স্লিপার বাস নিয়ে কিছু অপ্রিয় সত্য কথা

স্লিপার বাস

বাংলাদেশে এখন প্রতিনিয়ত বহু স্লিপার বাস চলে। আমরা অনায়াসে যাতায়াতও করি। আমি তো ভাবছিলাম, সরকারের অনুমোদন নিয়েই এগুলো বাস চলে। কয়েকদিন আগে সময় টিভির খবরে আমি যা দেখলাম, তাতে তো অবাক না হয়ে পারলাম না। একটা বাসেরও নাকি অনুমোদন নাই—মানে, স্লিপার বাসগুলোর কথা বলছি। দেখুন, বাংলাদেশের অবস্থা। অনুমোদন একটারও নাই, অথচ গাড়ি চলছে শত শত, হাজার হাজার। সবার চোখের সামনেই চলছে এসব গাড়ি।

স্লিপার বাস চলুক, এতে আমার আপত্তি নেই

আমার কথা হলো, বাস চলে এতে আমার কোনো আপত্তি নাই। আমি নিজেও বেশ কয়েকবার এসব বাসে চড়েছি। কিন্তু সরকারের তরফ থেকে শর্ত সাপেক্ষে এখনও অনুমোদন দেওয়া হলো না কেন? এত এত বাস বন্ধ করা তো ইমপসিবল। তাহলে এসব বাসের জন্য নির্দিষ্ট কোনো আইন বা যেকোনো কিছু করা তো দরকার ছিল, তাই না!

আমি বলবো, এটা বাস মালিকদের ব্যর্থতা নয়। এটা অবশ্যই সরকারের ব্যর্থতা। এত বছর থেকে সরকার দেখেও না দেখার ভান করেছে অথবা মনোযোগ দেয়নি। আসলে বাংলাদেশে স্লিপার বাসগুলো নাকি সব কাস্টমাইজ করা। সরকারের বিভিন্ন দপ্তর এই খবরও জানে, অথচ এত বছর থেকে কাস্টমাইজ করা হয়েছে, সেই খবর কেউ রাখেনি। সব মুখ সম্ভবত টাকা-পয়সা দিয়ে বন্ধ করে রাখা হয়েছিল।

অনুমোদন না থাকলে এত বাস চলছে কীভাবে?

আমি অবাক এখানেই হইছি যে, সময় টিভির খবরে বলা হয়েছে যে—বাংলাদেশে এগুলোর একটারও অনুমোদন নাই। অথচ কত শত শত স্লিপার বাস চলছে। এগুলোতে আবার সময় মতো অনৈতিক কাজও হচ্ছে। এগুলো নিয়েও হয়তো অনেক খবর বের হয়েছে। অথচ এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থাই হয়তো নেওয়া হয়নি।

একটা বিষয় এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ—কোনো যানবাহন মানুষের প্রয়োজন মেটাচ্ছে বলেই সেটিকে আইনের বাইরে রেখে দেওয়া যায় না। বরং মানুষের প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করেই সেই যানবাহনের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং কঠোর নজরদারি থাকা দরকার।

আমি স্লিপার বাসের বিরোধিতা করছি না

আমি স্লিপার বাসগুলোর বিরোধিতা করছি না। আমি নিজেও বেশ কয়েকবার স্লিপার বাসের মাধ্যমে (কোম্পানিতে চাকরি করার সুবাদে) কক্সবাজার গিয়েছি। অনেক স্লিপার বাসই খুব কোয়ালিটিসম্পন্ন। তাদের কোনো খুঁত ধরা সম্ভব না।

কিন্তু আবার অনেক আনফিট গাড়িও রয়েছে। সেগুলোতে অনৈতিক কাজ চলে নিয়মিত। বাসও আনফিট, আবার চলেও খারাপ কাজ—তাহলে এগুলো যদি চোখের সামনে চলতে দেখা যায়, তাহলে তো সমাজের জন্য বড় মুশকিলের বার্তা এটা।

স্লিপার বাসের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত যাত্রীদের আরামদায়ক ও নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করা। যদি কোনো বাস সেই উদ্দেশ্যের পরিবর্তে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ তৈরি করে, তাহলে অবশ্যই সেখানে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

স্লিপার বাস বন্ধ নয়, প্রয়োজন নিয়ন্ত্রণ

স্লিপার বাস বাংলাদেশে চলুক—আমি এটাই চাই। কিন্তু সঙ্গে আরও চাই যে, প্রতিটি বাস যেন হয় সবদিক থেকে ফিট এবং নিরাপদে সবাই যেন এগুলোতে ভ্রমণ করতে পারে।

