সত্যিই এক অস্থির জেনারেশন তৈরি করছি আমরা। Believe it or not, এই জেনারেশনের নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য নেই, আদর্শিক কোনো অ্যাম্বিশন নেই এবং পবিত্র কোনো মিশনও নেই। জীবনের উদ্দেশ্য, আত্মগঠন, সমাজ ও দেশের প্রতি দায়িত্ব কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীরভাবে ভাবার প্রবণতা যেন দিন দিন কমে যাচ্ছে।
অবশ্যই সবাই এমন নয়। এই লেখাটি পুরো একটি প্রজন্মকে দোষারোপ করার জন্য নয়; বরং আমাদের চারপাশের একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা নিয়ে ভাবার জন্য। কারণ একটি প্রজন্মের অভ্যাস, মূল্যবোধ ও জীবনদর্শনই একদিন একটি সমাজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে।
বই, সংবাদপত্র ও প্রকৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে অস্থির জেনারেশন
এরা কখনো বই পড়ে না, সংবাদপত্র পড়ে না। আউটডোর খেলাধুলার প্রতিও এদের অনীহা রয়েছে। অবসর মানেই যেন স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা অনলাইন গেম।
এই অস্থির জেনারেশন রৌদ্রে হাঁটতে পছন্দ করে না, বৃষ্টিতে ভিজতে চায় না। কাদা-মাটি, ঘাস, লতাপাতায় যেন এদের অ্যালার্জি। আধা কিলোমিটার দূরের গন্তব্যে যেতে আধা ঘণ্টা রিকশার জন্য অপেক্ষা করতেও এদের আপত্তি নেই। এরা অস্থির—প্রচণ্ড রকমের অস্থির এক জেনারেশন।
শ্রদ্ধাবোধ ও ভদ্রতার সংকট
এরা পরিচিত সিনিয়রদের সালাম দেবে না। পাশ কাটিয়ে হনহন করে চলে যাবে, অথবা গা ঘেঁষে, পায়ে পাড়া দিয়ে চলে গেলেও ‘সরি’ বলার প্রবণতা অনেকের মধ্যেই নেই।
সামান্য বিষয়েও অনর্থক তর্ক জুড়ে দেওয়া যেন স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। না পাবেন বিনয়ী ভঙ্গি, না পাবেন কৃতজ্ঞতাবোধ। কারও কারও উদ্ধত আচরণ ও সদম্ভ চলাফেরা দেখে আপনি অস্বস্তিতে পড়ে যাবেন।
সংযত হওয়ার উপদেশ দিতে গেলেও বিপদ। কারণ উপদেশ গ্রহণের পরিবর্তে উল্টো আপনাকেই নাজেহাল হওয়ার পরিস্থিতিতে পড়তে হতে পারে। অবশ্যই সবাই এমন নয়। কিন্তু এই আচরণগুলো যখন সমাজে ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে, তখন বিষয়টি নিয়ে আমাদের ভাবতেই হবে।
সামান্য সুযোগের জন্যও অস্থির প্রতিযোগিতা
আপনি পাবলিক বাসে চড়ছেন। দেখবেন, খালি সিটটায় জায়গা পেতে সবচেয়ে জুনিয়র ছেলেটিই বেশি প্রতিযোগিতা করবে। আপনাকে ধাক্কা-টাক্কা দিয়ে সটান বসে পড়বে।
তার বয়সের দ্বিগুণ বয়সী আপনি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখা ছাড়া তেমন কিছু করার থাকে না। বড়দের প্রতি সম্মান, ছোটদের প্রতি স্নেহ—এই সহজ সামাজিক শিক্ষাগুলো কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে।
যেখানে শোনার কথা, সেখানে জ্ঞান দেওয়ার চেষ্টা
বলছিলাম এই জেনারেশনের কথা। সবচেয়ে ভয়াবহ ফিতনার কথা শুনে যে মজলিসে এই জেনারেশনের দাঁড়িয়ে থাকার কথা, সেই মজলিসে তারা নিজের জন্য চেয়ার খোঁজে। যেখানে চুপ থেকে শোনার কথা, সেখানে জ্ঞান দেওয়ার চেষ্টা করে। সমস্যা জ্ঞান অর্জনে নয়; সমস্যা হলো জ্ঞান অর্জনের আগেই নিজেকে জ্ঞানী মনে করার প্রবণতায়।
রাত জাগা, ঘুম আর হারিয়ে যাওয়া প্রকৃতির সৌন্দর্য
সারা রাত ধরে অনলাইনে থাকে। সারা সকাল ঘুমায়। এরা সূর্যোদয় দেখে না, সূর্যাস্তও দেখে না। সূর্যোদয়ের সময় বিছানায় থাকে আর সূর্যাস্তের সময় মোবাইলে থাকে।
