রবিবার আজানের পরিবর্তে ভেসে আসছে নতুন এক বিতর্ক—ডেনমার্ক থেকে। ছবি দেখে মনে হতে পারে ইউরোপের অন্য কোনো শান্ত শহর, কিন্তু সম্প্রতি দেশটির অভিবাসন মন্ত্রী মর্টেন বডসকভের একটি মন্তব্য পুরো ইউরোপজুড়ে আলোচনার ঝড় তুলেছে। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, মসজিদের মিনার থেকে আজানের ধ্বনি ছড়িয়ে পড়াকে ডেনমার্কের ভূমিতে কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।
ডেনমার্কের ছাদের ওপর আজানের সুর নয়—মন্ত্রীর কড়া বার্তা
বার্তা সংস্থা রিটজৌকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে অভিবাসন মন্ত্রী বডসকভ বেশ কড়া ভাষায় তার মনোভাব ব্যক্ত করেন। তার মতে, দেশটির কিছু এলাকায় হাঁটাচলা করলে এখন আর ডেনমার্কের মতো অনুভূতি হয় না, বরং মনে হয় যেন কেউ ইসলামাবাদের কোনো উপশহরে চলে এসেছেন। এই উপমার মাধ্যমেই তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, দেশের সাংস্কৃতিক পরিবেশে যে পরিবর্তন আসছে তা নিয়ে সরকার কতটা উদ্বিগ্ন।
সেন্টার-লেফট সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটস পার্টির এই নেতা জানিয়েছেন, ক্ষমতায় আসা নতুন সরকার আজান নিষেধাজ্ঞার আইনি দিকগুলো পরীক্ষা করতে নতুন করে তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু করবে। তার ভাষায়, ডেনমার্কের আকাশে আজানের ধ্বনি ভেসে বেড়ানোর কোনো জায়গা নেই, এবং দেশটির সড়কে চলার সময় কারো মনেই এমন বিভ্রম তৈরি হওয়া উচিত নয় যে তিনি অন্য কোনো মুসলিম-প্রধান শহরে অবস্থান করছেন।
আগে থেকেই কিছু এলাকায় বিধিনিষেধ চালু
বিষয়টি একেবারে নতুন নয়। রাজধানী কোপেনহেগেন-সহ ডেনমার্কের কয়েকটি অঞ্চলে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ আইনের আওতায় মাইক বা লাউডস্পিকারে আজান সম্প্রচারের ওপর আগে থেকেই স্থানীয় পর্যায়ে নিষেধাজ্ঞা বলবৎ রয়েছে। মন্ত্রী বডসকভের অভিযোগ, দেশজুড়ে এক প্রকার ক্রমবর্ধমান ইসলামীকরণ প্রক্রিয়া চলছে, যা সাধারণ নাগরিকদের ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত উন্মুক্ত স্থানগুলোকে দখল করে নিচ্ছে।
প্রসঙ্গত, দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য সাধারণত মসজিদের মিনার থেকে লাউডস্পিকারের মাধ্যমে আজান দেওয়ার রীতি প্রচলিত। তবে আইনি কাঠামোর মধ্য দিয়ে সারা দেশে আজান নিষিদ্ধ করার এই উদ্যোগ একেবারে প্রথমবার নয়—এর আগে ২০২০ সালে এবং তারপর ২০২৫ সালেও সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট সরকারের তরফ থেকে একই রকম পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। এবার তৃতীয় দফায় আবারও এই বিষয়টি সামনে আনা হলো।
ফ্রেডেরিকসেনের কঠোর অভিবাসন নীতি ও তৃতীয় মেয়াদ
ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে কড়া অভিবাসন নীতি অনুসরণকারী দেশগুলোর একটি ডেনমার্ক, এবং এই নীতির নেতৃত্বে রয়েছেন বামপন্থী প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন। চলতি মাসের শুরুতেই তিনি তৃতীয় বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। দেশটিতে কার্যকর তথাকথিত “ঘেটো আইন” অনুযায়ী, কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় বিদেশি বংশোদ্ভূত নাগরিকের সংখ্যা একটি নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে গেলে, প্রশাসন চাইলে জোরপূর্বক তাদের অন্যত্র স্থানান্তর করতে পারে।
