মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা আবারও বিপজ্জনক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাময়িক যুদ্ধবিরতি বিরাজ করলেও পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত নাজুক। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিলেও পরবর্তীতে ‘গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক আলোচনা’ চলার কথা জানিয়ে সেই পরিকল্পনা সাময়িক স্থগিত রাখেন। তবে এই স্থিতাবস্থা কতদিন টিকবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা গভীর সন্দেহে রয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে — যদি সত্যিই নতুন করে যুদ্ধ শুরু হয়, তাহলে ইরান কীভাবে এবং কোথায় আঘাত হানতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিশেষজ্ঞরা ইরানের সামরিক সক্ষমতা, ভূ-রাজনৈতিক লিভারেজ এবং অর্থনৈতিক অস্ত্রের বিস্তারিত বিশ্লেষণ করছেন।
ইরানের কৌশলগত পরিবর্তন: দীর্ঘস্থায়ী নয়, এবার তীব্র যুদ্ধের প্রস্তুতি
জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের ইরানবিষয়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ হামিদরেজা আজিজি জানিয়েছেন, চলতি বছরের শুরুতে প্রথম দফার সংঘাতে ইরান প্রায় তিন মাস ধরে একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের পরিকল্পনা অনুসরণ করছিল। সেই কারণে তারা তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার সংযতভাবে ব্যবহার করেছিল — উদ্দেশ্য ছিল দীর্ঘ সময় ধরে ক্রমাগত চাপ বজায় রাখা।
কিন্তু পরিস্থিতি এখন বদলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন সংঘাত হলে ইরান সম্পূর্ণ ভিন্ন কৌশল অনুসরণ করবে। এবার লড়াই হবে ‘স্বল্পস্থায়ী কিন্তু অত্যন্ত তীব্র’। ইরানি নেতৃত্ব বিশ্বাস করছে যে শত্রুপক্ষ এবার ইরানের জ্বালানি ও শিল্প অবকাঠামো লক্ষ্য করে সমন্বিত ও ভারী হামলা চালাবে। তাই পাল্টা আঘাতও হবে দ্রুত, ব্যাপক এবং বহুমুখী।
প্রতিদিন শত শত ক্ষেপণাস্ত্র: ইরানের সামরিক শক্তির প্রদর্শন
হামিদরেজা আজিজির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নতুন সংঘাতের ক্ষেত্রে ইরান প্রতিদিন কয়েক ডজন থেকে শুরু করে কয়েকশো পর্যন্ত ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে সক্ষম। এই কৌশলের মূল লক্ষ্য দুটি:
প্রথমত, শত্রুর বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অভিভূত করা — একসাথে এত বেশি ক্ষেপণাস্ত্র আসলে সব ঠেকানো কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে।
দ্বিতীয়ত, প্রতিপক্ষের কৌশলগত হিসাব-নিকাশ সম্পূর্ণভাবে উল্টে দেওয়া — যাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল অনুধাবন করে যে এই যুদ্ধের মূল্য তারা যতটা ধরেছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি হবে।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বিস্তৃত ও বৈচিত্র্যময় বলে বিবেচিত। তাদের কাছে স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘপাল্লার বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যা ইসরায়েলসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম।
উপসাগরীয় তেল স্থাপনায় হামলা: বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করার অস্ত্র
ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী কৌশলগত অস্ত্রগুলোর একটি হলো পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও গ্যাস অবকাঠামোতে আঘাত হানার ক্ষমতা। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতের তেলক্ষেত্র, পরিশোধনাগার ও সমুদ্রবন্দরে হামলা চালানো হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে ভয়াবহ বিপর্যয় নামতে পারে।
আন্তর্জাতিক তেলবাজারে এই অঞ্চল থেকে প্রতিদিন কোটি কোটি ব্যারেল তেল সরবরাহ হয়। এই সরবরাহ বিঘ্নিত হলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানির দাম হু হু করে বাড়বে, যা যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর অর্থনীতিতে সরাসরি আঘাত হানবে। ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এটি একটি বড় ঘরোয়া রাজনৈতিক চাপ হয়ে উঠবে, কারণ জ্বালানি মূল্যের ঊর্ধ্বগতি সাধারণ আমেরিকান ভোক্তাদের সরাসরি প্রভাবিত করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটাই ইরানের সবচেয়ে কার্যকর লিভারেজ — কারণ এটি শুধু সামরিক ক্ষেত্রে নয়, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও প্রচণ্ড চাপ তৈরি করে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর বিরুদ্ধে সরাসরি হুমকি: আমিরাত ও সৌদি আরব কতটা ঝুঁকিতে?