একসময় মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটাত। ভোরের বাতাস, বিকেলের মাঠ, বৃষ্টির শব্দ কিংবা সন্ধ্যার আকাশ—এসব ছিল জীবনের অংশ। এখন অনেকের জীবনে বাস্তব পৃথিবীর চেয়ে ভার্চুয়াল পৃথিবীই বেশি আকর্ষণীয়।
ফাস্টফুড ও অনলাইন গেমের আসক্তি
এরা সবাই ফাস্টফুডে আসক্ত—অন্তত আমাদের চারপাশে এমন প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। আউটডোর খেলা অপছন্দ, ইনডোর স্বস্তিকর। আর নির্দিষ্ট করে বললে, অনলাইন গেম অনেকের কাছে ফার্স্ট প্রায়োরিটি।
শরীরচর্চা, মাঠে দৌড়ানো, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা কিংবা প্রকৃতির কাছে সময় কাটানোর পরিবর্তে ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা যেন নতুন স্বাভাবিকতা।
ইতিহাস ও সাহিত্য থেকে দূরত্ব
এরা (অস্থির জেনারেশন) ইতিহাস পড়ে না, সাহিত্য বোঝে না। এদের অনেকে নজরুলকে চেনে না, রবীন্দ্রনাথকে চেনে না, ফররুখকে চেনে না। সাদী, রুমি, হাফিজ তো আরও অচেনা প্রসঙ্গ। এরা বই বোঝে না, বই পড়ে না এবং বই কিনতেও চায় না।
একটি জাতি যখন তার ইতিহাস, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মনীষীদের সম্পর্কে জানার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে, তখন শুধু প্রযুক্তিগত উন্নয়ন দিয়ে সেই জাতির পূর্ণাঙ্গ উন্নয়ন সম্ভব নয়।
স্মার্টফোনে দক্ষ, জীবনে অদক্ষ?
এরা নন-স্কিলড। এরা হাঁটতে পারে না, দৌড়াতে পারে না, গাছে চড়তে জানে না, সাঁতার কাটতে পারে না। সাগর পাড়ি দেওয়ার সেই দুঃসাহসিকতা নেই, পাহাড় কেটে পথ তৈরির সেই অদম্য মনোবল নেই। এদের উচ্ছ্বাস কমছে, আবেগ কমছে, সৎ সাহসও যেন সংকুচিত হচ্ছে।
অনেকের একমাত্র ‘স্কিল’ হলো স্মার্টফোন দ্রুত স্ক্রল করতে পারা। প্রযুক্তি ব্যবহার করা অবশ্যই খারাপ নয়। বরং প্রযুক্তি আমাদের জীবনে অসংখ্য সুযোগ এনে দিয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তি যদি আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তখন সেটিই হয়ে ওঠে সমস্যা।
মূল্যবোধ ও শৃঙ্খলার সংকট
এদের না আছে যথেষ্ট মূল্যবোধ, না আছে শ্রদ্ধাবোধ, না আছে শৃঙ্খলাবোধ—এমনটাই মনে হয় আমাদের চারপাশের অনেক আচরণ দেখে। এই অস্থির জেনারেশন একদম লাগাম ছাড়া। কারও কথা শোনেও না, বুঝেও না।
কখন চলতে হবে, কখন থামতে হবে, কখন বলতে হবে, কখন শুনতে হবে—তা অনেকেই জানে না। এরা না বোঝে সিনিয়রিটি, না বোঝে জুনিয়রিটি।
স্বাধীনতা মানে যা ইচ্ছা তাই করা নয়। স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ববোধও থাকতে হয়। আর সেই দায়িত্ববোধ তৈরি হয় পরিবার, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সঠিক অনুশীলনের মাধ্যমে।
আখিরাতের চিন্তা থেকে বস্তুবাদী জীবনে
আখিরাত—অর্থাৎ মৃত্যুর পরের জীবন—সম্পর্কে অনেকেরই স্পষ্ট ধারণা নেই। এরা সৃষ্টির উদ্দেশ্য জানে না। সৃষ্টি ও স্রষ্টার সম্পর্ক সম্পর্কে উদাসীন।
বস্তুর প্রতি এদের আকর্ষণ চরম। এরা ক্রমেই বস্তুবাদী ও ভোগবাদী হয়ে উঠছে। কী আছে, কী কিনব, কী খাব, কী পরব, কোথায় যাব—এসব নিয়ে ভাবনা আছে; কিন্তু কেন বেঁচে আছি, জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী, মৃত্যুর পর কী হবে—এসব প্রশ্ন যেন ক্রমেই আড়ালে চলে যাচ্ছে। পরবর্তী পৃথিবীর নেতৃত্ব এই প্রজন্ম দেবে—এ কথা ভাবতেই কখনো কখনো শিহরে ওঠে মন।
তাহলে কি সব দোষ এই প্রজন্মের?
