রাজধানীর মিরপুর পল্লবীতে ঘটে গেল এক হৃদয়বিদারক ও বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড। মাত্র আট বছর বয়সী নিষ্পাপ শিশু রামিসা আক্তারকে পাশের ফ্লাটের ভাড়াটিয়া সোহেল রানা নৃশংসভাবে হত্যা করেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। শুধু হত্যাই নয়, হত্যার পর শিশুটির মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। এই পৈশাচিক ঘটনায় সারাদেশে শোক ও ক্ষোভের ঝড় উঠেছে।
কখন ও কোথায় ঘটেছে এই ঘটনা?
মঙ্গলবার সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে ঢাকার পল্লবী থানাধীন মিরপুর ১১ নম্বর সেকশনের বি-ব্লকের ৭ নম্বর সড়কের ৩৯ নম্বর বাড়ির তৃতীয় তলায় এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। ওই ভবনেরই পাশের ফ্লাটে ভাড়া থাকতেন অভিযুক্ত সোহেল রানা (৩৪)।
উদ্ধারকারী পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে শিশু রামিসার মরদেহ খাটের নিচে এবং বিচ্ছিন্ন মাথা বাসার শৌচাগারে পান। দৃশ্যটি এতটাই মর্মস্পর্শী ছিল যে ঘটনাস্থলে উপস্থিত সকলে স্তব্ধ হয়ে যান।
কে ছিল শিশু রামিসা?
রামিসা আক্তার পল্লবীর একটি স্থানীয় বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তার বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা একটি রিক্রুটিং এজেন্সিতে কর্মরত এবং মা পারভীন আক্তার গৃহিণী। দুই বোনের মধ্যে রামিসা ছিল ছোট; বড় বোন রাইসা আক্তার নবম শ্রেণিতে পড়ে। পরিবারটি দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর ধরে ওই ফ্লাটে বসবাস করে আসছে।
হাসিখুশি, মায়াবি চেহারার ছোট্ট রামিসা পরিবারের আনন্দের উৎস ছিল। স্কুলে যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে প্রতিটি সকাল শুরু করত সে। কিন্তু সেদিন সকালটি তার জীবনের শেষ সকাল হয়ে গেল।
কীভাবে প্রকাশ পায় হত্যার ঘটনা?
সেদিন সকালে বড় বোন রাইসার প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার সময় রামিসা তাকে এগিয়ে দিতে বের হয়। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেও ফিরে না আসায় পরিবারের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।
শিশুটির মা পারভীন আক্তার ফ্লাটের দরজার বাইরে মেয়ের একটি জুতা পড়ে থাকতে দেখেন। এরপর পাশের ফ্লাটের দরজায় বারবার নক করা হলেও ভেতর থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। সন্দেহ ঘনীভূত হলে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করা হয়। দ্রুত পল্লবী থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে এবং শিশুর নির্মম মরদেহ উদ্ধার করে।
রামিসার চাচা এ কে এম নজরুল ইসলাম জানান, সকাল সাড়ে ১০টায় বড় বোনের সঙ্গে রামিসার স্কুলে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই সংঘটিত হয়ে গেছে এই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড।
কে এই সোহেল রানা?
অভিযুক্ত সোহেল রানার বয়স ৩৪ বছর। পেশায় একজন রিকশা মেকানিক। তিনি মাত্র দুই মাস আগে স্ত্রীকে নিয়ে ওই ভবনের পাশের ফ্লাটে ভাড়া আসেন। প্রতিবেশী হওয়ার সুবাদে রামিসার পরিবারের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল। সেই পরিচয়কে পুঁজি করেই সে এই জঘন্য অপরাধ সংঘটন করেছে বলে ধারণা করছে পুলিশ।
হত্যাকাণ্ডের পর সোহেল রানা বাসার শৌচাগারের গ্রিল ভেঙে পালিয়ে যায়। ওই সময় তার স্ত্রীকে ঘটনাস্থল থেকেই আটক করে পুলিশ।
পুলিশের ভাষ্য ও তদন্ত প্রক্রিয়া
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. মোস্তাক সরকার জানান, শিশুটিকে যৌন নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। ঘটনার পরপরই পুলিশের পাশাপাশি সিআইডি এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। তিনি আরও জানান, হত্যাকাণ্ডের মাত্র ১০ ঘণ্টার মধ্যে সন্ধ্যা ৭টার দিকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পল্লবী থানার তদন্ত পরিদর্শক এমদাদুল হক জানান, ঘটনার কারণ এখনো সম্পূর্ণ নিশ্চিত নয়, তবে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। অভিযুক্তকে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদের পর সংবাদ সম্মেলনে পূর্ণ তথ্য প্রকাশ করা হবে বলেও জানানো হয়।
পরিবারের কান্না ও বিচারের দাবি
এই শোকাবহ পরিস্থিতিতে রামিসার বাবা-মা ভেঙে পড়েছেন। শিশুটির পরিবার অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য দেশবাসী ও বিচার বিভাগের কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছে। পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। প্রতিবেশীরা ক্রোধে ও বেদনায় বিহ্বল।
একটি নিরীহ শিশুর এভাবে প্রাণ হারানোর ঘটনা আবারও সমাজে শিশু সুরক্ষার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। এ ধরনের জঘন্য অপরাধ প্রতিরোধে আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।
আরও পড়ুন: পঞ্চগড়ে ট্রাকচাপায় ৬ বছরের শিশু পাপড়ীর মর্মান্তিক মৃত্যু, ক্ষুব্ধ জনতার আগুনে ভস্মীভূত ট্রাক