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরানি কর্মকর্তা ও সরকারঘনিষ্ঠ বিশ্লেষকদের বক্তব্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিরুদ্ধে তীব্র সতর্কবার্তা উঠে এসেছে। অভিযোগ করা হচ্ছে, আমিরাত তার ভূখণ্ডে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি পরিচালনার সুযোগ দিয়ে কার্যত ইরানের বিরুদ্ধে পরোক্ষ যুদ্ধে অংশ নিয়েছে।
ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর ঘনিষ্ঠ বিশ্লেষক মেহেদি খারাতিয়ান এক পডকাস্ট সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেছেন, প্রয়োজন হলে আমিরাতকে কয়েক দশক পিছিয়ে দেওয়া হবে এবং প্রয়োজনে আবুধাবি দখলের কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন।
আরব গালফ স্টেটস ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো আলী আলফোনেহ মনে করেন, এই বক্তব্যগুলো যতটাই বাগাড়ম্বরপূর্ণ মনে হোক, এগুলো ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) শীর্ষ নেতৃত্বের প্রকৃত চিন্তাভাবনার প্রতিফলন। এই হুমকিকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
কিছু সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এমনও দাবি উঠেছে যে গত দফার মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার সময় সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত গোপনে ইরানের বিরুদ্ধে সক্রিয় ছিল। এটি সত্য হলে উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের পরবর্তী পাল্টা হামলার সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।
আলফোনেহ আরও বলেছেন, সৌদি-ইরান কোনো অনাক্রমণ চুক্তির সম্ভাবনাকে তিনি সম্পূর্ণ অবাস্তব মনে করেন। বরং উপসাগরীয় তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর ওপর হামলার এই হুমকিই যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত আক্রমণাত্মক হতে নিবৃত্ত রাখছে।
হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব: দুটি প্রণালি, বিশ্ব বাণিজ্যের গলা টিপে ধরার সুযোগ
ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান তাকে বিশ্ব বাণিজ্যের দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণের সুবিধা দেয়।
হরমুজ প্রণালি: পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট তেল রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহন হয়। ইরান এই প্রণালি বন্ধ করে দিলে বা বাধাগ্রস্ত করলে তেলের দাম রাতারাতি আকাশচুম্বী হবে এবং বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলো তীব্র জ্বালানি সংকটে পড়বে। গত দফার যুদ্ধেও ইরান এই প্রণালির কাছাকাছি নিজেদের উপস্থিতি ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল।
বাব আল-মান্দেব প্রণালি: লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট বাণিজ্যের প্রায় ১০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। এই প্রণালির পাশেই ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বাহিনীর নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল। হুতিরা ইতোমধ্যে এই জলপথে একাধিকবার জাহাজে হামলা চালিয়েছে।
বিশেষজ্ঞ হামিদরেজা আজিজির মতে, যদি ইরান মনে করে হরমুজ প্রণালিতে তাদের নিয়ন্ত্রণ ঝুঁকির মুখে পড়েছে, তাহলে তারা বাব আল-মান্দেব প্রণালিতেও সক্রিয় হয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে একই সাথে দুটি সমুদ্র ফ্রন্টে মনোযোগ দিতে বাধ্য করতে পারে।
বিশ্লেষক মেহেদি খারাতিয়ান ইতোমধ্যে সতর্ক করেছেন — যদি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অর্থনৈতিক অবকাঠামোতে আঘাত হানে, তাহলে বাব আল-মান্দেবে জাহাজ চলাচল সীমিত করে পাল্টা জবাব দেওয়া হবে।
হুতি মিলিশিয়া: ইরানের আঞ্চলিক প্রক্সি শক্তি কতটা কার্যকর?
