এসএসসিতে টেনেটুনে পাস করেছো? এখন কী করবে?

এসএসসি পাস

কয়েকদিন আগেই এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট দিলো। তোমরা অনেকেই এসএসসি পাস করেছো। কেউ হয়তো গোল্ডেন এ প্লাস, আবার কেউ এ প্লাস কিংবা কেউ ৪.৮০, ৪.৫০ বা ৩.০০ বা ২.০০—অর্থাৎ টেনেটুনে। তো, যে যেভাবেই পাস করো না কেন, তোমাদের জন্য আজ থাকছে অতি প্রয়োজনীয় কিছু কথা, যা তোমার ভবিষ্যৎ জীবনে অনেক প্রভাব ফেলতে পারে।

রেজাল্ট দিয়ে নিজের ভবিষ্যৎকে বিচার করো

তুমি বা তোমরা এখন যে রেজাল্ট করেছো, এই রেজাল্টের বেইজ করে তোমাকে তোমার জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। তুমি যদি সত্যবাদী হও, তবে তোমার জন্য সিদ্ধান্তটা নেওয়া খুবই সহজ। আর যদি মিথ্যাবাদী হও, তাহলে তুমি হয়তো সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে পারো। যাই হোক, আমি আমার কথাগুলো বলে যাবো। তুমি কতটুকু গ্রহণ করবে, এটা তোমার ব্যাপার।

তুমি টেনেটুনে পাস করেছো, তার মানে স্বাভাবিকভাবেই বোঝা যাচ্ছে যে, তুমি হয়তো খুব বেশি পড়াশোনা করোনি। এটা সবাই বলবে। তুমি হয়তো স্কুল ফাঁকি দিয়েছো। তুমি হয়তো মোবাইল ফোন বেশি ব্যবহার করেছো। তুমি হয়তো তোমার বাবা-মায়ের ভালো কথাগুলো শোনোনি। এমনটা কিন্তু হতেই পারে। হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

মানুষ ভুল করতেই পারে। জীবনের একটি সময়ে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া মানেই এই নয় যে, সারাজীবন তোমাকে সেই ভুলের ফল ভোগ করতে হবে। বরং নিজের ভুল বুঝতে পারাটাই সবচেয়ে বড় বিষয়। তুমি কোথায় সময় নষ্ট করেছো, কোথায় অবহেলা করেছো এবং কোথায় নিজের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করোনি—সেগুলো খুঁজে বের করতে হবে।

যদি তুমি সত্যিই চেষ্টা করেও ভালো ফল না পাও?

কিন্তু যদি এর ব্যতিক্রম হয়, অর্থাৎ তুমি তোমার বাবা-মায়ের সব কথা শুনেছো, ঠিকমতো পড়াশোনা করেছো, ফাঁকি দাওনি কিংবা মোবাইল ফোন খুব একটা ব্যবহার করোনি, তাহলে কিন্তু বিষয়টা একদম ভিন্ন।

যদি সত্যিই এরকম হয়, তাহলে তোমাকে আরও বেশি ভেবে-চিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রথম প্রশ্ন মনের মধ্যে আনতে হবে যে, কোন কোন কারণে তাহলে রেজাল্ট এত খারাপ হতে পারে? তারপর তোমার ভুল ছিল কি না, সেটা খুঁজে দেখতে হবে।

তুমি হয়তো সঠিকভাবে পড়েছো, কিন্তু পড়ার পদ্ধতিটা সঠিক ছিল না। হয়তো তুমি পড়েছো, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বুঝে পড়োনি। হয়তো পরীক্ষার হলে সময় ব্যবস্থাপনায় সমস্যা হয়েছে। অথবা মানসিক চাপ, ভয় কিংবা অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার কারণেও ফলাফল প্রত্যাশার চেয়ে খারাপ হতে পারে।

যদি তুমি তোমার ভুল খুঁজে পাও, তাহলে তো খুবই ভালো বিষয়। তোমার ভুল শুধরে নিয়ে ভবিষ্যতে লেখাপড়ায় আরও ভালো করতে পারবে তুমি। কিন্তু যদি কোনো কারণই খুঁজে না পাও, তবে তোমার জন্য ভেবে-চিন্তে সব ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

পড়াশোনায় মন না বসলে কী করবে?

