্টাও করিনি। এটাই ছিল আমার বড় ভুলগুলোর একটি।

অনলাইনে শুধু কাজ করলেই হবে না; যে প্ল্যাটফর্মে কাজ করবেন, সেই প্ল্যাটফর্মের নিয়ম, কপিরাইট, মনিটাইজেশন পলিসি এবং কমিউনিটি গাইডলাইন সম্পর্কেও জানতে হবে।

একটি ভুলেই ইউটিউব চ্যানেল হারালাম

কিছুদিন পরে আমি কয়েকটি ভারতীয় চ্যানেলের মুভি ডাউনলোড করে আমার চ্যানেলে আপলোড দিই। আপলোড দেওয়ার সাত দিনের মাথায় আমার চ্যানেলে কপিরাইট স্ট্রাইক আসে এবং চ্যানেলটি গায়েব হয়ে যায়। সেই চ্যানেলের নাম ছিল Azgar620। তখন আমি অনেক ভেঙে পড়ি। দোকানটাও তেমন ভালো চলছিল না।

তখন ফ্রিল্যান্সিং বলতে আমি কেবল ইউটিউবকেই বুঝতাম। আমি যখন ইউটিউবে কাজ শুরু করেছিলাম, তখন বাংলাদেশের বর্তমান টেক ইউটিউবার সোহাগ৩৬০-এর চ্যানেলে মাত্র ১০ হাজারের মতো সাবস্ক্রাইবার ছিল। আমার চ্যানেল গায়েব হওয়ার আগে আমার চ্যানেলে প্রায় ১২ হাজার সাবস্ক্রাইবার ছিল।

আজ বুঝি, ওই ঘটনাটি আমার জন্য একটি বড় শিক্ষা ছিল। অনলাইনে নিজের প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে যেমন সময় লাগে, তেমনি সেটিকে টিকিয়ে রাখতে নিয়ম-কানুন জানা আরও বেশি জরুরি।

ওয়েব ডেভেলপমেন্ট শেখার চেষ্টা

এরপর আইটি বাড়ি থেকে ওয়েবসাইট ডেভেলপমেন্টের একটি কোর্স নিয়েছিলাম। তখন তারা ডিভিডি বিক্রি করত। এখন করে কি না, জানি না। সেটিও বেশ কিছুদিন শিখেছিলাম। তারপর হাল ছেড়ে দিই।

আসলে পারিবারিক, মানসিক ও পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন কারণে মনোবল ভেঙে গিয়েছিল। সাপোর্ট না থাকলে যা হয় আরকি! এরপর কয়েক বছরে অনেক কিছু ঘটে গেছে। সেগুলো আর বলছি না। বলতে গেলে অনেক সময় লাগবে।

মাঝখানে আমার হাইস্কুলে, অর্থাৎ যে স্কুলে আমি পড়াশোনা করেছি, সেখানে ল্যাব সহকারী হিসেবেও কাজ করেছি। কোনো আনুষ্ঠানিক নিয়োগ ছিল না। তবে স্যাররা আমাকে ল্যাব সহকারী হিসেবে নিতে চেয়েছিলেন। পরে সেটার আর নিয়োগ হয়নি।

চাকরির পাশাপাশি ডিজিটাল মার্কেটিং শেখা

এত কিছু হয়ে গেছে, কিন্তু আমি কম্পিউটার থেকে নিজেকে আলাদা করতে পারিনি। আমার ইচ্ছা খুব ছিল। এখনও আছে। এরপর ২০২১ সালের শেষের দিকে একটি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিতে যোগ দিই। সেখানেই এখন পর্যন্ত কাজ করছি।

তবে সেই চাকরির পাশাপাশি আমি বহুব্রীহি থেকে ফুল-স্ট্যাক ডিজিটাল মার্কেটিং কোর্স এবং টেন মিনিট স্কুল থেকে ইমেইল মার্কেটিং কোর্স সম্পন্ন করি।

আমার একটি ওয়েবসাইট রয়েছে । পাশাপাশি Azgar’s Life নামের একটি ইউটিউব চ্যানেলও রয়েছে, যেটিতে মনিটাইজেশন চালু আছে আমি ভবিষ্যতে একজন ডিজিটাল মার্কেটিং এক্সপার্ট হতে চাই। আমার স্বপ্নকে আমি বাস্তবায়ন করবই, ইনশাআল্লাহ।

ডিজিটাল মার্কেটিং শেখা সহজ নয়

ইমেইল মার্কেটিংয়ে আমি মূলত Mailchimp এবং Klaviyo সম্পর্কে শিখেছি। আর ফুল-স্ট্যাক ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে প্রায় সবকিছুই শেখার চেষ্টা করেছি।

