মা দিবসেই মায়ের বুকে ছুরি বসাল মাদকাসক্ত ছেলে — ফেনীতে মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড

মাদকাসক্ত ছেলের হাতে মা খুন ফেনী

বিশ্বজুড়ে যখন মা দিবসের উৎসব চলছিল, ফুলে-ভালোবাসায় মায়েদের বরণ করে নেওয়ার আনন্দে মুখরিত ছিল ঘরে ঘরে — ঠিক সেই মুহূর্তে ফেনীর দাগনভূঞায় এক ভয়াবহ মর্মান্তিক ঘটনা ঘড়ির কাঁটাকে থামিয়ে দিল। মাদকের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা এক ছেলে ধারালো ছুরি দিয়ে নিজের মাকে হত্যা করল। আহত হলেন বাবা ও বোনও। মা দিবসের দিনে এই নিষ্ঠুর ঘটনা পুরো এলাকায় শোক ও আতঙ্কের ঢেউ তুলেছে।

ঘটনার বিবরণ: সন্ধ্যার অন্ধকারে রক্তাক্ত পরিবার

রবিবার (১০ মে, ২০২৫) সন্ধ্যাবেলা ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার সিন্দুরপুর ইউনিয়নের দিলপুর গ্রামে মকবুল আহমদ সুপারিন্টেন্ডেন্টের বাড়িতে এই ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটে। স্থানীয় বাসিন্দা মো. মোস্তফা (৪৫) ও তার স্ত্রী লাকি বেগমের (৪০) পরিবারে সন্ধ্যার নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎ আতঙ্কের চিৎকার ছড়িয়ে পড়ে। তাদের বড় ছেলে রাফি (২১) কোনো পূর্বসংকেত ছাড়াই ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ে এবং দুটি ধারালো ছুরি দিয়ে পরিবারের সদস্যদের উপর এলোপাতাড়ি হামলা চালায়।

হামলায় ঘটনাস্থলেই লুটিয়ে পড়েন মা লাকি বেগম। একইসাথে গুরুতরভাবে আহত হন বাবা মোস্তফা এবং ১৮ বছর বয়সী মেয়ে মিথিলা। পরিবারের কান্না ও আর্তচিৎকার শুনে পাশের বাড়ির মানুষজন ছুটে আসেন এবং রাফিকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেন। আটকের সময় তার কাছে হামলায় ব্যবহৃত দুটি ছুরি পাওয়া যায়।

মৃত্যুর কোলে লাকি বেগম — হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই শেষ নিঃশ্বাস

আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে ফেনী জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. শাহরিয়ার কবির জানান, লাকি বেগমকে হাসপাতালে আনার আগেই তিনি মারা গেছেন। তার মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।

আহত মোস্তফা ও মিথিলার অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হওয়ায় প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাদের দুজনকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে (চমেক) স্থানান্তর করা হয়েছে।

মাদকের টাকাই কাল হলো — রাফির ভয়াবহ অতীত

রাফির চাচাতো ভাই এমরান হোসেন জানান, রাফি দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্তিতে জড়িয়ে গেছে। মাদকের টাকার জন্য সে প্রায়ই পরিবারের সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদ করত। পরিবার বারবার তাকে সংশোধনের চেষ্টা করেছে, কিন্তু সে পথ থেকে ফেরেনি। এমরান বলেন, “আজকের এই ভয়াবহ ঘটনার পেছনেও মাদকের টাকাই মূল কারণ বলে আমরা ধারণা করছি।”

দাগনভূঞা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ ফয়জুল আজীম জানান, রাফি এলাকায় একজন পরিচিত বখাটে ও মাদকসেবী হিসেবে পরিচিত ছিল। তার মতে, ঘটনাটি রাফি অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পনা করে ঘটিয়েছে বলেই মনে হচ্ছে, কারণ সে একসাথে দুটি ছুরি বহন করছিল।

এলাকায় শোক ও ক্ষোভের ঝড়

মা দিবসের দিনে এই হত্যাকাণ্ড এলাকাবাসীকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা রাতুল বলেন, “একজন মা সন্তানের জন্য সারাজীবন কষ্ট করেন, স্বপ্ন দেখেন। সেই সন্তানের হাতে মায়ের এভাবে প্রাণ যাওয়া শুধু হৃদয়বিদারক নয়, এটি মানবতার প্রতিও এক ভয়ংকর আঘাত।”

এলাকার মানুষজন মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর সামাজিক ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি তুলেছেন। তারা বলছেন, একটি পরিবার আজ ধ্বংস হয়ে গেল — একটি মা হারাল পৃথিবী, একটি পরিবার হারাল তার ভিত্তি।

মাদকাসক্তি: পরিবারের নীরব শত্রু

এই ঘটনাটি আমাদের সামনে আবারও সেই ভয়ানক সত্য তুলে ধরে — মাদকাসক্তি শুধু একজন ব্যক্তিকে নয়, গোটা পরিবারকে ধ্বংস করে দেয়। রাফির পরিবার বছরের পর বছর তাকে ভালোবেসেছে, সহ্য করেছে, সংশোধনের চেষ্টা করেছে। কিন্তু মাদকের দানব শেষ পর্যন্ত সেই ভালোবাসাকেও গ্রাস করে নিল।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা একটি পর্যায়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে এবং অর্থের জন্য যেকোনো সহিংস পথ বেছে নিতে পারে। পরিবারের সদস্যদের উচিত এই পরিস্থিতিতে পেশাদার সাহায্য নেওয়া এবং নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

আইনি পদক্ষেপ ও পরবর্তী কার্যক্রম

দাগনভূঞা থানা পুলিশ রাফিকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে। হত্যার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। নিহত লাকি বেগমের মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।


মা দিবসে যখন পৃথিবীর সব মা উপহার পাওয়ার যোগ্য ছিলেন, লাকি বেগম পেলেন কেবল তার নিজের সন্তানের হাতে নির্মম মৃত্যু। এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়, এটি গোটা সমাজের জন্য একটি সতর্কবার্তা।

আরও পড়ুন: গাজীপুরে স্ত্রী ও তিন সন্তানসহ ৫ জনকে গলা কেটে হত্যা — পলাতক স্বামী ফোরকান

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top