ইয়েমেনের হুতি মিলিশিয়া দীর্ঘদিন ধরে ইরানের একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক মিত্র হিসেবে পরিচিত। তারা ঘোষণা দিয়েছে যে যেকোনো আঞ্চলিক সংঘাতে ইরানের পক্ষে লড়াই করবে। তবে বাস্তব চিত্র কিছুটা জটিল।
গত দফার যুদ্ধে হুতিরা প্রত্যাশার তুলনায় অনেক সতর্ক ও সংযত ভূমিকা পালন করেছিল। বিশ্লেষকরা বলছেন, এর কারণ হলো দীর্ঘদিনের যুদ্ধে তাদের সামরিক মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। তারা সম্ভবত হিসাব করছিল কোথায় এবং কতটুকু শক্তি ব্যবহার করা তাদের জন্য কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক।
তবে নতুন পরিস্থিতিতে, বিশেষ করে যদি ইরান সরাসরি বড় আঘাতের শিকার হয়, তাহলে হুতিরা আরও সক্রিয় ভূমিকায় আসতে পারে।
সাইবার আক্রমণ ও অপ্রচলিত যুদ্ধকৌশল
শুধু প্রচলিত সামরিক শক্তি নয়, ইরান সাইবার যুদ্ধেও উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা অর্জন করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে সাইবার হামলা, তথ্য চুরি এবং ডিজিটাল বিভ্রান্তি ছড়ানো — এগুলো ইরানের পরিচিত কৌশল।
এছাড়াও লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইরাকের বিভিন্ন মিলিশিয়া গোষ্ঠী এবং অন্যান্য আঞ্চলিক মিত্রদের মাধ্যমে ইরান তার ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ সক্রিয় করতে পারে। যদিও হিজবুল্লাহ সাম্প্রতিক সংঘাতে উল্লেখযোগ্য ক্ষতির মুখে পড়েছে, তবুও তারা এখনও একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে বিবেচিত।
পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে?
বর্তমান পরিস্থিতিতে কূটনীতিই একমাত্র টেকসই সমাধান বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়পক্ষই জানে যে নতুন যুদ্ধে উভয়েরই বড় ক্ষতি হবে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র জানে যে ইরানকে সামরিকভাবে সম্পূর্ণ পরাস্ত করা সহজ নয়, এবং ইরানের পাল্টা হামলা বিশ্ব অর্থনীতিকে মারাত্মক ক্ষতির মুখে ফেলতে পারে।
ইরান অন্যদিকে জানে যে তাদের সামরিক ও পারমাণবিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে সমন্বিত হামলা দেশের অর্থনীতি ও নিরাপত্তায় দীর্ঘমেয়াদি ক্ষত তৈরি করবে।
তাই উভয়পক্ষই এখন আলোচনার টেবিলে সমাধান খোঁজার চেষ্টা করছে — যদিও পরিস্থিতি যেকোনো মুহূর্তে ভিন্ন দিকে মোড় নিতে পারে।
উপসংহার
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে তার পরিণতি শুধু ইরান বা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। উপসাগরীয় তেল অবকাঠামোতে হামলা, হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব প্রণালি অবরোধ এবং আঞ্চলিক মিলিশিয়াদের সক্রিয়করণ — এই তিনটি কৌশলের যুগপৎ প্রয়োগ বিশ্ব অর্থনীতিকে একটি গভীর সংকটে ঠেলে দিতে পারে। ইরান জানে এটাই তার সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। আর বিশ্বের বাকি দেশগুলো জানে, এই যুদ্ধের শিখা ছড়িয়ে পড়লে কেউই নিরাপদ নয়।
আরও পড়ুন: পশ্চিমবঙ্গে কোরবানির আগে গরু বেচাকেনায় নিষেধাজ্ঞা: বিতর্ক ও বিক্ষোভে উত্তপ্ত রাজ্য