তবে এসব অনেক ধৈর্যের ব্যাপার এবং নিয়মিত প্র্যাকটিসের বিষয়। প্র্যাকটিস ছাড়া এসব মনে রাখা কঠিন। তার ওপর ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের বিভিন্ন টুল, অ্যালগরিদম, প্ল্যাটফর্ম ও কৌশল নিয়মিত আপডেট হয়। তাই শুধু একবার কোর্স করলেই হবে না। শেখার পাশাপাশি নিয়মিত প্র্যাকটিস করতে হবে এবং নতুন আপডেট সম্পর্কে জানতে হবে।

আমি কেন এখনো সফল হতে পারিনি?

আমি যদি এই চাকরি না করতাম এবং ফুল-টাইম ডিজিটাল মার্কেটিং শিখতাম, তবে হয়তো আজ আমি একজন সফল ডিজিটাল মার্কেটার হিসেবে ক্যারিয়ার গড়তে পারতাম।

কিন্তু এখনও তা হয়ে ওঠেনি। তবে হবে, ইনশাআল্লাহ। মূল কথায় আসি।

অনলাইনে যারা ইনকাম করতে চান, তারা যদি শুধু টাকার কথা মাথায় রেখে শিখতে থাকেন, তাহলে সফল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কমে যায়। কারণ, যখনই আয় করতে পারবেন না, তখনই আপনার মন ভেঙে যাবে। তাই শুরুতেই কত ডলার আয় করবেন, কত টাকা আয় করবেন—এসব চিন্তা না করে আগে দক্ষতা অর্জনের দিকে মনোযোগ দিন।

একটি নির্দিষ্ট বিষয় ভালোভাবে শিখুন। সেটা হতে পারে ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের কোনো একটি শাখা, ওয়েব ডিজাইন, গ্রাফিক্স ডিজাইন, এসইও, ফেসবুক মার্কেটিং, সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং, কনটেন্ট রাইটিং, ভিডিও এডিটিং কিংবা অন্য কোনো অনলাইন স্কিল। অনলাইন ইনকাম করতে গিয়ে হ য ব র ল আকারে কোন কিছু করবেন না।

অনলাইন ইনকাম করতে হলে কী করবেন?

আমার অভিজ্ঞতা থেকে অন্তত এতটুকু বলতে পারি—একসঙ্গে অনেক কিছু শেখার চেষ্টা না করে প্রথমে একটি বিষয় বেছে নিন। অনলাইন ইনকাম করতে গিয়ে বেশিরভাগ মানুষই এই ভুলটাই শুরুতে করে ফেলে।

প্রথমে সেই বিষয়টির বেসিক শিখুন। এরপর নিয়মিত প্র্যাকটিস করুন। নিজের কাজের একটি পোর্টফোলিও তৈরি করুন। ছোট ছোট কাজ দিয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করুন। তারপর ধীরে ধীরে ক্লায়েন্ট, মার্কেটপ্লেস, নিজের ওয়েবসাইট, ইউটিউব কিংবা অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে কাজের সুযোগ খুঁজুন।

আর একটি বিষয় অবশ্যই মনে রাখবেন—অনলাইন ইনকামের ক্ষেত্রে প্রতারণা থেকে সতর্ক থাকতে হবে। কেউ যদি বলে, “১০ হাজার টাকা দিন, আপনাকে নিশ্চিতভাবে মাসে ৫০ হাজার টাকা আয় করিয়ে দেব”—তাহলে খুব সতর্ক হবেন। অনলাইনে নিশ্চিত আয়ের কোনো শর্টকাট নেই।

দক্ষতা, পরিশ্রম, ধৈর্য, সঠিক দিকনির্দেশনা এবং সময়—এই বিষয়গুলোই দীর্ঘমেয়াদে আপনাকে এগিয়ে নিতে পারে।

আমার ব্যর্থতার কারণগুলো কী ছিল?