যে কথাগুলো বললাম, আপনি মানতে পারেন, নাও মানতে পারেন। হয়তো অনেকের কাছে কথাগুলো কঠিন মনে হবে। কিন্তু উদ্দেশ্য কাউকে ছোট করা নয়। কথা হচ্ছে, আপনাকে ভাবতে হবে। আমাকে ভাবতে হবে। আমাদের পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সমাজকে ভাবতে হবে।
কারণ একটি প্রজন্ম হঠাৎ করে তৈরি হয় না। পরিবার তাদের তৈরি করে, শিক্ষা ব্যবস্থা তাদের গড়ে, সমাজ তাদের আচরণ শেখায় এবং আমরা বড়রা তাদের সামনে যে উদাহরণ তৈরি করি, তারা তারই অনেকটা অনুসরণ করে। তাই শুধু তরুণদের দোষ দিয়ে নিজেদের দায়িত্ব শেষ করে দিলে চলবে না।
বই বিমুখ প্রজন্মকে বইয়ের কাছে ফিরিয়ে আনতে হবে
এই জেনারেশন বড্ড বই-বিমুখ। এরা টেবিলে বসতে চায় না। লাইব্রেরি চেনে না। আসুন, এদের হাতে বই তুলে দিই। এদের টেবিলে বসাই। প্রত্যেকটি বাসায় একটি করে মিনি লাইব্রেরি গড়ে তুলি। বাড়িতে শুধু দামি টেলিভিশন, ফ্রিজ, মোবাইল কিংবা আসবাবপত্র নয়—বইয়ের জন্যও জায়গা রাখি।
আমাদের একটি বড়সড় বই-বিপ্লব করতেই হবে। কারণ একটি ভালো বই কখনো শুধু জ্ঞান দেয় না; একটি ভালো বই মানুষের চিন্তাকে বদলে দিতে পারে, চরিত্রকে গড়ে দিতে পারে এবং জীবনের লক্ষ্য সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শেখাতে পারে।
ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার প্রয়োজন
এদের (অস্থির জেনারেশন) ধর্মীয় জ্ঞান দিতে হবে। ঘরে কুরআন ও হাদীস রাখতে হবে এবং অর্থসহ পড়ার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। নবী (সা.)-এর জীবনী, সাহাবিদের জীবন, যুগে যুগে আত্মত্যাগী আলেমদের জীবনী এবং দেশ ও জাতির কল্যাণে, মানবতার জন্য যারা জীবন উৎসর্গ করেছেন—তাদের জীবন ও কর্ম সম্পর্কে পড়াতে হবে পারিবারিকভাবেই।
শুধু মুখস্থ শিক্ষা নয়, তাদের বোঝাতে হবে—জীবনের উদ্দেশ্য কী, মানুষের প্রতি দায়িত্ব কী, বাবা-মায়ের প্রতি কর্তব্য কী, প্রতিবেশীর অধিকার কী, দেশ ও সমাজের প্রতি আমাদের দায়িত্ব কী। কারণ চরিত্র গঠনের শিক্ষা শুধু স্কুল-কলেজ থেকে আসে না; এর সবচেয়ে বড় শিক্ষালয় হলো পরিবার।
এখনই সময় ভাবার এই অস্থির জেনারেশন নিয়ে
অন্যথায় এরা (অস্থির জেনারেশন) হারিয়ে যেতে পারে। আর একটি প্রজন্ম হারিয়ে গেলে তার ক্ষতি শুধু সেই প্রজন্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তার প্রভাব পড়ে পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর।
আমরা এমন একটি প্রজন্ম চাই, যারা প্রযুক্তি জানবে কিন্তু প্রযুক্তির দাস হবে না। যারা আধুনিক হবে কিন্তু শিকড় ভুলবে না। যারা জ্ঞান অর্জন করবে কিন্তু অহংকারী হবে না। যারা নিজেদের অধিকার জানবে, একই সঙ্গে অন্যের অধিকারও সম্মান করবে।
আমরা এমন তরুণ চাই, যারা বই পড়বে, মাঠে খেলবে, প্রকৃতিকে ভালোবাসবে, বড়দের সম্মান করবে, ছোটদের স্নেহ করবে, বাবা-মায়ের যত্ন নেবে এবং নিজের জীবনকে একটি মহৎ উদ্দেশ্যের সঙ্গে যুক্ত করবে।
এখনও সময় আছে। প্রজন্মকে গালি দেওয়ার সময় নয়—প্রজন্মকে গড়ে তোলার সময়। তাই পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সচেতন প্রত্যেক মানুষের প্রতি আহ্বান—আসুন, আমরা সবাই মিলে এই প্রজন্মের হাতে বই তুলে দিই, তাদের মাঠে ফিরিয়ে আনি, প্রকৃতির কাছে নিয়ে যাই, নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষায় সমৃদ্ধ করি এবং জীবনের একটি সুন্দর উদ্দেশ্য খুঁজে পেতে সাহায্য করি।
কারণ আজ আমরা যে প্রজন্ম তৈরি করছি, আগামী দিনের বাংলাদেশ মূলত তাদের হাতেই থাকবে। সকলের সুদৃষ্টি ও আন্তরিক সহযোগিতা একান্তভাবে কামনা করছি।
আরও পড়ুন: সেযুগ আর এযুগের ছেলেমেয়েদের মধ্যে পরিবর্তন কতটা ভয়াবহ!


