পাইকারি বিদ্যুতের দাম ইউনিটপ্রতি দেড় টাকা বা সর্বোচ্চ ২১ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। বুধবার (২০ মে) সকালে রাজধানীর কেআইবি মিলনায়তনে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আয়োজিত গণশুনানিতে এ প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। তবে শুনানিতে উপস্থিত রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, ভোক্তা অধিকার সংস্থা ক্যাবসহ বিভিন্ন অংশীজন এই মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেন।
পিডিবির প্রস্তাব: কী বলছে সংস্থাটি?
গণশুনানিতে পিডিবির প্রধান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম সংস্থার আর্থিক সংকটের বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পিডিবির সম্ভাব্য আর্থিক ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৬২ হাজার কোটি টাকায়। আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সেই ঘাটতি আরও বেড়ে ৬৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রধান প্রকৌশলী সতর্ক করে বলেন, পাইকারি বিদ্যুতের দাম সমন্বয় না করা হলে বিদ্যুৎ খাত মারাত্মক অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে পড়বে। উৎপাদন ও সঞ্চালন ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাওনা পরিশোধ করতে দাম বৃদ্ধি অপরিহার্য বলে দাবি করেন তিনি।
পিডিবির তথ্যমতে, জ্বালানি তেল ও গ্যাসের আন্তর্জাতিক মূল্যবৃদ্ধি, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের ক্যাপাসিটি চার্জ মেটাতে গিয়ে সংস্থাটির ঘাটতি ক্রমাগত বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে ভর্তুকির বোঝা কমাতে দাম পুনর্নির্ধারণ করা ছাড়া বিকল্প নেই বলে মনে করছে পিডিবি।
অংশীজনদের তীব্র প্রতিক্রিয়া: লুটপাটের দায় কেন গ্রাহকের?
গণশুনানিতে পিডিবির প্রস্তাবের বিরুদ্ধে সরব হয়ে ওঠেন অংশীজনরা। ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব), ব্যবসায়ী নেতা এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিরা একযোগে এই মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবকে অগ্রহণযোগ্য বলে আখ্যা দেন।
অংশীজনরা অভিযোগ করেন, বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘ বছর ধরে চলে আসা অপচয়, দুর্নীতি ও লুটপাটের ক্ষতি এখন সাধারণ গ্রাহকের কাঁধে চাপানো হচ্ছে। যেসব বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও কোটি কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়েছে, সেই দায় গ্রাহক বহন করবেন কেন — এই প্রশ্ন তোলেন অনেকে।
ক্যাবের প্রতিনিধিরা জানান, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পরিবর্তে বরং অপচয় রোধ করে, অদক্ষ বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে এবং অতিরিক্ত ক্যাপাসিটি চার্জ পুনর্মূল্যায়ন করে খরচ কমানোই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। তারা উল্টো দাম কমানোর দাবিতে আলাদা গণশুনানির আয়োজন করার কথাও তোলেন।
বহুমুখী প্রভাব: সাধারণ মানুষ থেকে উদ্যোক্তা — সবাই শঙ্কিত
শুনানিতে অংশগ্রহণকারীরা বলেন, দেশে এমনিতেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অস্বাভাবিক উচ্চতায় রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের দাম বাড়লে তার প্রভাব শুধু বিদ্যুৎ বিলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না — বরং উৎপাদন খরচ বাড়বে, পরিবহন ও সেবা খাতে ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং সার্বিক মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা (এসএমই) বিশেষ উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তারা বলেন, ইতোমধ্যেই বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিদ্যুতের দাম আরও বাড়লে উৎপাদন খরচ এতটাই বেড়ে যাবে যে অনেক ছোট কারখানা টিকিয়ে রাখা দুষ্কর হয়ে পড়বে। কৃষি খাতেও সেচ পাম্প চালানোর ব্যয় বৃদ্ধি পেলে কৃষকদের উপর বাড়তি চাপ পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আগামীকাল গ্রাহক পর্যায়ের শুনানি
পাইকারি পর্যায়ের পর আগামীকাল বৃহস্পতিবার (২১ মে) গ্রাহক বা খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর আবেদনের ওপর আলাদা গণশুনানি পরিচালনা করবে বিইআরসি। এই শুনানিতে বিতরণ কোম্পানিগুলো তাদের দাম বৃদ্ধির যৌক্তিকতা উপস্থাপন করবে। সেখানেও ভোক্তা সংগঠন ও সাধারণ নাগরিকদের তীব্র প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
বিইআরসি সাধারণত গণশুনানির পর সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত বিবেচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। তবে অতীতের ধারা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবে সাধারণত কিছুটা সংশোধন করে হলেও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মত: কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া সমাধান নেই
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু দাম বাড়িয়ে বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘমেয়াদি সংকট সমাধান করা যাবে না। বিদ্যুৎ খাতে প্রকৃত সংস্কার আনতে হলে অতিরিক্ত ও অলাভজনক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সাথে করা অসম চুক্তি পুনর্বিবেচনা করতে হবে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে এবং সিস্টেম লস কমিয়ে আনতে হবে। না হলে প্রতি বছর দাম বাড়ানোর চক্রের মধ্যেই আটকে থাকবে দেশের বিদ্যুৎ খাত।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশে হামের ভয়াবহ প্রকোপ: শিশুমৃত্যুর মিছিল থামছে না, বিশেষজ্ঞরা বলছেন ‘মহামারি’