আপনারা তো পুরো গল্পটি পড়েছেন। মোটামুটি যতটা পারি শেয়ার করেছি। অনলাইন ইনকাম নিয়ে প্রায় সব কথাই বলেছি।

আমি এখন পর্যন্ত সফল না হওয়ার জন্য নিজেকেই সবচেয়ে বেশি দায়ী মনে করি। আমার পরিবারও কিছু ক্ষেত্রে দায়ী ছিল। আমি নিজে দায়ী বলতে বুঝি—আমি কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি, এক জায়গায় স্থির থাকতে পারিনি।

আমাকে কেউ গাইডলাইন দেয়নি। আমি কোনো উপযুক্ত মেন্টরের সান্নিধ্যও পাইনি। এগুলোকে অজুহাত বলেন আর যা-ই বলেন, আমার ক্ষেত্রে এগুলো সমস্যা হিসেবে কাজ করেছে।

তবে এখন আমি বুঝতে পারি, জীবনে সব সময় সাপোর্ট পাওয়া যাবে না। অনেক সময় নিজের পথ নিজেকেই খুঁজে নিতে হয়। ভুল থেকে শিখে আবার শুরু করতে হয়। আরেকটা বিষয় হলো, অনলাইন ইনকাম নিয়ে আমি হয়তো হার্ড ডিসিশন নেইনি। তবে আমার নেয়া উচিত ছিল।

আপনি চাইলে আপনার গল্পটাও বদলাতে পারেন

এখন আপনি যদি এই সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠতে পারেন, নিজের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিতে পারেন, কষ্ট করতে পারেন এবং নিজের সিদ্ধান্তে স্থির থাকতে পারেন, তাহলে আপনার সফল হওয়ার পথ কেউ আটকে রাখতে পারবে না।

আপনি সফল হবেনই—ইনশাআল্লাহ। তবে ভাই, খুব কঠিন। অনলাইনে ভালো কিছু করা সত্যিই কঠিন। ধৈর্য থাকে না, আর পরিবার যদি সাপোর্ট না দেয়, তাহলে পথটা আরও কঠিন হয়ে যায়। অনেকেই কয়েক মাস চেষ্টা করে ফল না পেয়ে হাল ছেড়ে দেন।

কিন্তু আপনি যদি দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যান, প্রতিদিন একটু একটু করে শিখতে থাকেন এবং নিজের দক্ষতা বাড়াতে থাকেন, তাহলে একদিন না একদিন ফল পাবেনই।

কম বয়স থেকেই শুরু করুন

সময় পরিবর্তনের সঙ্গে সবকিছু পরিবর্তন হবেই। আপনি না চাইলেও পরিবর্তন হবে। মানুষের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার পছন্দ-অপছন্দ, দায়িত্ব এবং জীবনের অগ্রাধিকারও পরিবর্তিত হয়। তাই সম্ভব হলে অনলাইন ইনকাম এর জন্য কম বয়স থেকেই নিজের দক্ষতা তৈরির কাজ শুরু করুন। অনলাইন ইনকাম এর বিষয়টি শুরু থেকেই গুরুত্ব দিন।

তবে বয়স হয়ে গেছে বলে কেউ হতাশ হবেন না। শেখার কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই। আপনি আজ শুরু করলে আজ থেকেই আপনার নতুন যাত্রা শুরু হতে পারে। এমন অনেক মানুষ আছে যারা ৪০ পার করে শুরু করার পরও আজ অনলাইন ইনকাম পথচলায় তারা সফল।

শেষ কথা

আমার পুরো গল্পটি পড়েছেন। আমি আমার জীবনের ব্যর্থতা, ভুল, চেষ্টা এবং অনলাইন ইনকামের অভিজ্ঞতার যতটা সম্ভব আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করেছি।

আমি এখনও নিজেকে সফল ডিজিটাল মার্কেটিং এক্সপার্ট মনে করি না। বরং আমি এখনও শেখার পর্যায়ে আছি। প্রতিদিন কিছু না কিছু শেখার চেষ্টা করছি এবং নিজের স্বপ্নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।

আমার জন্য দোয়া করবেন, যেন আমি একজন প্রফেশনাল ডিজিটাল মার্কেটিং এক্সপার্ট হতে পারি। আমি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আপনারাও শুরু করুন। একটি স্কিল বেছে নিন, নিয়মিত শিখুন, প্র্যাকটিস করুন এবং লেগে থাকুন। অনলাইন ইনকামকে দ্রুত টাকা আয়ের মাধ্যম হিসেবে না দেখে নিজের ক্যারিয়ার ও দক্ষতা গড়ার একটি সুযোগ হিসেবে দেখুন।

জীবনে যত বাধা-বিপত্তিই আসুক না কেন, নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকুন। ব্যর্থতা আসতে পারে, ভুল হতে পারে, কিন্তু সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে আবার শুরু করুন। সবার জীবনে পূর্ণতা আসুক। আল্লাহ সবাইকে ভালো রাখুন—এই কামনায় ইতি টানলাম।

আরও পড়ুন: এসএসসিতে টেনেটুনে পাস করেছো? এখন কী করবে?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top