তাহলে অনতিবিলম্বে বাংলাদেশ সরকারের উচিত এই বাসগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। সেই সময় টিভির খবরে এক পুলিশ ভাইকে বলতে শোনা যায় যে, “আমরা বাসগুলো আটকাই, ধরি কিন্তু আবার ছেড়ে দেই—কারণ, আমাদের এখানে রাখার কোনো জায়গা নেই।”

হ্যাঁ, আমি পুলিশ ভাইয়ের কথার সঙ্গে একমত। কিন্তু দ্বিমত এখানেই যে, কঠোর আইন এবং আইনের প্রয়োগের মাধ্যমে অবশ্যই প্রতিটি স্লিপার বাসের সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব।

শুধু বাস আটক করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন একটি কার্যকর ব্যবস্থা। কোন বাস বৈধ, কোন বাস অবৈধ, কোন বাস ফিট, কোন বাস আনফিট—এসব বিষয় নিয়মিত পরীক্ষা করা দরকার। একই সঙ্গে যারা আইন ভাঙবে, তাদের বিরুদ্ধে এমন ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, যাতে অন্যরাও আইন ভাঙার আগে চিন্তা করে।

স্লিপার বাস এর জানালা নিয়েও প্রশ্ন আছে

স্লিপার বাসগুলোতে যাত্রা একটু সহজ ও আরামদায়ক মনে হলেও কিছু সমস্যাও রয়েছে। সেটা হচ্ছে, এই বাসে আপনি যখন চড়বেন, তখন এর জানালা কিন্তু আপনি খুলতে পারবেন না। এসি বাসগুলো যেমন ঠিক তেমন। তার মানে, বেশিরভাগ স্লিপার বাসেই হয়তো এসি রয়েছে। তবে এ ব্যাপারে আমি সিউর না।

তবে এসি থাকুক বা না থাকুক—সেটাকে আমি বিষয় ধরছি না। বিষয় হলো—দুর্ঘটনা হলে আপনি এই বাস থেকে জানালা ভেঙে যদি সম্ভব হয় বের হয়ে আসতে পারবেন। এছাড়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

এসি বাসগুলোর জানালা যদি খুলতে পারা যায়, বাঙালি জাতি আবার সেটাকে এক মাসের মধ্যে নষ্ট করে ফেলবে—এ কথাও সঠিক। কিন্তু নিরাপত্তার বিষয়টিও তো আমাদের মাথায় রাখতে হবে। কোনো দুর্ঘটনা বা জরুরি পরিস্থিতিতে যাত্রীদের বের হওয়ার বিকল্প ব্যবস্থা কী থাকবে, সেটাও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিশ্চিত করতে হবে।

বিআরটিএর দায়িত্বটা তাহলে কী?

বাংলাদেশের যে মেইন দায়িত্বশীল অফিস বিআরটিএ, তাদের কাজটা কী?

এখনও মানুষ ড্রাইভারী পরীক্ষায় কিছু টাকা ঘুষ দিচ্ছে এবং পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার পরেও কোনোভাবে পাস হয়ে যাচ্ছে এবং লাইসেন্স পাচ্ছে। এই বিষয়টি ওই ব্যক্তির জন্য মোটেও নিরাপদ নয়। কেউ কেউ তো পরীক্ষা-ই দেয় না। সব টাকার খেলা।

মনে হয়, টাকার বাবা ওই জায়গায় থাকে এবং টাকা দিলেই সব হয়ে যায়। এই বিষয়গুলো কিন্তু সবাই জানে। সবাই নিশ্চুপ। কারণ, এটার সঙ্গে জড়িত নিচের ওই পিয়ন লোকটা থেকে শুরু করে উপরের ওই কর্তা পর্যন্ত।

আমি কাউকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করছি না। কিন্তু যদি বাস্তবেই এমন অনিয়ম থেকে থাকে, তাহলে সেটি বন্ধ করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। কারণ, একজন অযোগ্য চালকের হাতে শুধু একটি গাড়ি থাকে না—তার হাতে থাকে বহু মানুষের জীবন।

বিআরটিএ চাইলে সাত দিনেই পরিবর্তনের শুরু হতে পারে

বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ আজ যদি সবাই সততার পরিচয় দেয়, আগামী সাত দিনের মধ্যে বাংলাদেশকে পাল্টে ফেলা সম্ভব। রাস্তায় এত এত দুর্ঘটনা হবে না। স্লিপার বাসগুলো আইন মেনে চলবে। ড্রাইভারী পরীক্ষা এত সহজ হবে না।

যথারীতি পড়াশোনা করতে হবে এবং ট্রাফিক আইনগুলো সবার জানতে হবে। তবেই দেখবেন, আপামর জনসাধারণের মধ্যে একটা পরিবর্তন আসবে। কয়েকদিনের মধ্যে আমূল পরিবর্তন আসবে বাংলাদেশে।

