মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধে কোনোভাবেই যোগ না দেওয়ার অবস্থান আরও জোরালোভাবে পুনর্ব্যক্ত করেছে ফ্রান্স। শুক্রবার (০১ মে ২০২৫) ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল বারো দেশটির অবস্থান স্পষ্ট করে বলেন, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে পরিচালিত এই সামরিক অভিযানে প্যারিসের অংশগ্রহণ সম্পূর্ণ অসম্ভব। তুরস্কভিত্তিক সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সি এই খবর প্রথম প্রকাশ করে।
বারোর বক্তব্য: যুদ্ধের লক্ষ্য অস্পষ্ট, আইন লঙ্ঘন স্পষ্ট
ফরাসি সংবাদমাধ্যম বিএফএম টিভিকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল বারো বলেন, “এই সংকট শুরুর পর থেকেই ফ্রান্স যুদ্ধে জড়ায়নি এবং ভবিষ্যতেও জড়াবে না। আমরা শুরু থেকেই পরিষ্কারভাবে জানিয়েছি যে, যুদ্ধের কোনো সুনির্দিষ্ট ও গ্রহণযোগ্য লক্ষ্য না থাকা এবং আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করে এই সামরিক অভিযান পরিচালিত হওয়ায় ফ্রান্সের পক্ষে এতে অংশগ্রহণ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।”
তিনি আরও বলেন, “এ যুদ্ধ আমাদের কাম্য ছিল না। উত্তেজনা বৃদ্ধির ঝুঁকি প্রতিদিনই বাড়ছে। বিশ্ব অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাব এখন স্পষ্টভাবে অনুভূত হচ্ছে।” কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিয়ে বারো স্পষ্ট করেন যে, আলোচনার মাধ্যমে এই সংঘাতের অবসান ঘটানোই একমাত্র যুক্তিসঙ্গত পথ।
হরমুজ প্রণালি: বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কেন্দ্রবিন্দু
এই যুদ্ধের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক পরিণতি হিসেবে দেখা দিয়েছে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়া। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই একটি প্রণালির মধ্য দিয়ে পরিবহন করা হয়। ইরান উপকূলে অবস্থিত এই কৌশলগত জলপথ বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচল পুনরায় স্বাভাবিক করতে একটি আন্তর্জাতিক নৌমিশন গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান বারো। তিনি সতর্ক করে দেন, “কোনো প্রণালিতেই কোনো ধরনের বাধা, ব্ল্যাকমেইল বা জোরপূর্বক টোল আদায় কোনো অবস্থাতেই মেনে নেওয়া হবে না। আন্তর্জাতিক জলসীমায় মুক্ত নৌচলাচলের অধিকার অলঙ্ঘনীয় এবং এটি নিশ্চিত করতে ফ্রান্স দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।”
যুদ্ধের পটভূমি: কীভাবে শুরু হলো এই সংঘাত?
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানকে লক্ষ্য করে সামরিক অভিযান শুরু করে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিরোধের এক পর্যায়ে এই সরাসরি সামরিক সংঘাতের সূচনা হয়। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ইরান পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদের বিভিন্ন স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালায় এবং কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করে।
এই যুদ্ধ শুধু আঞ্চলিক সংঘাতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি দ্রুত একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিচ্ছে। জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাত এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে ইতিমধ্যেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
ইউরোপীয় অবস্থান: ন্যাটো সদস্য হয়েও ভিন্নমত
ফ্রান্সের এই অবস্থান বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ কারণ দেশটি একইসঙ্গে ন্যাটোর সদস্য, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য এবং পশ্চিমা জোটের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এরপরও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পরিচালিত এই সামরিক অভিযানে ফ্রান্সের সরাসরি না বলা ইঙ্গিত দেয় যে, পশ্চিমা জোটের মধ্যে এই যুদ্ধ নিয়ে গভীর মতভেদ বিদ্যমান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ফ্রান্সের এই অবস্থান ভবিষ্যতে অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলোর কূটনৈতিক পদক্ষেপকেও প্রভাবিত করতে পারে এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকট নিরসনে একটি ইউরোপীয় মধ্যস্থতা উদ্যোগের পথ তৈরি করতে পারে।
আরও পড়ুন: উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আগাম বন্যার আশঙ্কা: পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে যাচ্ছে হাওরের ফসল, বিপদের মুখে পাঁচ নদী



