ভূমিকা
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে গেছে। সেদিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে ব্যাপক সামরিক অভিযান পরিচালনা করে, যেখানে ইরানের সামরিক স্থাপনা এবং শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। এই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেইও নিহত হন। এই আক্রমণের পেছনে একটি নয়, বরং বহুস্তরীয় কারণ রয়েছে, যা কয়েক দশকের পুঞ্জীভূত উত্তেজনার ফল।
১. পারমাণবিক কর্মসূচি: কেন্দ্রীয় কারণ
আমেরিকা-ইরান দ্বন্দ্বের একেবারে কেন্দ্রে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির প্রশ্ন। ২০২৫ সালের ৩১ মে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) রিপোর্ট করে যে ইরান ৬০% বিশুদ্ধতায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার মাত্রা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করেছে, যা অস্ত্র-গ্রেড পর্যায়ের ঠিক নিচে। মজুত পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ৪০৮ কিলোগ্রামেরও বেশি, যা ফেব্রুয়ারির তুলনায় প্রায় ৫০% বৃদ্ধি। সংস্থাটি সতর্ক করে দেয় যে এই পরিমাণ ইউরেনিয়াম আরও সমৃদ্ধ করা হলে একাধিক পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা সম্ভব।
IAEA-র সমালোচনার জবাবে ইরান ঘোষণা করে যে তারা একটি অজ্ঞাত স্থানে নতুন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র নির্মাণ করবে, এবং IAEA-র পরিদর্শন কার্যক্রমও সীমাবদ্ধ করে দেয়। ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে এটি সরাসরি অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে।
২. JCPOA চুক্তির পতন ও “সর্বোচ্চ চাপ” নীতি
২০১৮ সালে ট্রাম্প JCPOA পারমাণবিক চুক্তি থেকে আমেরিকাকে প্রত্যাহার করে নেন এবং “সর্বোচ্চ চাপ” কৌশল গ্রহণ করেন। বাইডেন প্রশাসনও অধিকাংশ নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত রাখে, যা ইরানের অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করে। ২০২৫ সালের দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প আবারও সেই নীতিতে ফিরে আসেন।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ “স্ন্যাপব্যাক” প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা পুনরায় আরোপ করে, যার ফলে ইরানি মুদ্রার মূল্য দ্রুত হ্রাস পায়, খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি পায় এবং বিদেশে ইরানি সম্পদ জব্দ করা হয়। এই অর্থনৈতিক যুদ্ধ ইরানকে আরও অস্থিতিশীল করে তোলে।
৩. দ্বাদশ দিনের যুদ্ধ ও প্রথম সামরিক অভিযান (জুন ২০২৫)
সরাসরি আক্রমণের আগেই একটি সামরিক অভিযান পরিচালিত হয়েছিল। ২০২৫ সালের ২২ জুন মার্কিন বিমান বাহিনী ও নৌবাহিনী “অপারেশন মিডনাইট হ্যামার” কোড নামে ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। B-2 স্টেলথ বোমারু বিমান থেকে ১৪টি GBU-57A/B “বাংকার বাস্টার” বোমা এবং সাবমেরিন থেকে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ফোর্দো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহানের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয়।
তবে একটি প্রাথমিক মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে সন্দেহ করা হয় যে ইরান হামলার আগেই তার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত সরিয়ে ফেলেছিল এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা মাত্র কয়েক মাসের জন্য পিছিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল। এই ব্যর্থতাই পরবর্তীতে আরও বড় আক্রমণের ভিত্তি তৈরি করে।
৪. ইসরায়েলের নিরাপত্তা এবং “প্রতিরোধের অক্ষ” ভাঙার লক্ষ্য
ইরান হামাসের ৭ অক্টোবর ২০২৩-এর হামলায় সহায়তার ভূমিকা পালন করেছিল এবং ২০২৪ সালের এপ্রিল ও অক্টোবরে সরাসরি ইসরায়েলের উপর ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। এই প্রেক্ষাপটে আমেরিকা ও ইসরায়েল বিশ্বাস করেছিল যে একটি পারমাণবিক ইরান গোটা মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যকে মৌলিকভাবে পরিবর্তন করে দেবে। AJC
ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে হামাস ও হিজবুল্লাহর নেতৃত্ব ধ্বংস এবং সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতনের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের “প্রতিরোধের অক্ষ” উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে চূড়ান্ত আঘাত হানার পরিকল্পনা করা হয়।
৫. ইরানের দুর্বলতা ও কূটনীতির ব্যর্থতা
হামলার সময় ইরান তার ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে ছিল। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা, সাম্প্রতিক অস্থিতিশীল বিক্ষোভ, ২০২৫ সালের দ্বাদশ দিনের যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতি এবং আঞ্চলিক মিত্রদের দুর্বলতার কারণে আমেরিকা ও ইসরায়েল হিসাব করেছিল যে কূটনৈতিক পথের চেয়ে সামরিক পথে তাদের লক্ষ্য অর্জন সহজতর।
তবে সমালোচকরা বলছেন, হামলার ঠিক আগমুহূর্তে ইরান একটি ব্যাপক পারমাণবিক অপ্রসারণ চুক্তি স্বাক্ষরের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল এবং ওমানের মধ্যস্থতাকারীরা বলেছিলেন, প্রস্তাবিত চুক্তিটি আগের সব চুক্তির চেয়ে অনেক বেশি ব্যাপক হতো। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন সরল বিশ্বাসে আলোচনা করতে অস্বীকার করে কূটনীতির পরিবর্তে যুদ্ধকে বেছে নেয়।
৬. হর্মুজ প্রণালি ও বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা
ইরানের পাল্টা আক্রমণের অংশ হিসেবে হর্মুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া হয়, যার মধ্য দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০% তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন করা হয়। এটি বিশ্ব বাণিজ্যকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। আমেরিকার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, একটি পারমাণবিক অস্ত্রধারী ইরান এই কৌশলগত জলপথের উপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারত, যা পশ্চিমা বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে চিরতরে বন্দী করে রাখত।
সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই আক্রমণকে মোটেও স্বাভাবিকভাবে দেখেনি। জাতিসংঘ চার্টার অনুযায়ী, কোনো দেশের আঞ্চলিক অখণ্ডতার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ নিষিদ্ধ। আইনি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞরা মার্কিন আক্রমণকে অবৈধ এবং ইরানের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন বলে আখ্যা দিয়েছেন। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং একাধিক নিরপেক্ষ দেশ এই হামলার নিন্দা করেছে।
উপসংহার
আমেরিকার ইরান আক্রমণ কোনো তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত ছিল না। এটি ছিল কয়েক দশকের পুঞ্জীভূত অবিশ্বাস, পারমাণবিক উচ্চাভিলাষ, আঞ্চলিক ক্ষমতার লড়াই এবং কূটনৈতিক ব্যর্থতার সম্মিলিত পরিণতি। আমেরিকা ও ইসরায়েল বলেছে তাদের লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করা এবং রেজিম পরিবর্তন আনা। তবে ইতিহাস সাক্ষী, এ ধরনের “পূর্বনিরাপত্তামূলক যুদ্ধ” প্রায়শই সংকটের সমাধান না করে আরও গভীর অস্থিতিশীলতার জন্ম দেয়। ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ পরিণতি কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, গোটা বিশ্বের ভূ-রাজনীতি, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করবে।
আরও পড়ুন: যেকোনো মুহূর্তে হামলার আশঙ্কা: উচ্চ সতর্কতায় সংযুক্ত আরব আমিরাত, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয়



