কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে ইরান ও ওমানের মধ্যে একটি সমঝোতা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ নিয়ে কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা বেশ এগিয়েছে বলে জানা গেছে। তবে সমস্যা হলো, এই সমঝোতার ফলে প্রণালিতে ইরানের একচ্ছত্র প্রভাব প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হচ্ছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্যের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। এ কারণে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্রুত একটি চুক্তি সইয়ের পক্ষে থাকলেও, তা বাস্তবে রূপ নেবে কিনা তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
যুদ্ধকালীন সুবিধা ধরে রাখতে চায় তেহরান
সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সংঘাতকালে অর্জিত কৌশলগত সুবিধাগুলো দীর্ঘমেয়াদে নিজেদের হাতে রাখাই ইরানের প্রধান উদ্দেশ্য। তেহরান ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে, সংকট শুরুর আগে হরমুজ প্রণালির যে আইনি কাঠামো বলবৎ ছিল, সেই পুরনো অবস্থানে তারা আর ফিরতে রাজি নয়।
দ্বিমুখী করিডোরের প্রস্তাব
প্রস্তাবিত চুক্তির কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের জন্য একটি দ্বিমুখী করিডোর তৈরির পরিকল্পনা। বর্তমান ব্যবস্থায় প্রণালির দক্ষিণ দিকের রুট ওমানের জলসীমার মধ্যে এবং উত্তর দিকের রুট ইরানের জলসীমার মধ্যে পড়ে। নতুন প্রস্তাবে দুই দেশের পৃথক রুটের বদলে একটি যৌথ মধ্যবর্তী করিডোর গঠনের কথা বলা হচ্ছে, যাতে উভয় পক্ষের স্বার্থ সংরক্ষিত থাকে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানানো হয়েছে, খসড়া চুক্তিতে পারস্য উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজগুলোর ওপর তেহরানকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণের অধিকার দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। ইরানের মধ্যস্থতাকারী প্রতিনিধিদলের সদস্য সাঈদ আজোরলুর বরাত দিয়ে জানা গেছে, এক থেকে তিন মাস মেয়াদি এই সাময়িক ব্যবস্থার আওতায় মাইন অপসারণ, সামুদ্রিক পরিষেবা এবং নিরাপত্তা কার্যক্রমের বড় অংশ পরিচালনা করবে তেহরান নিজেই।
টোল ফি নিয়ে দ্বিমুখী টানাপোড়েন
হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজের পণ্যমূল্যের ওপর নির্দিষ্ট হারে ফি বসানোর দাবি তুলেছে ইরান। তেহরানের প্রস্তাব ছিল ৫ থেকে ৭ শতাংশ, কিন্তু ওমান চাইছে এই হার নামিয়ে ৩ শতাংশে আনতে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো ধরনের বাধ্যতামূলক টোলের ঘোর বিরোধী; শুধু স্বেচ্ছাসেবী সামুদ্রিক সেবার বিনিময়ে সার্ভিস চার্জ দেওয়ার একটি বিকল্প প্রস্তাব নিয়ে এখন দরকষাকষি চলছে।
প্রস্তাবিত চুক্তিতে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানকে কোনো না কোনোভাবে নিয়ন্ত্রণ দেওয়ার বিষয়ে ইতিমধ্যেই ছাড় দেওয়া হয়েছে বলে ইঙ্গিত মিলেছে, যদিও সেই নিয়ন্ত্রণ ঠিক কতটা ব্যাপক হবে তার বিস্তারিত এখনও নির্ধারিত হয়নি। উপসাগরীয় আলোচকদের ভাষ্য, জাহাজ তদারকির দায়িত্ব থাকবে আঞ্চলিক দেশগুলোর হাতে এবং যেকোনো ফি হতে হবে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাসেবামূলক। যুক্তরাষ্ট্র এ ব্যাপারেও স্পষ্টতা চাইছে যে, হরমুজ দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের অনুমতি মিললেও ইরানি বন্দরের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং তেল রপ্তানির ছাড়পত্র পুনর্বহাল হবে কিনা।
এদিকে ট্রাম্প নিজে বলেছেন, তিনি এখনও কূটনৈতিক পথেই সমাধান চান। তাঁর ভাষায়, তিনি মানুষ হত্যা এড়াতে চুক্তি করতে আগ্রহী এবং দুয়েক দিনের মধ্যেই সমঝোতা চূড়ান্ত হতে পারে বলে তিনি আশাবাদী।
পাল্টা হামলার হুঁশিয়ারি ইরানের
উপসাগরীয় দেশগুলোকে কড়া বার্তা দিয়েছে ইরান— তাদের ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে গোটা অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনায় পাল্টা আঘাত হানা হবে। একটি উপসাগরীয় রাষ্ট্রের সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, তেহরানের বার্তা পরিষ্কার— যুক্তরাষ্ট্র ইরানি অবকাঠামোয় হামলা চালালে তার কড়া জবাব দেবে তারা।
অস্ত্র সংকট নিয়ে হেগসেথের ওপর ক্ষুব্ধ ট্রাম্প
মার্কিন অস্ত্র ও গোলাবারুদ ভাণ্ডারে চরম ঘাটতি দেখা দেওয়ায় প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প। গত সপ্তাহে ক্যাম্প ডেভিডে বৈঠকে ট্রাম্প জানতে চেয়েছেন, অস্ত্রভাণ্ডারের এমন দুরবস্থার কথা কেন তাঁকে আগে জানানো হয়নি। ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দূরপাল্লার গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার তীব্র ঘাটতির কারণেই মূলত ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক অভিযানে যেতে পারছে না ওয়াশিংটন।

