বাংলাদেশে সংক্রামক রোগ হামের বিস্তার এখন এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। প্রতিটি দিন যাচ্ছে নতুন শিশুমৃত্যুর খবর নিয়ে। হাসপাতালের বেড থেকে বারান্দা, ফ্লোর থেকে সিঁড়ি — সর্বত্র অসুস্থ শিশুদের আহাজারি। পরিস্থিতি এতটাই সংকটজনক হয়ে পড়েছে যে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এটিকে সরাসরি ‘মহামারি’ বলে অভিহিত করছেন এবং সরকারের কাছে জরুরি অবস্থা ঘোষণার দাবি জানাচ্ছেন।
২৪ ঘণ্টায় ১১ শিশুর মৃত্যু, মোট প্রাণহানি ছাড়াল ৩৯৮
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় (সোমবার সকাল ৮টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ১১টি শিশু মৃত্যুবরণ করেছে। এর মধ্যে দুটি শিশুর ক্ষেত্রে হামের সংক্রমণ পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হয়েছিল।
গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গজনিত কারণে মোট ৩৯৮ জন শিশু মারা গেছে। এর মধ্যে স্বাস্থ্য বিভাগ আনুষ্ঠানিকভাবে ৭৭ জনের মৃত্যু হামের কারণে নিশ্চিত করেছে। একই সময়ে সন্দেহজনক হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ২৬৪ জন, যাদের মধ্যে ১ হাজার ১১৫ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় নতুনভাবে আরও ৭৩ জনের শরীরে হামের জীবাণু শনাক্ত হয়েছে। বিভাগওয়ারি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ঢাকা বিভাগ — মাত্র একদিনেই এখানে ৫৪৪ জন সন্দেহজনক রোগী চিহ্নিত হয়েছে। এরপরে রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ (২৩০ জন) এবং বরিশাল বিভাগ (১৪৭ জন)। নিশ্চিত হামের ক্ষেত্রেও ঢাকাতেই সর্বোচ্চ ৫৪ জন রোগী পাওয়া গেছে।
হাসপাতালে মানবিক বিপর্যয়: ফ্লোরেও ঠাঁই নেই
রাজধানীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড হাসপাতাল এবং সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে পাওয়া চিত্র একটাই — হাহাকার আর অসহায়ত্ব। মাত্র দুই মাস বয়সী নবজাতকও হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছে। শয্যাসংকট এতটাই প্রকট যে বাধ্য হয়ে শিশুদের ফ্লোরে, বারান্দায়, এমনকি টয়লেটের সামনেও বিছানা পেতে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।
চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, তাঁদের দীর্ঘ কর্মজীবনেও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি তাঁরা হননি। একজন আক্রান্ত শিশু থেকে পাশের শিশুর শরীরে দ্রুতগতিতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে। ওয়ার্ডজুড়ে স্বজনদের কান্না ও আহাজারিতে পরিবেশ ভারী হয়ে উঠছে।
কেন এত ভয়াবহ হলো পরিস্থিতি?
বিশেষজ্ঞরা বেশ কয়েকটি কারণকে এই মহামারির জন্য দায়ী করছেন:
১. টিকাদান কর্মসূচির বিরাট ঘাটতি দীর্ঘদিন ধরে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বা ইপিআই থেকে বহু শিশু বাদ পড়ে গেছে। ফলে তাদের শরীরে হামের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠেনি।
২. অপুষ্টি ও দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকটে অনেক পরিবার পুষ্টিকর খাবার থেকে বঞ্চিত। এতে মা ও শিশু উভয়ের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেছে। বিশেষত ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে মায়ের শরীরে অ্যান্টিবডির ঘাটতিও বড় ভূমিকা রাখছে।
৩. ঘনবসতি ও দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় একজনের সংক্রমণ অতিদ্রুত বহুজনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। পাশাপাশি ইউনিয়ন ও গ্রামপর্যায়ে কার্যকর স্বাস্থ্যসেবার অনুপস্থিতি মানুষকে বাধ্য করছে ঢাকামুখী হতে, যা হাসপাতালের ওপর অসহনীয় চাপ তৈরি করছে।
৪. জটিলতার সংযোগ হামের পাশাপাশি নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও এনসেফালাইটিসের মতো গুরুতর জটিলতা একসঙ্গে দেখা দিলে মৃত্যুঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মোশতাক হোসেন বলেছেন, “আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা মাথা ভারী হয়ে গেছে। সবাই শুধু বড় বিশেষায়িত হাসপাতাল গড়তে চান। কিন্তু ইউনিয়ন ও গ্রামপর্যায়ে কার্যকর সেবা নেই। এতে সামান্য অসুস্থতায়ও মানুষকে ঢাকায় ছুটতে হয়।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন: এখনই ‘জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা জরুরি
