উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আগাম বন্যার আশঙ্কা: পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে যাচ্ছে হাওরের ফসল, বিপদের মুখে পাঁচ নদী

উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আগাম বন্যা ও হাওরে ফসলের ক্ষতি

দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে চলতি মৌসুমের আগেই বন্যার ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং টানা কয়েকদিনের অবিরাম বৃষ্টিপাতের ফলে সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোণা জেলার হাওর অঞ্চলগুলো এখন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে কৃষকের স্বপ্নের ফসল এখন পানির নিচে তলিয়ে যেতে শুরু করেছে। ধানের মৌসুমের আগেই এই আগাম বন্যা হাওরাঞ্চলের লাখো কৃষক পরিবারের মুখের হাসি কেড়ে নেওয়ার উপক্রম করছে।

পাঁচ নদীর পানি বিপৎসীমার উপরে

পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী জানিয়েছে, বর্তমানে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মোট পাঁচটি নদীর পানি প্রাক-মৌসুমী বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

এর মধ্যে রয়েছে:

  • সুনামগঞ্জের নলজুর নদী — জগন্নাথপুর পয়েন্টে বিপৎসীমার উপরে
  • নেত্রকোণার ভুগাই-কংস নদী — জারিয়াজাঞ্জইল পয়েন্টে বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে
  • সোমেশ্বরী নদী — কলমাকান্দা পয়েন্টে পানি বিপজ্জনক মাত্রায়
  • মগরা নদী — নেত্রকোণা ও আটপাড়া উভয় পয়েন্টে বিপৎসীমার উপরে
  • হবিগঞ্জের সুতাং নদী — সুতাং-রেলওয়ে ব্রিজ পয়েন্টে পানি বিপজ্জনকভাবে বাড়ছে

এছাড়া সিলেট জেলার সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি সমতল গত ২৪ ঘণ্টায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে বুলেটিনে জানানো হয়েছে।

সবচেয়ে বিপদে নেত্রকোণা

বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে নেত্রকোণা জেলা। গত চার দিন ধরে ওই জেলা এবং সীমান্তের ওপারে ভারতের মেঘালয় ও আসাম অঞ্চলে থেমে থেমে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। এই বৃষ্টির ধারা আরও অন্তত তিন দিন অব্যাহত থাকার পূর্বাভাস দিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা।

ফলস্বরূপ, নেত্রকোণা ও কিশোরগঞ্জ জেলার ভুগাই-কংস নদী এবং ধনু-বাউলাই নদীর পানি আগামী তিন দিনে আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষভাবে বাউলাই নদীর খালিয়াজুরী পয়েন্টে দ্বিতীয় দিনেই প্রাক-মৌসুমী বিপৎসীমা অতিক্রম করার সম্ভাবনা রয়েছে, যা হাওর সংলগ্ন নিচু এলাকাগুলোর জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।

সিলেট-সুনামগঞ্জে নদীর পানি কোথায় যাচ্ছে?

সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলায় সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি সমতল আগামী একদিন মোটামুটি স্থিতিশীল থাকলেও পরবর্তী দুই দিনে দ্রুত বৃদ্ধির আশঙ্কা করা হচ্ছে। ওই সময় এই দুটি নদীর পানি সতর্কসীমা পর্যন্ত উঠে যেতে পারে বলে পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে সুরমা ও কুশিয়ারা নদী তীরবর্তী বসতি ও কৃষিজমি নতুন করে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জেও বিপদের পূর্বাভাস

উত্তর-পূর্বের আরও দুটি জেলা মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। মনু, খোয়াই ও জুড়ি নদীর পানি আগামী তিন দিনে ধারাবাহিকভাবে বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জুড়ি নদীর পানি দ্বিতীয় দিনে বিপৎসীমা পেরিয়ে যেতে পারে, আর মনু ও খোয়াই নদী তৃতীয় দিনে বিপজ্জনক মাত্রায় উপনীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে এই দুটি জেলার হাওর সংলগ্ন নিচু এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি মারাত্মক রূপ নিতে পারে।

কৃষকদের জন্য আশঙ্কার কারণ কী?

হাওর অঞ্চলে সাধারণত বোরো ধানই প্রধান ফসল। মার্চ-এপ্রিল মাসে এই ধান পাকার আগেই যদি বন্যার পানি খেতে ঢোকে, তাহলে পুরো মৌসুমের ফসল নষ্ট হয়ে যায়। এই ধরনের আগাম বা ‘অকাল’ বন্যা হাওরের কৃষকদের কাছে সবচেয়ে ভয়ের বিষয়। এবারও একই পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় হাজার হাজার কৃষক পরিবার চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। মাঠের পর মাঠ পানিতে তলিয়ে যাওয়ার দৃশ্য ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে একাধিক উপজেলায়।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের পরামর্শ

পরিস্থিতির অবনতি ঠেকাতে বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র সংশ্লিষ্ট জেলার প্রশাসন ও স্থানীয় জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে। হাওর এলাকায় বসবাসকারী মানুষজনকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার পাশাপাশি কৃষকদের যতটুকু সম্ভব দ্রুত ধান কেটে ঘরে তোলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া নদী তীরবর্তী বেড়িবাঁধগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখারও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সার্বিক পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর। বন্যার পানি আরও বাড়লে ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।

আরও পড়ুন: সুখী দাম্পত্য জীবনের রহস্য: ৩৩ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে একজন স্বামী ও পিতার অকপট কথা

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top