রাগ-অভিমান মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্য। কোন না কোন কারণে মানুষ রাগ করবেই। আপনি যতই নিশ্চুপ থাকেন না কেন, আপনার সাথে রাগারাগি হবেই। আপনি যতই মুখে বলুন না কেন আপনার কোন শত্রু নেই, কিন্তু আপনার শত্রু তৈরি হবেই। পৃথিবীটাই আসলে এরকম। আমি যেদিন এই পোস্ট লিখছি, সেদিন আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গুলি খেয়েছেন। ভাগ্য ভালো যে মারা যাননি। শুধুমাত্র কানের ক্ষতি হয়েছে।
আসল কথায় আসি
আসল কথায় আসি। বলছিলাম রাগের ব্যাপারে। সবচেয়ে প্রধান কারণ হলো, আপনি যখন কারও কথার বিপরীতে যাবেন, তখনই অপর মানুষটা আপনার উপর রাগ করবে। আপনি যখন কারও কথার যথাযথ উত্তর দিতে যাবেন, তখনই ঐ মানুষটা রাগ করবে। এসব সবার ক্ষেত্রে নয়।
রাগ-অভিমানের বিষয়টি আসলে মানুষের মানসিকতা, ধৈর্য, পরিবেশ, শিক্ষা ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গেও অনেকটা জড়িত। তাই সবাই একই কারণে বা একইভাবে রাগ করে না।
কার রাগ-অভিমান বেশি?
ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা বেশি রাগ করে। কেউ কেউ প্রকাশ করে, আবার কেউ কেউ নিজের মধ্যে গোপন করে রাখে। জন্মগতভাবে কারও রাগ বেশি থাকে, আবার কারও রাগ কম থাকে। কারও ধৈর্য শক্তি বেশি, আবার কারও ধৈর্য শক্তি কম। যার কম, তার নিতান্তই রাগও কম, আর যার বেশি, তার নিতান্তই রাগও বেশি।
যখন কোন ব্যক্তি আপনাকে তার মতো করে চালাতে চায়, কিন্তু আপনি মানছেন না, তখনও আপনার উপর সেই ব্যক্তি রাগ প্রয়োগ করবে কিংবা পুষে রাখবে। আমরা মানুষ। আধুনিক যুগের মানুষগুলো কেমন যেন! কেউ কাউকে কথা বলার সুযোগ পর্যন্ত দিই না।
রাগ-অভিমান এর কারণ অনেক
রাগের অনেকগুলো কারণ রয়েছে। সব কারণ বলা সম্ভব না। আমি কেবল সামান্য ধারণা দিয়ে যাচ্ছি মাত্র। মূলত মানুষ মন থেকে যেমন চায়, তেমন যদি কারও জন্য না পায়, তখনই রাগ করে। কিন্তু বোঝার চেষ্টা করে না যে, জীবনে সবকিছু মনের মতো হয় না। কিছু বিষয় মেনে নিতে হয়। কিছু অনুশোচনা মনের মধ্যে পুষে রাখতে হয়।
আবার কারও কারও জেদ বেশি। এই বিষয়টা ছোটবেলা থেকেই বোঝা যায়। জেদ থাকা ভালো, যদি তা ভালো কোন কাজে লাগানো যায়। আর যদি কেবল রাগের কারণ হয়, তাহলে সেই জেদ আর কিছু না পারুক, কিন্তু জীবনটা ধ্বংস করতে পারবে।
পছন্দের বাইরে গেলেই রাগ
পছন্দের বাইরে গেলেই যদি কেউ রাগ করে, তাহলে তাকে বোঝানোর ক্ষমতা কারও নেই। এক কথায় বলা যায়, সে স্বার্থান্বেষী। সে কেবল নিজের সুখটাকেই বেছে নিচ্ছে। আর কারও কথা ভাবছে না। আর এটা নিছক বোকামি ছাড়া কিছুই নয়।
অনেক সময় আমরা নিজের চাওয়া-পাওয়াকে এত বেশি গুরুত্ব দিই যে, অন্য মানুষের চাওয়া-পাওয়া, অনুভূতি কিংবা পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করি না। সেখান থেকেই রাগ, অভিমান ও দূরত্ব তৈরি হয়।
সব রাগ-অভিমান খারাপ নয়
কোন কোন ক্ষেত্রে রাগ থাকা ভালো। স্বামী কোন খারাপ কাজ করছে। স্ত্রী যদি রাগ দেখিয়ে সেই কাজ বন্ধ করতে পারে, তাহলে স্ত্রীর এই রাগ স্বামীর জন্য অতীব কল্যাণকর। কিন্তু কয়জন স্ত্রী এমন পাওয়া যাবে! আবার, কোথাও একটা দুই নম্বরী কাজ চলছে—আপনি গিয়ে রাগ দেখানোর ফলে তাদের সেই কাজ ভেস্তে গেল। এমন রাগ সমাজ তথা গোটা জাতির জন্য কল্যাণকর।
অর্থাৎ রাগ সবসময় খারাপ নয়। অন্যায়, অনিয়ম কিংবা ক্ষতিকর কাজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী রাগ কখনো কখনো প্রয়োজনীয়ও হতে পারে। তবে সেই রাগ যেন অন্যায়কে প্রতিহত করে, মানুষকে আঘাত না করে—সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।
আমরা ভুল জায়গায় রাগ প্রয়োগ করি
কিন্তু আমরা বেশিরভাগ সময়ই ভুল জায়গায় রাগ-অভিমান প্রয়োগ করি। ভুলভাবে প্রয়োগ করি। যেখানে কম দরকার, সেখানে বেশি রাগ প্রয়োগ করে ফেলি, আর যেখানে বেশি দরকার, সেখানে কম রাগ প্রয়োগ করে ফেলি। মানুষের আকাঙ্ক্ষা অনেক বেশি। মানুষ সবকিছুতেই ভালো চায়। কিন্তু সে জানে না যে, সবকিছুতে কখনোই ভালো হয় না। কিছু মন্দের সংমিশ্রণ থাকে, আর এটা মেনে নিতে হয়।
জীবনে সবকিছু নিজের ইচ্ছামতো হবে—এমনটা কখনোই সম্ভব নয়। কিছু মানুষকে মেনে নিতে হয়, কিছু পরিস্থিতিকে মেনে নিতে হয় এবং কিছু অপূর্ণতাকেও মেনে নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হয়।
রাগের পেছনে আরও অনেক কারণ
যাই হোক, মানুষ তার সব অপূর্ণতাকে পূর্ণতায় রূপ দিতে, লোভ-লালসার প্রলোভনে, স্বার্থের কারণে, শুধুমাত্র নিজের ভালোর জন্য, ভুল করে, জেদ থেকে, জন্মগত সমস্যা থেকে, ভুল শিক্ষা গ্রহণের ফলে, নৈতিক অবক্ষয়ের ফলে সহ আরও নানাবিধ কারণে রাগ-অভিমান প্রয়োগ করে।
কখনো কখনো রাগের পেছনে থাকে দীর্ঘদিনের জমে থাকা অভিমান, হতাশা কিংবা না-পাওয়ার কষ্টও। তাই কাউকে রাগী দেখলেই তাকে খারাপ মানুষ হিসেবে বিচার না করে, তার রাগের পেছনের কারণটাও বোঝার চেষ্টা করা উচিত।
রাগ জীবনে কী বয়ে আনে?
রাগ জীবনে সবচেয়ে ক্ষতিই বয়ে আনে বেশি। ভালো খুব কমই হয়। কারণ, আমরা তো ভুল জায়গায় ভুলভাবে রাগ প্রয়োগ করে থাকি বেশি। প্রত্যেকজন মানুষের এ ব্যাপারে সচেতন হওয়া জরুরি। রাগ সামাল দেওয়া দরকার। জীবনটা উপভোগ করার জন্য রাগ দমিয়ে রাখতে হবে। সঠিক জায়গায় প্রয়োগ করতে হবে। তবেই জীবনে শান্তি আসবে।
রাগের সময় আমরা অনেক কথা বলে ফেলি, এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি, যা পরে চাইলেও সহজে ফিরিয়ে নেওয়া যায় না। তাই রাগ আসতেই পারে, কিন্তু রাগের কাছে নিজেকে সমর্পণ করা যাবে না। রাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারাটাই মানুষের বড় গুণ।
রাগ থাকুক, কিন্তু রাগ যেন আমাদের নিয়ন্ত্রণ না করে। রাগকে নিয়ন্ত্রণ করে সঠিক জায়গায় প্রয়োগ করতে পারলেই জীবন, পরিবার ও সমাজ—সবকিছুই আরও সুন্দর হতে পারে।
আরও পড়ুন: ভুল সিদ্ধান্ত ও ভয়াবহ পরিণতি: আমার জীবনের বাস্তব গল্প