তোমার মন যদি পড়াশোনায় একদম না টানে, কিছুতেই মন বসতে চায় না পড়ার টেবিলে এবং এই ধরনের অনুভূতি যদি বহুদিন থেকে তোমার মধ্যে উপলব্ধির জন্ম দেয়, তবে জীবনে তুমি কী করবে, সেটা নিয়ে ভালোভাবে ভাবা উচিত।

কারণ, এই যুগে টেনেটুনে পাস করে আসলে খুব ভালো কিছু করতে পারবে না চাকরির বাজারে। তবে তার মানে এই নয় যে, কম রেজাল্ট করা একজন মানুষ জীবনে সফল হতে পারবে না। বরং বাস্তবতা হলো—জীবনে সফল হওয়ার পথ একটাই নয়।

চাকরির বাজারে ঢুকতে হলে হয় তোমার মেধা থাকতে হবে, নয়তো টাকা থাকতে হবে। কারণ, পরিস্থিতি বিবেচনায় তুমি বিভিন্ন ভালো ভালো জায়গায় ঘুষ দিয়েও চাকরি নিতে পারবে। তবে এ ধরনের বিষয়কে তোমার লক্ষ্য বানানো উচিত নয়। কারণ, এটা তো খারাপ কাজ—ঘুষ দিয়ে চাকরি নেওয়া। চাকরি পেলেও হয়তো জীবনে সুখী হতে পারবে না।

তাই অন্যায় পথে যাওয়ার চিন্তা না করে নিজের যোগ্যতা তৈরি করো। যোগ্যতা থাকলে হয়তো চাকরি পাবে, ব্যবসা করতে পারবে, নিজের কোনো দক্ষতাকে কাজে লাগাতে পারবে কিংবা এমন কোনো কাজ করতে পারবে, যা আজ তুমি কল্পনাও করতে পারছো না।

এইচএসসিতে নতুন করে শুরু করো

তো, যাই হোক, আমার কথা হলো—তুমি টেনেটুনে পাস করার পর মন চাইলে টেনেটুনে এইচএসসি পাসটাও করে ফেলো।

আর যদি মনে হয় যে, তুমি টেনেটুনে পাস করার ছাত্র নও—কোথাও কোনো ভুলের কারণে তোমার রেজাল্ট খারাপ হয়েছে এবং এই ব্যাপারে তোমার অসীম আত্মবিশ্বাস থাকে, তবে তুমি এইচএসসি পাস ভালোভাবে করার জন্য জীবনযুদ্ধে নেমে যাও।

কারণ, এসএসসিতে খারাপ করার পরেও অসংখ্য উদাহরণ আছে, যারা এইচএসসিতে গিয়ে অনেক ভালো রেজাল্ট করেছে। এসএসসির ফলাফল তোমার জীবনের শেষ ফলাফল নয়। এটি কেবল তোমার জীবনের একটি ধাপ।

তাই এসএসসির রেজাল্ট খারাপ হয়েছে বলে নিজেকে ছোট ভাবার কোনো কারণ নেই। বরং এটাকে একটি শিক্ষা হিসেবে নাও। এবার থেকে কীভাবে আরও ভালো করা যায়, সেটার পরিকল্পনা করো। আজ যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছো, আগামী দুই বছর পর যেন তার চেয়ে অনেক ভালো জায়গায় দাঁড়াতে পারো—এই লক্ষ্য রাখো।

পড়াশোনা ভালো না লাগলে দক্ষতা অর্জন করো

আর যদি পড়াশোনা ভালো না লাগে, তবে দেরি করো না। জীবন থেকে সময় লস করো না। তুমি পড়াশোনা বাদ দিয়ে কোনো একটা কাজে ঢুকে যাও। নিজেকে অভিজ্ঞ বানাও। ভবিষ্যতে সেটা থেকে বড় কোনো কিছু করার চেষ্টা শুরু করো।

