পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে ফেসবুকের পরিচিতি যেমন সুবিদিত, ঠিক তেমনিভাবে আইনি লড়াইয়ের দিক থেকেও এই প্ল্যাটফর্মটি সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মামলার সম্মুখীন প্রতিষ্ঠান। এত বিপুল পরিমাণ মামলা পৃথিবীর আর কোনো করপোরেট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে হয়েছে কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ফেসবুকের বিরুদ্ধে এমন একটি মামলা দায়ের হয়েছে, যা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়ে কোম্পানিটির টিকে থাকার প্রশ্নই সামনে নিয়ে এসেছে।
গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের চারজন অ্যাটর্নি জেনারেল ফেসবুকের মূল কোম্পানি মেটা প্ল্যাটফর্মসের বিরুদ্ধে ওকল্যান্ডের একটি ফেডারেল আদালতে মামলা করেছেন, যেখানে ক্ষতিপূরণ চাওয়া হয়েছে প্রায় ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার। লক্ষণীয় বিষয় হলো, মেটার সামগ্রিক বাজারমূল্যই বর্তমানে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ দাবিকৃত ক্ষতিপূরণের অঙ্ক কোম্পানির প্রায় পুরো বাজারমূল্যের কাছাকাছি। জানা গেছে, এই মামলার শুনানি শুরু হবে আগামী আগস্ট মাসে।
যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে মামলার পাহাড়
শুধু এই একটি মামলাই নয়—যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের আদালতে ফেসবুকের বিরুদ্ধে হাজারো মামলা বিচারাধীন। ব্যক্তি নাগরিক থেকে শুরু করে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যন্ত অসংখ্য পক্ষ এসব মামলার বাদী। প্রায় প্রতিটি মামলাতেই সাধারণ একটি অভিযোগ বারবার উঠে আসছে—কোম্পানিটি সমাজের নিরাপত্তার চেয়ে মুনাফাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। বিশেষভাবে বলা হচ্ছে, কিশোর-কিশোরীরা ফেসবুক ব্যবহারে অতিরিক্ত আসক্ত হয়ে পড়ে মানসিক স্বাস্থ্যগত সমস্যায় ভুগছে।
ফেসবুক, ইউটিউবসহ অন্যান্য সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্মের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় যে অভিযোগটি বারবার উঠে আসছে তা হলো—এসব প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদম এমনভাবে নকশা করা যে ব্যবহারকারীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রলিংয়ে ডুবে থাকতে বাধ্য হন।
ক্যালিফোর্নিয়া ও নিউ মেক্সিকোর রায়ে বড় ধাক্কা
গত মার্চ মাসে ক্যালিফোর্নিয়া ও নিউ মেক্সিকোর আদালতে করা প্রায় একই ধরনের দুটি মামলায় মেটা পরাজিত হয়েছে এবং আদালত কোম্পানিটির বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের জরিমানা ঘোষণা করেছেন। মেটা নিজেই স্বীকার করেছে, শুধু নিউ মেক্সিকোর মামলার রায়ের কারণেই তাদের আর্থিক ক্ষতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩.৭ বিলিয়ন ডলার। তবে কোম্পানিটি জানিয়েছে, এসব রায়ের বিরুদ্ধে তারা উচ্চ আদালতে আপিল করবে। এদিকে লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি মামলায় বিচার শুরুর আগেই মেটা বাদীপক্ষের সঙ্গে বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দিয়ে আদালতের বাইরে মীমাংসা করে ফেলেছে।