অবশ্যই সাত দিনে পুরো বাংলাদেশ পরিবর্তন হয়ে যাবে—এটা বাস্তব কথা নয়। কিন্তু সাত দিনে যদি সঠিকভাবে আইন প্রয়োগের শুরু করা যায়, তাহলে পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব। আর সেই পরিবর্তন যদি ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যাওয়া যায়, তাহলে কয়েক বছর পর আমরা অনেক নিরাপদ সড়কব্যবস্থা দেখতে পারি।

কিন্তু এই কথাটা আমার স্বপ্নের কথা

কিন্তু উপরের কথাটা হলো আমার স্বপ্নের কথা। কারণ, আমরা বেশিরভাগ মানুষই কোনো না কোনোভাবে দুর্নীতিতে জড়িত। আমরা সবসময় যেখানে স্বার্থ পাই, সেখানে ছুটে চলি।

কীভাবে উন্নতি হবে এই বাংলাদেশের?

কেন এত বছর পর একটা টিভি চ্যানেল খবর করবে এবং তারপর আমাদের স্লিপার বাস নিয়ে তৎপর হতে হবে! বিআরটিএ কি এত এত বাস সম্পর্কে কিছুই জানতো না? এটা কোন কথা!

আসলে সবাই জানত। সবাই প্রয়োজনে এসব গাড়িও ব্যবহার করত। কিন্তু ভেতরে ভেতরে হয়তো চলে টাকা-পয়সার খেলা। আর তাই সব জেনেও সবাই চুপচাপ।

মানুষের প্রয়োজন আছে, তাই সঠিক ব্যবস্থাপনাও দরকার

যাই হোক, স্লিপার বাস কোনোভাবেই বন্ধের পক্ষে আমি না। বাংলাদেশে আরও আরও বাস সার্ভিস আসুক, যা জনগণের প্রয়োজন মেটাবে। কিন্তু তা যেন সবার জন্য সবরকম নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

একটি আধুনিক পরিবহনব্যবস্থা শুধু বাসের সংখ্যা বাড়ানোর নাম নয়। সেখানে যাত্রী নিরাপত্তা, চালকের দক্ষতা, গাড়ির ফিটনেস, নিয়মিত পরিদর্শন, পরিচ্ছন্নতা, জরুরি পরিস্থিতিতে বের হওয়ার ব্যবস্থা এবং আইন মেনে চলা—সবকিছুর সমন্বয় থাকতে হবে।

শুধু বাস মালিক নয়, আমাদের সবাইকে পরিবর্তন হতে হবে

আমাদের সবাইকে সৎ হতে হবে। স্লিপার বাস মালিক, কর্মচারী, বিআরটিএ এবং আমরা যারা এসব গাড়িতে উঠি—আমাদের সবাইকে চেঞ্জ হতে হবে।

সবার মধ্যে মানবিক গুণাবলি বাড়াতে হবে। গাড়িগুলোর মধ্যে সবরকম নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। তাহলে যাত্রীসেবা যেমন উন্নত হবে, ঠিক তেমন বাস মালিকরাও অনেকটা লাভবান হবে। সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারবে।

একজন বাস মালিক যদি ভালো পরিবেশ ও নিরাপদ সেবা দেন, তাহলে যাত্রীরাও সেই বাসকে বেশি পছন্দ করবেন। ভালো সার্ভিসের কারণে ব্যবসাও বাড়বে। তাই নিরাপত্তা ও নিয়ম মেনে চলা শুধু সরকারের জন্য নয়, বাস মালিকদের নিজেদের স্বার্থেও প্রয়োজন।

স্লিপার বাস এর ভবিষ্যৎ আরও সুন্দর হোক

পরিশেষে বলতে চাই, স্লিপার বাসগুলোর নির্ভরযোগ্যতা আরও বাড়ুক। গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়ুক। গাড়ির সার্ভিস আরও ভালো হোক। সরকারি যেকোনো নিয়ম যেন তারা মানে।

স্লিপার বাসগুলো যেন কোনোটাই ভ্রাম্যমাণ যৌন পল্লী হিসেবে বানানো না হয়। এ ব্যাপারে প্রয়োজনে বাস মালিকরাই সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসুক। কারণ, সবকিছুর তো একটা লিমিট আছে।

তাহলে দেখা যাবে, যাত্রীসেবা ভবিষ্যতে আরও ভালো হবে। আমরা বেশি সুবিধা পাবো। স্লিপার বাসগুলোর যাত্রীসেবায় আমূল পরিবর্তন আসুক—এই প্রত্যাশায় ইতি।

আরও পড়ুন: টাকা পয়সা কি সব সুখ দিতে পারে?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top