স্বপ্ন দেখো। নিজেকে কঠোর পরিশ্রম করার জন্য প্রস্তুত করো।

তবে পড়াশোনা ভালো লাগে না বলে একেবারে কিছু না করে বসে থেকো না। কোনো কাজ শেখো। কারিগরি শিক্ষা নিতে পারো, কম্পিউটার শিখতে পারো, ডিজিটাল মার্কেটিং, গ্রাফিক ডিজাইন, ভিডিও এডিটিং, ওয়েবসাইট তৈরি, ফ্রিল্যান্সিং, ব্যবসা কিংবা অন্য কোনো বাস্তবমুখী দক্ষতা অর্জন করতে পারো।

আজ তুমি যে দক্ষতাটা শিখবে, কয়েক বছর পর সেটাই হয়তো তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ হয়ে দাঁড়াবে।

সাফল্যের জন্য শুধু সার্টিফিকেটই সব নয়

কারণ, এই পৃথিবীতে পড়াশোনা করেই সবাই সফল হয়েছে—বিষয়টি এমন নয়। এমন অনেক মানুষ রয়েছে, যারা স্কুলের গণ্ডি পার না হয়েই সাফল্যের চূড়ায় উড্ডয়ন করেছে।

সুতরাং পড়াশোনা ফ্যাক্ট নয়—তোমার নিজের ভেতরের লুকানো শক্তিই ফ্যাক্ট। সেই শক্তি তোমাকে যেদিকে নিয়ে যেতে চায়, তুমি সেদিকেই যাও।

তবে একটা কথা মনে রেখো—পড়াশোনা ভালো না লাগা আর পরিশ্রম করতে না চাওয়া এক জিনিস নয়। তুমি যদি পড়াশোনা ছেড়েও দাও, তাহলে তোমাকে আরও বেশি পরিশ্রমী হতে হবে। কারণ, কোনো ক্ষেত্রেই পরিশ্রম ছাড়া সফল হওয়া সহজ নয়।

তুমি যে পথই বেছে নাও, সেই পথ সম্পর্কে শিখতে হবে, সময় দিতে হবে, ব্যর্থ হতে হবে, আবার চেষ্টা করতে হবে। তাহলেই ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করতে পারবে।

টেনেটুনে পাস মানেই জীবন শেষ নয়

পরিশেষে বলতে চাই, এসএসসিতে টেনেটুনে পাস করেছো বলে মন খারাপ করো না। এটা মন খারাপের বিষয় না।

হয়তো তুমি চেষ্টা করেছো, কিন্তু পারোনি। অথবা তোমার ভাগ্যটাই খারাপ। অথবা পড়াশোনা সত্যিকার অর্থে তোমার ভালোই লাগে না। আর যদি নতুন করে চেষ্টা করে দেখতে চাও, তবে জীবন-মরণ চেষ্টা করো। এইচএসসিতে একটা ভালো ফলাফল করে দেখাও।

নতুবা কোনো কাজ শুরু করো। ব্যবসা করো। অল্প বয়সেই জীবনের অঙ্কুরগুলোকে ফুটিয়ে তোলো। যা তোমার ইচ্ছে, তাই করো।

তবে যেটাই করো, দায়িত্ব নিয়ে করো। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজেই চিন্তা করো। শুধু অন্যের কথায় কোনো সিদ্ধান্ত নিও না। বাবা-মায়ের সঙ্গে আলোচনা করো, শিক্ষকদের পরামর্শ নাও এবং নিজের সামর্থ্য ও আগ্রহকে গুরুত্ব দাও।

মনে রেখো, আজকের একটা খারাপ রেজাল্ট তোমার পুরো জীবনকে নির্ধারণ করে দেয় না। তুমি চাইলে আগামীকাল থেকেই নিজের জীবনটাকে নতুনভাবে সাজাতে পারো।

অবশ্যই তোমার কঠিন প্রতিজ্ঞায় তোমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে কেউ যেতে সাহস পাবে না। তোমার জন্য আমার তরফ থেকে ভালোবাসা আর অনুপ্রেরণা রইলো।

তুমি হেরে যাওনি। তোমার সামনে এখনও অনেকটা পথ বাকি। শুধু সিদ্ধান্ত নাও—তুমি কোন পথে হাঁটবে।

আরও পড়ুন: সেযুগ আর এযুগের ছেলেমেয়েদের মধ্যে পরিবর্তন কতটা ভয়াবহ!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top