বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ও ধনী ব্যক্তি, মাইক্রোসফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস এবার নিজের ব্যক্তিগত জীবনের গোপন অধ্যায় নিয়ে মুখ খুলেছেন একেবারে মার্কিন কংগ্রেসের সামনে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের ওভারসাইট কমিটিতে রুদ্ধদ্বার সাক্ষ্য দেওয়ার সময় তিনি স্বীকার করেছেন, তিনি তিনজন নারীর সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন। বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিনের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠতার প্রসঙ্গ ধরে।
ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে
গত ১০ জুন এপস্টিনের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়েন বিল গেটস। কমিটির সদস্যরা একের পর এক প্রশ্নে তাকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করেন। এর প্রায় দুই সপ্তাহ পর, মঙ্গলবার সেই সাক্ষ্যের সম্পূর্ণ অনুলিপি জনসমক্ষে প্রকাশ করে কমিটি। আর তার পরদিন বুধবার যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী গণমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ এই চমকপ্রদ তথ্য সবার সামনে তুলে আনে।
দুই রুশ নারী থেকে শুরু, শেষে তৃতীয় সম্পর্কের কথাও স্বীকার
সাক্ষ্যের একদম শুরুতেই গেটস দুজন রুশ নারীর নাম উল্লেখ করে তাদের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের কথা মেনে নেন। একজন হলেন ব্রিজ খেলোয়াড় মিলা আন্তোনোভা, আর অন্যজন পারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞানী কারিমা নিগমাতুলিনা। তবে কংগ্রেস সদস্যদের একের পর এক চাপের মুখে পরে তিনি আরও একজন নারী বিজ্ঞানীর সঙ্গে তার তৃতীয় গোপন সম্পর্কের কথাও স্বীকার করতে বাধ্য হন।
মজার বিষয় হলো, এই তথ্যগুলো একেবারে নতুন নয়। এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের কর্মীদের সামনেও তিনি দুটি বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের কথা স্বীকার করেছিলেন। সমস্যা হলো, এপস্টিন পরবর্তীতে এসব সম্পর্কের কথা জেনে যান, যা গেটসের জন্য নতুন এক বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এপস্টিনের ব্ল্যাকমেইল প্রচেষ্টা নিয়ে যা বললেন গেটস
সাক্ষ্যে গেটস জানিয়েছেন, দুই রুশ নারীর সঙ্গে তার সম্পর্কের তথ্য হাতে পাওয়ার পর এপস্টিন তাকে চাপে রাখার চেষ্টা করেছিলেন। গেটসের ভাষায়, এপস্টিন তার ব্যক্তিগত জীবনের স্পর্শকাতর তথ্য এবং তার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া আরও নানা মিথ্যা কথা ব্যবহার করে তাকে পুনরায় সম্পর্কে জড়াতে চাপ দিচ্ছিলেন। তবে গেটস স্পষ্ট করে বলেন, এপস্টিন কখনোই সরাসরি তাকে ব্ল্যাকমেইল করেননি, কিন্তু পরবর্তীতে প্রকাশিত ইমেইলগুলো দেখে তার ধারণা হয়েছে যে এমন চিন্তা এপস্টিনের মাথায় ঘুরছিল।
এপস্টিনের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক প্রসঙ্গে গেটস বরাবরের মতোই দাবি করেছেন, তিনি কখনো এপস্টিনকে কোনো নারীর প্রতি যৌন নিপীড়ন করতে দেখেননি। তবে তিনি স্বীকার করেছেন যে এপস্টিনের পরিবেশে থাকার সময় অজান্তেই তিনি কোনো ভুক্তভোগীর কাছাকাছি চলে যেতে পারেন। নিজের এই সম্পূর্ণ অধ্যায়কে তিনি একটি বড় ভুল বলেও স্বীকার করেছেন।
২০১১ সালের আগের আরেক সম্পর্কের চমকপ্রদ তথ্য
সাক্ষ্যে আরও একটি চমকপ্রদ তথ্য সামনে আসে। গেটস জানান, ২০১১ সালে এপস্টিনের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার আগেই তার চিকিৎসা উদ্যোক্তা অ্যালিস জ্যাকবস নেসেলরোদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। এই তথ্য শুনে নিজেই বিস্মিত হন গেটস, কারণ তিনি ভেবেছিলেন এপস্টিন কেবল দুই রুশ নারীর সম্পর্কের ব্যাপারেই জানতেন। কিন্তু কংগ্রেস সদস্যরা তাকে ২০১৩ সালের জুলাই মাসের একটি ইমেইল দেখান, যেটি এপস্টিন নিজেকেই পাঠিয়েছিলেন এবং যাতে অ্যালিসের নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল। এতে বোঝা যায়, এপস্টিন গেটসের ব্যক্তিগত জীবনের অনেক গভীর তথ্যই রাখতেন।
গেটস কংগ্রেস সদস্যদের কাছে দৃঢ়ভাবে বলেন, তার সম্পর্কের তথ্য কাজে লাগিয়ে এপস্টিন কখনো সফলভাবে তাকে ব্ল্যাকমেইল করতে পারেননি। যদিও তার ধারণা, এপস্টিনের উদ্দেশ্য ঠিক সেদিকেই ছিল।
যৌনবাহিত রোগ ও গোপন অ্যান্টিবায়োটিকের অভিযোগ অস্বীকার
এই পুরো ঘটনায় সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ হলো এপস্টিনের একটি চিঠির বিষয়বস্তু। সেই চিঠিতে দাবি করা হয়েছিল, রুশ নারীদের সঙ্গে সম্পর্কের পর গেটস যৌনবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং তিনি গোপনে তার তখনকার স্ত্রী মেলিন্ডাকে অ্যান্টিবায়োটিক দিতে চেয়েছিলেন। গেটস কংগ্রেসের সামনে এই অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন। তার বক্তব্য, কোনো একটি সম্পর্কের পর সংক্রমণ হতে পারে এই আশঙ্কা তার মনে এসেছিল ঠিকই, কিন্তু বাস্তবে তিনি কখনোই যৌনবাহিত কোনো রোগে আক্রান্ত হননি।
নতুন বিতর্কে আবারও বিব্রত গেটস
এপস্টিন-সংক্রান্ত গোপনীয় নথিপত্র প্রকাশের পর একের পর এক নতুন তথ্য সামনে আসছে, যা বিল গেটসকে বারবার বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলছে। একসময়ের বিশ্বের শীর্ষ ধনী এবং বিশ্বজুড়ে পরিচিত এই প্রযুক্তি ব্যক্তিত্বের ব্যক্তিগত জীবনের এই অধ্যায় এখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের শিরোনামে। এপস্টিন কাণ্ডের তদন্ত যত গভীরে যাচ্ছে, ততই একে একে সামনে আসছে তার সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নানা গোপন তথ্য।
আরও পড়ুন: ১১ মাসের কারাজীবন শেষে মুক্ত অভিনেতা সিদ্দিক — জেলে বসেই লিখেছেন ১৫টি নাটক ও ৩টি সিনেমার গল্প

