কোরআন বোঝার গুরুত্ব কি এই পোস্ট পড়লে বুঝতে পারবেন। চলুন শুরু করা যাক। বর্তমান সময়ে কোন যান্ত্রিক পণ্য ক্রয় করলে তৎসঙ্গে একটি ছোট পুস্তিকা বা গাইডলাইন প্রদান করা হয়। এখন আপনাদের কাছে প্রশ্ন—কেন এটি দেওয়া হয়ে থাকে? জানি, অনেকেই উত্তর দিতে পারবেন। আবার, মন-মতো উত্তর অনেকেই দিতে পারবেন না। যাই হোক, এটার উত্তর এই লেখার মধ্যেই রয়েছে। মনোযোগ দিয়ে পড়ে নিন – বুঝতে পারবেন।
যন্ত্রের সঙ্গে ম্যানুয়াল কেন দেওয়া হয়?
কারণ, যন্ত্রটি কীভাবে চালাতে হবে, কীভাবে কোন সুইচ অফ বা অন করলে কী কাজ হবে কিংবা বিভিন্ন রেগুলেটর কমালে অথবা বাড়ালে কী ধরনের কাজ করবে, তার বিস্তারিত বিবরণ পুস্তিকাটিতে থাকে। পণ্য বা যন্ত্রটিকে ম্যানুয়াল বা গাইড পুস্তিকা অনুযায়ী যথার্থভাবে চালাতে পারলে যথাযথ সফলতা পাওয়া যাবে।
শুধু তাই নয়, ম্যানুয়াল পুস্তিকা ফলো করে চলতে পারলে যন্ত্রটির অনেক সুবিধা পাওয়া যায়। যেমন—উপর থেকে পড়ে গেলে কী ক্ষতি হতে পারে, ভিজে গেলে তখন কী করা দরকার, কত ডিগ্রি তাপমাত্রায় যন্ত্রটিকে রাখা দরকার ইত্যাদি ইত্যাদি। আবার লক্ষ্য করার বিষয়, ঐ ম্যানুয়াল পুস্তিকাটি কিন্তু পণ্যটি যে সংস্থা বা যে কারখানা থেকে নির্মিত, সেখান থেকেই সরবরাহ করা হয়েছে।
আমাদের জানা দরকার, কেনই বা কেবলমাত্র নির্মাণকারী সংস্থাই ওটা প্রদান করে থাকে। এর কারণ অন্য কিছু নয়, যেহেতু পণ্যটি নির্মাণকারী সংস্থা প্রস্তুত করেছে, তার টেকনোলজিক্যাল ভালো-মন্দ দিকগুলো কেবল ঐ সংস্থারই জানা থাকে, অন্য কারও নয়।
কোরআন বোঝার গুরুত্ব – মানুষও কি একটি যন্ত্র?
এ ধরনের প্রসঙ্গটা অনেকটা অপ্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়, কিন্তু মনে করি, মানুষ একটি যন্ত্র—মিথ্যা নয়, মানুষ একটি জটিল যন্ত্রই। একটি সুপার কম্পিউটারের চেয়েও লক্ষ লক্ষ গুণ বেশি জটিল হচ্ছে মানুষের দেহযন্ত্র। তাই এর পরিচালনার জন্য একটি নির্দেশিকা থাকা একান্তভাবে প্রয়োজন। আর এ নির্দেশিকা বা ম্যানুয়ালটা হওয়া চাই সুন্দর, সঠিক ও নির্ভুল। আর এ ম্যানুয়ালই হলো আল-কোরআন।
পণ্য নির্মাতা সংস্থা যেমন পণ্যটির সঠিক ব্যবহারের জন্য ম্যানুয়াল প্রদান করে থাকেন, তেমনই আল্লাহ রাব্বুল আল-আমীন, আমাদের স্রষ্টা, আমাদের এ আল-কোরআন নামক ম্যানুয়ালটি প্রদান করেছেন। এতে তিনি মানুষের জীবনে চলার সমস্ত পদ্ধতি অবহিত করিয়ে দিয়েছেন।
মানুষ নিজেই একটি পণ্য কিংবা যন্ত্র হয়ে তার নিজস্ব ম্যানুয়াল তৈরি করতে পারে না। বরং যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, তাঁর দ্বারাই ম্যানুয়াল প্রদানের কাজটি সম্পন্ন হওয়া যুক্তিযুক্ত বলে মনে হয়। কোরআন বোঝার গুরুত্ব – মেইন পয়েন্ট কিন্তু এখানেই। আশা করি, বুঝতে পেরেছেন।
অজ্ঞতার সুযোগ কীভাবে নেওয়া হয়?
