রকেটের অংশ আছড়ে পড়ল চন্দ্রপৃষ্ঠে
ইলন মাস্কের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের একটি নিয়ন্ত্রণহীন রকেটের বড়সড় অংশ গত বুধবার (৫ আগস্ট, ২০২৬) প্রচণ্ড বেগে চাঁদের পৃষ্ঠে আছড়ে পড়েছে। বিশ্বজুড়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের পাশাপাশি মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসাও ঘটনাটির ওপর নজর রেখেছিল।
বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী প্রায় চার টন ভরের এই অংশটি লম্বায় ছিল প্রায় একটি পাঁচতলা দালানের সমান। এটি সেকেন্ডে প্রায় ২.৪৩ কিলোমিটার—অর্থাৎ ঘণ্টায় প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার মাইলের কাছাকাছি বেগে চাঁদে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।
কোথা থেকে এলো এই রকেট-অংশ
সংঘর্ষে জড়িত অংশটি ছিল স্পেসএক্সের ফ্যালকন-৯ রকেটের উপরিভাগ। গত বছর একটি বহুজাতিক চন্দ্রাভিযান কর্মসূচির আওতায় দুটি চন্দ্রযান ও বিভিন্ন গবেষণা যন্ত্রপাতি মহাকাশে পাঠাতে এই রকেট উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল। উৎক্ষেপণের পর পুনর্ব্যবহারযোগ্য অংশটি পৃথিবীতে ফিরে এলেও উপরের স্তরটি কক্ষপথেই রয়ে যায়।
এরপর টানা দেড় বছর ধরে পৃথিবী, চাঁদ ও সূর্যের মহাকর্ষীয় টানাপোড়েনে পরিত্যক্ত অংশটি ধীরে ধীরে তার কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে চাঁদের দিকে অগ্রসর হতে থাকে, শেষ পর্যন্ত যার পরিণতি এই সংঘর্ষ।
পৃথিবীর জন্য কোনো ঝুঁকি নেই, বলছে নাসা
নাসার একজন মুখপাত্র জিমি রাসেল স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, এই ঘটনায় পৃথিবী কিংবা মানবজাতির জন্য কোনোরকম বিপদের আশঙ্কা নেই।
একই সুরে কথা বলেছেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানী ড. ম্যাট বোথওয়েল। বিবিসিকে তিনি জানান, এটি চাঁদের পৃষ্ঠে ঘটে যাওয়া একটি বড় ধরনের সংঘর্ষ হলেও পৃথিবীর জন্য কোনো হুমকি তৈরি করে না। বরং এই ঘটনা বিজ্ঞানীদের জন্য নতুন গবেষণার দুয়ার খুলে দিয়েছে।
খালি চোখে অদৃশ্য, তবু ধরা পড়েছে টেলিস্কোপে
পৃথিবী থেকে খালি চোখে এই সংঘর্ষ দেখা সম্ভব হয়নি। তবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের শক্তিশালী টেলিস্কোপের মাধ্যমে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আঘাতের ফলে সৃষ্ট ধুলিঝড় ও আলোর ঝলকানি রেকর্ড করেছেন। সংঘর্ষস্থলটি চাঁদের আইনস্টাইন ক্রেটারের কাছাকাছি, যেখানে নতুন একটি গর্তের সৃষ্টি হয়েছে বলে জানা গেছে।
নাসার লুনার রিকনসেন্স অরবিটার এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মহাকাশযান দানুরি এই স্থানের আঘাত-পূর্ব ও আঘাত-পরবর্তী ছবি সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করবে। শিগগিরই এসব ছবি প্রকাশ্যে আনা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
চন্দ্র-গবেষণায় নতুন সম্ভাবনা
লন্ডনের সায়েন্স মিউজিয়ামের মহাকাশ বিভাগের প্রধান লিবি জ্যাকসনের ভাষ্যমতে, স্বাভাবিক উল্কাপাতের ক্ষেত্রে বস্তুর ভর বা গতিবেগ আগে থেকে জানা সম্ভব হয় না। কিন্তু এবারের ঘটনায় রকেট-অংশটির ভর ও গতি আগে থেকেই নির্দিষ্টভাবে জানা ছিল। এই বাড়তি তথ্য চাঁদের অভ্যন্তরীণ গঠন ও মাটির উপাদান সম্পর্কে গবেষণায় বাড়তি সহায়ক হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
মহাকাশ বর্জ্য নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
এই ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে চাঁদে জমে থাকা মানুষের তৈরি বস্তুর সংখ্যা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিজ্ঞানীদের হিসাবে, বর্তমানে চাঁদের পৃষ্ঠে প্রায় তিন হাজার মানবসৃষ্ট বস্তু জমা হয়ে আছে, যার সম্মিলিত ওজন আনুমানিক ১৯০ টন।
১৯৫৯ সালে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের লুনা-২ মহাকাশযান প্রথমবারের মতো চাঁদে আঘাত হানার পর থেকে বিভিন্ন অভিযানের মাধ্যমে ধীরে ধীরে এই যন্ত্রাংশ জমতে শুরু করে।
ভবিষ্যতে ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা
আগামী দিনে চন্দ্রাভিযান ও কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণের সংখ্যা আরও বাড়বে বলে ধারণা করছেন বিজ্ঞানীরা। এর ফলে কক্ষপথে জমতে থাকা মহাকাশ বর্জ্যের পরিমাণও বাড়বে, যা ভবিষ্যতের চন্দ্রাভিযান ও উপগ্রহ মিশনগুলোর জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

