কিসের অভাব মানুষকে সবচেয়ে বেশি কাঁদায় – এটা সব মানুষের জন্য একই প্রশ্ন হলেও উত্তরটা একেকজনের কাছে একেকরকম। যে মানুষ যে পরিস্থিতিতে পরে কেঁদেছে, কষ্ট পেয়েছে সেই মানুষ সেই অবস্থার কথাই বলবে। তবে, আমি বলবো – অভাব মানুষকে কাঁদায়। সেটা যে অভাবই হোক না কেন। কিন্তু হেডলাইনে আছে – বেশি কাঁদায়। কোন অভাবটা মানুষকে বেশি কাঁদায়? উত্তর – ঐ মানুষটির জীবনের সবচেয়ে কষ্টের মূহুর্তে যে জিনিসের অভাব ছিল – সেটা। হতে পারে ভালোবাসার মানুষ, ঋণ, টাকা-পয়সার অভাব, সুস্বাস্থ্যের অভাব, খাবারের অভাব ইত্যাদি।
তবে আজ আমি আমার কথাই বলবো। আমাকে যে অভাবটি সবচেয়ে বেশি কাঁদিয়েছে এবং এখনও কাঁদছি সেই বিষয়গুলোই তুলে ধরবো। আশা করি, আমার লিখাটা পড়ার পড়ে আপনি একটু সাহস পাবেন।
মানুষ পৃথিবীতে এসেছে মূলত জীবনে দুটি জিনিস ধারণ করার জন্য। সেটা হলো কোনসময় সে সুখ পাবে আবার কোনসময় সে কষ্ট পাবে। এই দুই ছাড়া পৃথিবীতে আসলে কিছুই নেই। চারপাশে তাকালে দেখবেন, কেউ-ই পুরোপুরি সুখে নাই আবার কেউ-ই পুরোপুরি দুঃখে নাই। হ্যা, মানুষ ভুলের উর্ধ্বে নয়। নিজের জীবনের দূর্দশা কারও কারও জীবনে আসে তার নিজের ভুলের কারনে। এটা অনেকটা আপেক্ষিক। কারন, আমরা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানি না, শুধু অনুমান করতে পারি।
আমি জীবনে বিভিন্ন কারনে কেঁদেছি। তবে সবচেয়ে বেশি কেঁদেছি আমি অর্থাভাবে অর্থাৎ টাকা-পয়সার অভাবের কারনে। সেই ছোট্ট বেলা থেকে কষ্ট দেখে দেখেই বড় হয়েছি। খাবারের কষ্টও আমি নিজ চোখে দেখেছি। কখনো কখনো আমাদের তিনবেলার খাবার থাকতো না। আমার মা, আমার ভাবী পাড়া-প্রতিবেশীদের কাছ থেকে অনেক সময় চাল ধার করে নিয়ে আসতেন। তারা হয়তো প্রায়ই যেতে চাইতেন না কিন্তু একদম নিরুপায় হয়ে গেলে এছাড়া তাদের আর কোন পথ থাকতো না।
আমি সবই দেখতাম, সবই বুঝতাম কিন্তু আমার করার কিছুই ছিলো না। কারন, তখন আমি ছোট। নিজে ইনকাম করতাম না। হয়তো যারা সেই সময় ভালো চলতো তারা অনেকেই ছিঃ ছিঃ করতো। কিন্তু যার অভাব সেই তো জানে কেন তার স্বভাব খারাপ হয়ে গেলো।
একসময় ভাতের অভাব দূর হলো। কিন্তু টাকার অভাব যেন আর দূর হয় না। এর কাছে, ওর কাছ থেকে ধার দেনা আমাদের করাই লাগতো। ধার দেনা ছাড়া আমরা মানে আমার পরিবার চলতে পারতো না। যখন আমি এই পোস্ট লিখছি তখনও কিছু মানুষ আমাদের কাছে কিছু টাকা পয়সা পায়। একটা কথা আছে যে, লোন বা ঋণ করা যেমন সহজ কিন্তু এটা পরিশোধ করা ঠিক ততোটাই কঠিন।
আমি টাকার কথা এজন্যই বলছি যে, টাকা দিয়ে যেকোন বস্তুগত জিনিষকে কেনা যায়, ভোগ করা যায়। পৃথিবীতে এমন কোন বস্তুগত জিনিস নাই যা টাকা দিয়ে কেনা যায় না। সব কেনা যায়। আর তাই, টাকার অভাব মানুষকে বেশি কাঁদায়। এই ধরুন, আপনার পরিবারে কেউ অসুস্থ। এখন তাকে যদি ভালো জায়গায় ট্রিটমেন্ট করাতে চান তাহলে অবশ্যই আপনার বেশি পরিমাণ টাকার প্রয়োজন হবে। এভাবে যেকোন জিনিস যা আপনার একান্ত প্রয়োজন কিংবা প্রয়োজনের বাইরে – কিন্তু সবই টাকার সাহায্যেই ভোগ করতে পারবেন অথবা নিতে পারবেন।
টাকার কাজ বহুমুখী। জীবনে যতগুলো মুখী আছে সব মুখীতেই টাকা লাগবে। যে যাই বলুক, টাকা আপনার লাগবেই। কাউকে ভালোবাসতে গেলে অথবা আত্মীয়-স্বজনকে খেদমত করতে গেলেও টাকা পয়সার প্রয়োজন আছে। হ্যা, সুখের সমীকরণটা এখানে আলাদা। সুখ একটা আপেক্ষিক জিনিস। সুখকে কখনো শুধুমাত্র টাকা দিয়ে পরিমাপ করা ঠিক না।
আমি আমার এই বয়স পর্যন্ত টাকার অভাবে অনেক কিছুই কিনতে পারিনি। সেগুলোর সবকিছুই আমার প্রয়োজন ছিল বিষয়টি এমন নয়। কিন্তু অনেক কিছুই প্রয়োজনীয় ছিল। টাকার অভাবে আমি এইচএসসি পাসের পর ইউনিভার্সিটি পরীক্ষা দিতে পারিনি। টাকার অভাবে আমি আমার মায়ের থেকে ৪০০ কিলোমিটার দূরে থাকে। টাকার অভাবে আমরা ঢাকা শহরে ভাড়া বাসায় থাকি। অনেক সময় ঠিকমতো বাসা ভাড়া দিতে পারিনা তখন উনাদের কথা শুনতে হয়।
সব মিলে টাকার অভাবে আজ আমি চরম হাহাকারের মধ্যে আছি। তবুও আমি বিশ্বাস করে, একসময় হয়তো পরিবর্তন আসে। সেই সময় হয়তো জীবনের স্বাদ আর আহৃলাদগুলো সব শেষ হয়ে যাবে।
আপডেট হবে…

