ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সম্প্রতি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। সবচেয়ে আলোচিত ইস্যুটি হলো — ঈদুল আজহা তথা কোরবানির ঈদের ঠিক আগমুহূর্তে রাজ্যজুড়ে গরুর মাংস কাটা, বেচাকেনা এবং পরিবহনের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি। এই পদক্ষেপ শুধু সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের নয়, হিন্দু পশুপালক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যেও তীব্র অসন্তোষ তৈরি করেছে।
বিজেপি সরকারের ক্ষমতা গ্রহণ ও নতুন বিধিনিষেধ
চলতি বছরের ৯ মে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। ক্ষমতায় আসার অল্প সময়ের মধ্যেই সরকার একটি সরকারি বিজ্ঞপ্তি জারি করে, যেখানে বলা হয়েছে —
- ১৪ বছরের কম বয়সী কোনো গবাদিপশু জবাই করা যাবে না।
- যেকোনো গবাদিপশু জবাইয়ের আগে স্থানীয় প্রশাসন অথবা রাজ্যের প্রাণিসম্পদ দপ্তরের লিখিত পূর্বানুমতি নিতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মে মাসের শেষ সপ্তাহে ঈদুল আজহার মতো একটি বড় ধর্মীয় উৎসবের ঠিক আগমুহূর্তে এই ধরনের বিজ্ঞপ্তি কার্যত কোরবানির প্রস্তুতিকে অসম্ভব করে তুলেছে।
গরুর ‘জন্মসনদ’ — নতুন বিতর্কের জন্ম
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন বিজেপির নবনির্বাচিত বিধায়করা রাস্তায় নেমে গবাদিপশুবাহী যানবাহন আটক করতে শুরু করেন এবং গরুর ‘বার্থ সার্টিফিকেট’ বা জন্মসনদ দাবি করেন।
উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার হিঙ্গলগঞ্জ এলাকার লেবুখালীতে এ ধরনের একটি ঘটনা সামনে আসে। হিঙ্গলগঞ্জের বিজেপি বিধায়ক রেখা পাত্র একটি গবাদিপশুবাহী গাড়ি থামিয়ে দাবি করেন — গরুর জন্মের নথি বা সার্টিফিকেট দেখাতে হবে, তবেই গাড়িটিকে ছাড়া হবে।
এই ঘটনা দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সূত্রপাত হয়। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন — গরুর জন্মসনদ কী এবং কোথা থেকে পাওয়া যাবে?
তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক কুনাল ঘোষ এ বিষয়ে কটাক্ষ করে বলেন, “আমরা বিধায়ক মহাশয়কে অনুরোধ করব, বিজেপিশাসিত যেকোনো একটি রাজ্যে গরুর জন্মসনদের প্রচলন থাকলে আমাদের সেটি দেখান — তাহলে আমরাও রেফারেন্স হিসেবে কাজে লাগাতে পারব।”
কলকাতায় গরুর মাংস উধাও
এই নিষেধাজ্ঞার সরাসরি প্রভাব পড়েছে কলকাতার বাজার ও রেস্তোরাঁগুলোয়। শহরজুড়ে গরুর মাংস কার্যত অপ্রাপ্য হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন রেস্তোরাঁ থেকে গরুর মাংসের পদ মেনু থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। মাংসের দোকানে ঝাঁপ পড়েছে। মুসলিম সংখ্যালঘু-অধ্যুষিত জেলাগুলোয় ছড়িয়ে পড়েছে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা।
শুধু মুসলিম নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হিন্দু পশুপালকরাও
এই নিষেধাজ্ঞাকে কেবল সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে সম্পূর্ণ চিত্র উঠে আসে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক হিন্দু গরুর খামারি ও ব্যবসায়ী তাদের হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
তাদের বক্তব্য হলো —
- বছরের এই বিশেষ সময়ে, অর্থাৎ ঈদুল আজহার আগে গরু বিক্রি করে তারা সারা বছরের তুলনায় অনেক বেশি আয় করেন।
- মৌসুমি এই আয়ের ওপর নির্ভর করে তারা সংসার পরিচালনা করেন।
- হঠাৎ করে জারি করা এই নিষেধাজ্ঞায় তাদের ব্যবসা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।
কৃষি ও পশুপালন-নির্ভর গ্রামীণ অর্থনীতিতে এই ধাক্কা মারাত্মক বলে মনে করছেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা
রাজ্যজুড়ে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ছে। বিরোধীরা অভিযোগ করছেন, ঈদুল আজহার মতো একটি ধর্মীয় উৎসবের আগে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া স্পষ্টতই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে নেওয়া পদক্ষেপ। পাশাপাশি, সংখ্যালঘু অধ্যুষিত বিভিন্ন এলাকায় অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে।
মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনে বাধা সৃষ্টি করা সংবিধানস্বীকৃত ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিপন্থী।
সামনে কী?
পশ্চিমবঙ্গের এই পরিস্থিতি এখন সারা ভারতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। ঈদুল আজহা ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কোর্টে রিট আবেদনের প্রস্তুতির খবরও শোনা যাচ্ছে।
রাজ্যের প্রশাসনিক ও বিচারিক মহল এই বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয়, তার দিকে নজর রাখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ।
আরও পড়ুন: ভারতে চলন্ত ট্রেনে নির্যাতনের পর ইমামকে ধাক্কা দিয়ে হত্যা — উত্তরপ্রদেশে চাঞ্চল্যকর ঘটনা