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ লেলিন চৌধুরী স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, “নিঃসন্দেহে হাম এখন মহামারি আকার ধারণ করেছে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারের পক্ষ থেকে ‘জরুরি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি’ ঘোষণা এখন অপরিহার্য।” তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) সহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস প্ল্যাটফর্ম ফর পিপলস হেলথ (ডিপিপিএইচ) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে হামকে ‘মহামারি’ ঘোষণা করার দাবি জানিয়েছে। তাঁদের বক্তব্য ছিল — কোনো রোগ যখন সময়, স্থান ও আক্রান্তের সংখ্যার বিচারে অস্বাভাবিক গতিতে বাড়তে থাকে এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থা তা নিয়ন্ত্রণে অক্ষম হয়ে পড়ে, তখনই তা জনস্বাস্থ্য জরুরি পরিস্থিতি। বর্তমান হামের প্রকোপ ঠিক সেই পর্যায়েই পৌঁছেছে।
সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টও জরুরি অবস্থা ঘোষণার দাবির পাশাপাশি সব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে আক্রান্ত শিশুদের বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ফ্রি আইসিইউ সেবা নিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জরুরি পদক্ষেপ: সব ছুটি বাতিল
পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ রুমী স্বাক্ষরিত এক জরুরি অফিস আদেশে অধিদপ্তর ও এর অধীন সব স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সব ধরনের ছুটি — অর্জিত ছুটি ও নৈমিত্তিক ছুটি উভয়ই — অবিলম্বে বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে।
আদেশে জানানো হয়েছে, আপৎকালীন অবস্থায় নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এবং হাম প্রতিরোধে টিকাদান কার্যক্রম আরও জোরদার করার লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, কোরবানির ঈদের পর সারা দেশে হামের টিকার দ্বিতীয় ধাপের গণটিকা ক্যাম্পেইন শুরু হবে। তিনি স্বীকার করেছেন, বর্তমানে সিরিঞ্জের কিছুটা সংকট রয়েছে, তবে কয়েক দিনের মধ্যেই তা সমাধান হবে বলে আশা করছেন।
রাজনৈতিক বিতর্ক: দায় কার?
হামের এই ভয়াবহ পরিস্থিতি রাজনৈতিক অঙ্গনেও তুমুল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিভিন্ন মহলের অভিযোগ, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে হামসহ ১১টি টিকা কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছিল। প্রয়োজনীয় ‘ওটি’ কার্যক্রমও চালু ছিল না, ফলে দেশজুড়ে টিকাদান কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হয়। এই ব্যর্থতার দায়ে ড. ইউনূস ও তাঁর স্বাস্থ্য উপদেষ্টার বিচারের দাবিতে রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
অন্যদিকে বর্তমান বিএনপি সরকারও দায়মুক্তির চেষ্টায় পূর্বের সরকারকে দায়ী করছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী দাবি করেছেন, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় হামের টিকার কোনো মজুত ছিল না। তবে এই বক্তব্যও সামাজিক মাধ্যম ও টকশোতে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে।
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেছেন, সরকার হাম নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে এবং নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে আগের সরকারকে দায়ী করছে। তিনি দ্রুত জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে নির্দিষ্ট কিছু হাসপাতালকে শুধু হামের চিকিৎসার জন্য বরাদ্দ করার দাবি জানিয়েছেন।
করণীয়: বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সময়মতো টিকা নিশ্চিত করা এবং দ্রুত ও সঠিক চিকিৎসা দেওয়া গেলে হামে মৃত্যুর একটি বড় অংশ এড়ানো সম্ভব। তাঁদের পরামর্শ হলো:
- অবিলম্বে ‘জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করা
- WHO ও আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া
- গণটিকাদান কর্মসূচি দ্রুত ও ব্যাপকভাবে পরিচালনা করা
- মা ও শিশুর পুষ্টিমান উন্নয়নে কার্যকর কর্মসূচি গ্রহণ করা
- ইউনিয়ন ও গ্রামপর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা
- সব সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে আক্রান্ত শিশুদের বিনামূল্যে চিকিৎসা নিশ্চিত করা
হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া গেলে এই মৃত্যুর মিছিল থামানো সম্ভব। প্রশ্ন হলো — সেই পদক্ষেপ নেওয়া হবে কখন?
আরও পড়ুন: পুরুষের যৌন ক্ষমতা বাড়ানোর কার্যকর উপায় — বিজ্ঞানসম্মত টিপস ও পরামর্শ