এ ব্যাপারে হাস্যকর একটি গল্প আপনাদের শোনাই। শোনা যায়, ভারতীয় উপমহাদেশে যখন প্রথম মোটরকার এসেছিল, তখন এখানকার মানুষ মোটরকার সম্বন্ধে একেবারেই অজ্ঞ ছিলেন।
আমাদের দেশীয় কোনো ড্রাইভারও ছিল না। তাই মোটরকার উৎপাদনকারী সংস্থা থেকে এর ড্রাইভারও পাঠানো হতো। আমাদের দেশীয় এক নবাব ইউরোপীয় দেশ থেকে একটি গাড়ি এনেছিলেন। সঙ্গে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চালক এসেছিল।
তার কাছে এটা পরিষ্কার ছিল যে নবাব গাড়ি সম্বন্ধে একেবারে অজ্ঞ। একদিন নবাব চালকটিকে বেগমকে নিয়ে ভ্রমণ করিয়ে আনার জন্য বলাতে চালক যা বলেছিল, তা সত্যিই হাসির উদ্রেক করে।
চালক নবাবকে জানালেন, গাড়িটি খারাপ আছে এবং তা সারিয়ে তুলতে দরকার ১০ কেজি ঘি, ২০ কেজি চাল ও ২০ কেজি তেল। এখন আমরা একথা শুনে কী বলব? নিশ্চয় আমরা বলতে পারি, নবাবের অজ্ঞতার জন্যই চালক তার সুযোগ নিয়েছিল। সে জন্য মুসলমানদের কোরআন সম্বন্ধে যথেষ্ট জ্ঞান থাকা একান্তভাবে প্রয়োজন। তা না হলে পদে পদে আমাদের ঠকতে হবে এবং অপরের দ্বারস্থ হতে হবে।
কোরআন না বোঝার অজুহাত
কতেক মুসলিম ভাইয়ের কথা শুনলে না হেসে পারা যায় না। তারা অজুহাত খাড়া করে বলে, যদি কেউ কোরআন বুঝে অপরাধ করে, তবে তার সাজা অপেক্ষাকৃত বেশি হবে। আর না বুঝে করলে অপরাধ কম হবে। এ ভাইদেরকে আমি একটি বাস্তব উদাহরণ দিতে চাই।
ধরুন, আইনে আছে—কোনো ট্রেনিংরত গাড়ির চালক ট্রেনিংয়ের সময়কালে কোনো দুর্ঘটনা ঘটালে তাকে জরিমানা দিতে হবে ১ হাজার টাকা। অপর পক্ষে, ট্রেনিংপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি যদি দুর্ঘটনা ঘটায়, তাহলে তার জরিমানা ২ হাজার টাকা। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, ট্রেনিংরত চালকটি লাভবান।
তাই তার উচিত ট্রেনিং শেষ না করে সবসময় ট্রেনিংরত থাকা। কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে এটি নির্বুদ্ধিতার পরিচয় ছাড়া কিছু নয়। কারণ, ট্রেনিংপ্রাপ্ত চালক সারা জীবনে হয়তো মাত্র দুই-একটি দুর্ঘটনা ঘটালে তার জরিমানা হবে মাত্র ২ হাজার টাকা। অপরপক্ষে, ট্রেনিংরত চালকটি সারা জীবনে দুর্ঘটনা ঘটাবে হয়তো ৫০টি।
অতএব, কোরআনের অর্থ জেনে বিজ্ঞ হওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ। প্রকৃতপক্ষে কোরআনের বোধগম্যতা যত বেশি হবে, সমাজের সংস্কার তত বেশি হবে। আজ আমাদের মুসলিমদের অবস্থা এ কারণেই নাজুক যে, এ জাতি কোরআন বোঝার ব্যাপারে অত্যন্ত উদাসীন।
শেষ কথা
যে যন্ত্রের সঙ্গে তার নির্মাতার দেওয়া ম্যানুয়াল থাকে, আমরা সেই ম্যানুয়ালকে অবহেলা করি না। কারণ, আমরা জানি—যন্ত্রটি কীভাবে ব্যবহার করতে হবে, তার সঠিক নির্দেশনা নির্মাতার কাছেই সবচেয়ে ভালোভাবে রয়েছে। তাহলে মানুষ নামের এই অসাধারণ ও জটিল সৃষ্টির ক্ষেত্রে আমরা কেন স্রষ্টার দেওয়া নির্দেশিকাকে অবহেলা করব?
আল-কোরআন শুধু তিলাওয়াতের জন্য নয়; এটি বোঝার, জানার এবং জীবনে বাস্তবায়ন করার জন্যও। কোরআনের অর্থ ও নির্দেশনা যত বেশি বুঝব, তত বেশি নিজের জীবন, পরিবার ও সমাজকে সঠিকভাবে পরিচালনা করার সুযোগ তৈরি হবে। কোরআন বোঝার গুরুত্ব আমাদের জীবনের জন্য খুবই দরকারি।
আরও পড়ুন: অস্থির জেনারেশন তৈরি করছি আমরা: বর্তমান প্রজন্ম কোথায় যাচ্ছে?