প্রায় ৪০টি অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল অসংখ্য ব্যক্তি ও স্কুল বোর্ডের পক্ষ থেকে মেটার বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা করেছেন। এসব মামলার প্রতিটি রায় যদি মেটার বিপক্ষে যায় এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে জরিমানা বা ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করতে হয়, তাহলে সামগ্রিক ক্ষতির পরিমাণ কল্পনাতীত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও একই চিত্র
ফেসবুকের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নও একই ধরনের অভিযোগ প্রমাণের লক্ষ্যে মেটার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে। অভিযোগ উঠেছে, ব্যবহারকারীদের আসক্ত করে রাখার যেসব কৌশল প্ল্যাটফর্মে বাস্তবায়িত আছে, তা বন্ধে মেটা যথাযথ পদক্ষেপ নেয়নি। ইউরোপিয়ান কমিশনের একটি সংসদীয় প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মেটা কমিশনের প্রণীত ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট লঙ্ঘন করেছে।
এখানেও ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের বিরুদ্ধে অভিযোগ একই ধরনের—ব্যবহারকারীদের প্ল্যাটফর্মে দীর্ঘ সময় আটকে রাখার জন্য বিশেষ কৌশল প্রয়োগ করা হচ্ছে, যা শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যদি ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে মেটাকে তাদের বার্ষিক মোট আয়ের সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানা গুনতে হতে পারে।
অস্বীকারের পরও থামছে না মামলার স্রোত
ফেসবুক শুরু থেকেই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। কিন্তু একের পর এক মামলা তাদের পিছু ছাড়ছে না। কিছু মামলায় তারা হেরেছে, আবার কিছু মামলা আদালতের বাইরে মিটিয়ে ফেলেছে। যেসব রায় তাদের বিপক্ষে গেছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে কোম্পানিটি। এমনকি নাবালকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার আশ্বাসও দিচ্ছে মেটা।
কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ব্যবহারকারীদের আসক্তি কমার কোনো লক্ষণ নেই। একটি পোস্ট দেখামাত্র সামনে চলে আসে হাজারো নতুন পোস্ট, যা এড়িয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবণতা এক ধরনের আসক্তি, যা কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাদকাসক্তির চেয়েও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। যাঁরা নিয়মিত ফেসবুক ব্যবহার করেন, তাঁরা নিজেরাই এই বিষয়টি হাড়ে হাড়ে টের পান।
১.৪ ট্রিলিয়ন ডলারের মামলা কেন আলাদা
অতীতের সব মামলার তুলনায় সাম্প্রতিক এই ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণ দাবির মামলাটি ভিন্ন মাত্রার এবং নজিরবিহীন। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই মামলা করেছেন রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চারজন অ্যাটর্নি জেনারেল—কোনো সাধারণ ব্যক্তি বাদী নন। ব্যক্তির করা মামলা এবং রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠানের করা মামলার মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে।
ব্যক্তির মামলায় সাধারণত আর্থিক জরিমানার বাইরে তেমন কিছু থাকে না, এবং এ ধরনের মামলা আদালতের বাইরে সহজেই মীমাংসা করে ফেলা যায়—যা যুক্তরাষ্ট্রের আইনে স্বীকৃত ও জনপ্রিয় একটি পদ্ধতি। কিন্তু রাষ্ট্র বা স্কুল বোর্ডের করা মামলায় শুধু বড় অঙ্কের জরিমানাই নয়, বরং কঠোর নিয়ন্ত্রণমূলক শর্তও আরোপ হয়, যা মেনে চলতে গিয়ে প্রতিষ্ঠান কার্যত অস্তিত্ব সংকটে পড়তে পারে।
আদালত কি সত্যিই এত বড় জরিমানা করতে পারে?
মেটা যদি এই মামলায় হেরে যায় এবং আদালত বাদীপক্ষের দাবি অনুযায়ী ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দেন, তাহলে কোম্পানির পুরো বাজারমূল্যই নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে। এত বিশাল অঙ্কের রায় আদালত সত্যিই দিতে পারেন কি না—এই প্রশ্ন অনেকের মনেই জাগতে পারে। উত্তর হলো, হ্যাঁ, পারেন। যুক্তরাষ্ট্রের আদালত, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং বিচার বিভাগের এটিই বিশেষত্ব—অপরাধ প্রমাণিত হলে এবং তার মাত্রা গুরুতর হলে শাস্তির পরিমাণও ভয়াবহ হতে পারে।
কিশোর-কিশোরীদের ফেসবুক ব্যবহারে অতিরিক্ত আসক্ত করে তুলে তাদের মানসিক ক্ষতির কারণ হওয়ার অভিযোগ এমনিতেই অত্যন্ত গুরুতর। এ ধরনের অভিযোগ চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হলে আদালতের রায় যে কোনো পর্যায়ে যেতে পারে—এমনকি তাতে কোম্পানির অস্তিত্বই যদি বিলীন হয়ে যায়, আইনি দিক থেকে তাতেও বাধা নেই।
ডয়চে ব্যাংকের নজির মনে করিয়ে দিচ্ছে ইতিহাস
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ এর আগেও এমন বিশাল অঙ্কের জরিমানা আরোপ করেছে, যার প্রভাবে বিশ্বের অন্যতম বড় ব্যাংক, জার্মানির ডয়চে ব্যাংক প্রায় ডুবতে বসেছিল। নানা অনিয়মের অভিযোগে সেই ব্যাংকের বিরুদ্ধে প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার জরিমানা করা হয়েছিল, যা ব্যাংকটির তৎকালীন বাজারমূল্যের চেয়েও বেশি ছিল। পরবর্তীতে আলোচনার মাধ্যমে জরিমানার অঙ্ক কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল।
মেটার ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিস্থিতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। যদি একের পর এক মামলার রায় কোম্পানিটির বিপক্ষে যেতে থাকে এবং সর্বশেষ এই ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলারের মামলাতেও তারা পরাজিত হয়, তাহলে শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়—যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কমিউনিকেশনস ডিসেন্সি অ্যাক্টের অধীনে সামাজিক মাধ্যম কোম্পানিগুলো যে বিশেষ আইনি সুরক্ষা ভোগ করে, সেটিও মেটা হারাতে পারে। এই আইন অনুযায়ী, তৃতীয় পক্ষের পোস্ট করা কনটেন্টের দায় সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মের ওপর বর্তায় না। এই সুরক্ষা হাতছাড়া হলে মেটার আইনি ঝুঁকি আরও বহুগুণ বেড়ে যাবে।
এআই বিনিয়োগ পরিকল্পনার ওপরও ঝুঁকি
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এমন এক সময়ে মেটার বিরুদ্ধে এই বিশাল অঙ্কের মামলা দায়ের হয়েছে, যখন কোম্পানিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে ব্যাপক বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর মেটা এআই খাতে প্রায় ১৪৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে। মামলার গতিপ্রকৃতি যদি কোম্পানিটির প্রতিকূলে যেতে থাকে, তাহলে এই উচ্চাভিলাষী বিনিয়োগ পরিকল্পনাও মুখ থুবড়ে পড়তে পারে।
সবমিলিয়ে, একের পর এক মামলার জালে জড়িয়ে পড়া এবং সর্বোপরি ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলারের নজিরবিহীন ক্ষতিপূরণ দাবির খড়্গ মাথার ওপর ঝুলে থাকায়, চূড়ান্ত রায় আসার আগেই মেটা গুরুতর অস্তিত্ব সংকটে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মামলার অগ্রগতি প্রতিকূল দিকে মোড় নিলে শেয়ারহোল্ডাররা আতঙ্কিত হয়ে শেয়ার বিক্রির হিড়িক ফেলে দিতে পারেন, যার ফলে শেয়ারদরে ব্যাপক ধস নামার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একদিকে বাজারমূল্যের প্রায় সমপরিমাণ ক্ষতিপূরণের ঝুঁকি, অন্যদিকে শেয়ারদরে সম্ভাব্য ধস—এই দ্বিমুখী চাপ ফেসবুকের ভবিষ্যৎ অস্তিত্বকেই এখন প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ থেকে মেটার আয় বছরে ৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে — দেশের অর্থনীতিতে অবদান কোথায়?