এমনকি বেশ কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, আশ্রয়প্রার্থীদের নিজেদের থাকা-খাওয়ার খরচ মেটাতে স্বর্ণালংকার বা মূল্যবান সামগ্রী জমা রাখতে বাধ্য করা হয়। আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে তাদের জন্য কোনো সরকারি আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থাও রাখা হয় না। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ২০১৫ সালে যখন মধ্যপ্রাচ্য থেকে এক মিলিয়নের বেশি মানুষ ইউরোপের দিকে আসার চেষ্টা করেছিল, তখনও প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় ডেনমার্ক অনেক কম সংখ্যক আশ্রয়প্রার্থীকে গ্রহণ করেছিল।
ধর্মীয় স্বাধীনতা বনাম আইনি বাস্তবতা
তবে এই উদ্যোগ যতটা সহজ শোনাচ্ছে, বাস্তবায়ন তত সহজ হবে না বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আজান সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করার যেকোনো পরিকল্পনা বড় ধরনের আইনি বাধার মুখে পড়তে পারে। কারণ তদন্ত কমিটিকে একদিকে নাগরিকদের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা সুরক্ষিত রাখতে হবে, অন্যদিকে মসজিদ-সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের শান্তিপূর্ণ পরিবেশে বসবাসের অধিকারের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে।
ডেনমার্কের সংবিধান জনসমক্ষে ধর্মীয় উপাসনার অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে, যদিও এর সঙ্গে কিছু শর্তও জুড়ে দেওয়া আছে—যেমন গণতন্ত্রবিরোধী প্রচারণা বা নিষিদ্ধ সংগঠনে অর্থ সহায়তা প্রদানের ওপর নিষেধাজ্ঞা। তুলনামূলকভাবে জার্মানি ও ব্রিটেনের মতো ইউরোপীয় দেশগুলোতে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার বদলে আজান প্রচারের সময়সূচি ও শব্দের তীব্রতা নিয়ন্ত্রণে নির্দিষ্ট নিয়মকানুন বেঁধে দেওয়া হয়েছে, যাতে অমুসলিম প্রতিবেশীদের কোনো অসুবিধা না হয়।
পরিসংখ্যান বলছে, ডেনমার্কের প্রায় ৬০ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজারের কাছাকাছি। দেশটিতে মসজিদের সংখ্যা প্রায় ১০০টি, যার মধ্যে অন্যতম পরিচিত নাম কোপেনহেগেনের গ্র্যান্ড মস্ক। তবে মজার বিষয় হলো, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আগে থেকেই হওয়া এক সমঝোতার কারণে এই মসজিদ থেকে বাইরে আজান প্রচার করা হয় না।
নির্বাচনী প্রেক্ষাপট ও জোট সরকারের রাজনীতি
গত মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। এরপর দীর্ঘ ও জটিল জোট-আলোচনার মধ্য দিয়ে চলতি মাসে পুনরায় প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসেন ফ্রেডেরিকসেন। মধ্যপন্থী মডারেটস, বামপন্থী সোশ্যাল লিবারেলস এবং গ্রিন লেফট দলের সমন্বয়ে গঠিত এই চার-দলীয় জোট সরকার রাজনৈতিক মহলে “ফোর-লিফ ক্লোভার” জোট নামে পরিচিতি পেয়েছে। এই সরকার পরিবেশবাদী ও সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার রেড-গ্রিন অ্যালায়েন্সের সমর্থনের ওপরও অনেকাংশে নির্ভরশীল।
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে চাওয়ার হুমকি দিচ্ছিলেন। মূলত এই বহিরাগত চাপের বিরুদ্ধে একটি দৃঢ় জাতীয় অবস্থান ও শক্তিশালী রাজনৈতিক ম্যান্ডেট নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই ফ্রেডেরিকসেন গত মার্চে আগাম নির্বাচনের ডাক দিয়েছিলেন।
সবমিলিয়ে, আজান নিষিদ্ধ করার এই নতুন উদ্যোগ স্রেফ একটি ধর্মীয় বিতর্ক নয়—এটি ডেনমার্কের অভিবাসন নীতি, জাতীয় পরিচয়ের রাজনীতি এবং সাংবিধানিক স্বাধীনতার মধ্যকার এক জটিল সমীকরণের অংশ। তদন্ত প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই বিতর্কের চূড়ান্ত পরিণতি কী হবে, সেটা বলা মুশকিল।
আরও পড়ুন: লক্ষ্মীপুরে ঘরে ঢুকে মা ও দুই মেয়েকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা

