বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশের চেহারাটা যায় বদলে। ঘরে ঘরে, পাড়ায় পাড়ায়, ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে শুরু হয় এক অন্যরকম উৎসব। রাতের পর রাত জেগে বিশ্বকাপ ফুটবল দেখার এই সংস্কৃতি যেন আমাদের রক্তে মিশে গেছে। দেশটা মোটামুটি দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে যায়—একদল আর্জেন্টিনার পতাকা ওড়ায়, আরেক দল ব্রাজিলের। তবে এই দুই পরাশক্তির বাইরেও যে সমর্থনের অভাব নেই, তা বোঝা যায় এমবাপ্পের ফ্রান্স, রোনালদোর পর্তুগাল, হ্যারি কেইনের ইংল্যান্ড, হাকিমির মরক্কো বা চারবারের চ্যাম্পিয়ন জার্মানির পতাকা হাতে ঘোরা মানুষদের দেখলে। এমনকি এবারের আসরে চমক দেখানো, মাত্র ৬ লাখ মানুষের দেশ কেপ ভার্দের পক্ষেও বাংলাদেশে যত সমর্থক জুটেছে, তা হয়তো সেই দেশের নিজের জনসংখ্যাকেই ছাড়িয়ে যাবে।
শহর থেকে গ্রাম—সব জায়গাতেই বড় পর্দায় খেলা দেখার আয়োজন এখন নিয়মিত দৃশ্য। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় থাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার দৃশ্য। আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের ম্যাচ থাকলে টিএসসি চত্বর রূপ নেয় ছোট্ট এক আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলে। কেবল শিক্ষার্থীরাই নয়, নানা বয়সী, নানা পেশার মানুষ ভিড় করেন এখানে—মনে হয় যেন কোনো স্টেডিয়ামেই বসে আছেন তারা। লিওনেল মেসি যে রাতে বিশ্বকাপে গোলের রেকর্ড গড়েছিলেন, সেই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলে গিয়ে নিজেও খেলা দেখেছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত আর্জেন্টাইন রাষ্ট্রদূত মার্সেলো কার্লোস সেসো। আর্জেন্টাইন সমর্থকদের উল্লাসের মাঝে দাঁড়িয়ে তিনি বলেছিলেন, নিজের দেশেই যেন আছেন বলে মনে হচ্ছিল তার।
এভাবেই বিশ্বকাপ এলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে চলে বিশেষ আয়োজন, প্রতিটি হলেই থাকে বড় পর্দায় খেলা দেখার ব্যবস্থা। ঢাবি একা নয়, দেশের প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেই বিশ্বকাপ ঘিরে চলে জমজমাট আয়োজন। শুধু শিক্ষাঙ্গন নয়, পাঁচতারকা হোটেল থেকে শুরু করে অলিগলির ক্যাফে-রেস্টুরেন্ট, সবখানেই এখন বিশ্বকাপ স্পেশাল প্যাকেজ। বাসাবাড়িতেও কমেনি উন্মাদনা—রাত জেগে খেলা দেখার ধুম পড়ে যায় ঘরে ঘরে। তরুণ-তরুণীরা পছন্দের দলের জার্সি পরে খেলা উপভোগ করেন, অনেকে তো পুরো টুর্নামেন্ট জুড়েই সেই জার্সি গায়ে রাখেন। দেশের আকাশ-বাতাস যেন ছেয়ে যায় ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পতাকায়, ফাঁকে ফাঁকে উড়তে দেখা যায় ফ্রান্স, জার্মানি বা পর্তুগালের পতাকাও। কয়েকটি গ্রাম তো একেবারে রঙ বদলে নেয়—কোথাও আর্জেন্টিনা, কোথাও ব্রাজিলের সাজে। প্রিয় দল জিতলে মিছিল হয়, নিজের পয়সা খরচ করে মিষ্টি বিতরণ করা হয়, কোথাও কোথাও গরু-খাসি জবাই করে সমর্থকদের আপ্যায়নও করা হয়। তবে এই উন্মাদনার একটা নেতিবাচক দিকও আছে—দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে মাঝে মাঝে উত্তেজনা ও সংঘাতের খবরও আসে। সোশ্যাল মিডিয়াতে তো ট্রল আর কমেন্ট যুদ্ধ চলে প্রায় নিয়মিতই।
এই দেড় মাস বিশ্বকাপ যেন আমাদের সব দুঃখ-কষ্ট ভুলিয়ে দেয়। চারপাশের অভাব, অনিশ্চয়তা, হতাশা—সব কিছুকে কিছুদিনের জন্য পাশে সরিয়ে রেখে আমরা মেতে উঠি এই উৎসবে। বিশ কোটি মানুষের এই দেশে এমন কাউকে খুঁজে পাওয়াই কঠিন, যার ফুটবলের প্রতি কোনো টান নেই, বিশ্বকাপ নিয়ে কোনো আগ্রহ নেই। এই জাতি আসলেই ফুটবলপ্রেমী, আর উৎসবের উপলক্ষ এমনিতেই কম পাওয়া এই দেশে বিশ্বকাপ এনে দেয় এক বিশাল আনন্দের উপলক্ষ।
কিন্তু এত ভালোবাসা সত্ত্বেও এই দেশ কখনো বিশ্বকাপের মূল আসরে খেলার সুযোগ পায়নি। বিশ্বকাপ তো অনেক দূরের গল্প, স্বাধীনতার পর এশিয়া কাপ ফুটবলেই বাংলাদেশ খেলতে পেরেছে কেবল একবার, ১৯৮০ সালে। এ বছর নারী জাতীয় দল নারী এশিয়া কাপে অংশ নিয়েছে, যা কিছুটা স্বস্তির খবর। সাফ ফুটবলের ইতিহাসও খুব একটা সুখকর নয়—২০০৩ সালে একবার শিরোপা জিতলেও তারপর আর সেই সাফল্যের ধারেকাছেও যাওয়া হয়নি। ফিফার সাম্প্রতিক র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮১তম। প্রশ্ন উঠতে বাধ্য—কোটি কোটি ভক্তের এই দেশে ফুটবলের এমন করুণ পরিণতি কেন?
ফিফার এক গবেষণা বলছে, কোনো দেশের ফুটবলের বিকাশে দর্শক-সমর্থনই সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি। যে দেশে ফুটবল জনপ্রিয়, সেই দেশের ফুটবলের ভবিষ্যৎ স্বাভাবিকভাবেই উজ্জ্বল হওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা এই তত্ত্বকে যেন প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। আমাদের ফুটবল উন্মাদনা ইংল্যান্ড, আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের সমর্থকদের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়, তবুও আমাদের নিজের ফুটবল কাঠামো রুগ্ণ, প্রায় মৃতপ্রায়। বিশ্বকাপের এই উন্মাদনার মধ্যেই এই প্রশ্নের সত্যিকারের উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি। সত্যি বলতে, দেশের ফুটবল আজও যে কিছুটা টিকে আছে, তার পেছনে বড় অবদান দেশের শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী বসুন্ধরার। বলা যায়, দেশের ফুটবলের একমাত্র বড় ভরসা এখন বসুন্ধরাই।
বিশ্বের প্রতিটি দেশে ফুটবল সংস্কৃতির মূল রক্ষক হলো ক্লাব। নতুন প্রতিভা খুঁজে বের করা, তাদের গড়ে তোলা, ধারাবাহিকভাবে খেলোয়াড় তৈরি করা এবং খেলাকে জনপ্রিয় করার পেছনে ক্লাবগুলোর ভূমিকাই সবচেয়ে বড়। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, চেলসি, রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, আর্সেনাল বা ম্যানসিটির মতো ক্লাবের অ্যাকাডেমি কার্যক্রম আজ বিশ্বজুড়ে অনুকরণীয় মডেল। কিন্তু স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের ক্লাবগুলো কখনোই পরিকল্পিতভাবে তলা থেকে খেলোয়াড় তৈরির উদ্যোগ নেয়নি। স্থানীয়ভাবে তৈরি হওয়া এবং বাফুফের অনুমোদিত খেলোয়াড়দের উপরই নির্ভরতা থেকে গেছে বরাবর। এর ফলে দেশের ফুটবল কখনো নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেনি। গত প্রায় ৫৩ বছরের ফুটবল-চিত্র আসলে এই ব্যর্থতার এক জীবন্ত দলিল।
এই প্রেক্ষাপট বদলানোর লক্ষ্যেই এগিয়ে আসে বসুন্ধরা গ্রুপ। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে প্রথম প্রকৃত পেশাদার ফুটবল ক্লাব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে বসুন্ধরা কিংস, যারা বিশ্বমানের ক্লাব ফুটবলের আদলে দেশের ফুটবল কাঠামোকে বদলে দেওয়ার চেষ্টা শুরু করে। ক্লাবটি দেশের ফুটবলের রঙ-রূপই পাল্টে দিয়েছে বলা চলে। শুরু থেকেই তারা হেঁটেছে সংস্কারের পথে—স্পষ্ট লক্ষ্য, উদ্দেশ্য আর স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নেমে কেবল দেশের গণ্ডিতেই আটকে থাকেনি, দক্ষিণ এশিয়া ছাড়িয়ে আরও বহু দেশে বাংলাদেশের একমাত্র সত্যিকারের পেশাদার ক্লাব হিসেবে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ঘরোয়া ফুটবলে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে নতুন ইতিহাস গড়েছে তারা। আধুনিক চিন্তাধারায় চালিত এই ক্লাব দেশের ক্লাব ফুটবলে নতুন এক ধারার সূচনা করেছে, হয়ে উঠেছে অন্য ক্লাবগুলোর জন্য আদর্শ এক মডেল।
দেশের ক্রীড়াঙ্গনের মান উন্নয়ন, ক্রীড়াচর্চাকে উৎসাহ দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের সুনাম বৃদ্ধির লক্ষ্যে বসুন্ধরা গ্রুপের হাজার কোটি টাকার এই বিনিয়োগের পেছনে মূল প্রেরণা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানের খেলাধুলার প্রতি গভীর অনুরাগ। তবে দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, বসুন্ধরার মতো অন্য কোনো বড় শিল্পগোষ্ঠী এখনো ফুটবলের মান উন্নয়নে সেভাবে এগিয়ে আসেনি। বসুন্ধরা কিংস ছাড়া বাকি ক্লাবগুলো আজও পেশাদারিত্বের পথে হাঁটতে পারেনি। আবাহনী, মোহামেডান বা ব্রাদার্স ইউনিয়নের মতো একসময়ের জনপ্রিয় ক্লাবগুলোর আজও নির্দিষ্ট কোনো আয়ের উৎস নেই। চাঁদা তুলে বা ক্লাবে হাউজি খেলিয়ে কোনোরকমে চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হলেও তাতে ফুটবলের মান বাড়ানো যায় না। বাংলাদেশে অন্তত ত্রিশটি বড় শিল্পগোষ্ঠী আছে। তাদের প্রত্যেকে যদি একটি করে ক্লাবের দায়িত্ব নেয় এবং বসুন্ধরা কিংসের মডেলে ক্লাব গড়ে তোলে, তাহলে দেশের ফুটবলের সুদিন ফিরতে বেশি সময় লাগবে না। এজন্য সরকারকেই এগিয়ে এসে শিল্পগোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে হবে।
পাশাপাশি কিশোর বয়স থেকেই ফুটবলার তৈরির জন্য গড়ে তুলতে হবে ফুটবল একাডেমি। এমন একাডেমি সারা দেশ থেকে প্রতিভা খুঁজে বের করে তাদের সুসংগঠিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ভবিষ্যতের তারকা হিসেবে গড়ে তুলবে। এসব একাডেমি হবে আসলে আগামী দিনের সেরা খেলোয়াড় তৈরির কারখানা। বর্তমানে বসুন্ধরা ফুটবল একাডেমি ও বিকেএসপি ছাড়া দেশে এ ধরনের কোনো মানসম্পন্ন একাডেমি নেই বললেই চলে। এই ধরনের অবকাঠামো গড়ে তুলতে না পারলে শুধু ফুটবল নয়, কোনো খেলাতেই টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। সরকারি ও বেসরকারি দুই পর্যায় থেকেই এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি, এবং যারা এমন উদ্যোগ নেবে, তাদের বিশেষ প্রণোদনা ও সরকারি সহায়তা দেওয়া উচিত।
বাংলাদেশের ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাফুফেকেও (বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন) এখন দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। বিশ্বের কোনো দেশের ফুটবলই রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় শক্তিশালী হয়নি, বরং ক্লাব ফুটবলের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাই একমাত্র পরীক্ষিত পথ।
বর্তমান যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ ফুটবলার লিওনেল মেসিকে নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে যে আলোচনা, তার পেছনে কিন্তু আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশনের কোনো হাত নেই—তাকে গড়ে তুলেছে বার্সেলোনা ক্লাব। শৈশবে শারীরিক বৃদ্ধি নিয়ে সমস্যায় ভোগা এক লাজুক কিশোরের বিশ্বসেরা হয়ে ওঠার গল্প সত্যিই রূপকথার মতো শোনায়। গ্রোনদোলি ও নিওয়েল’স ওল্ড বয়েজে খেলার সময়ই তার গ্রোথ হরমোনের সমস্যা ধরা পড়ে, আর চিকিৎসার খরচ বহনে অক্ষম পরিবার মাত্র ১৩ বছর বয়সেই তাকে নিয়ে পাড়ি জমায় স্পেনে, যোগ দেয় বার্সেলোনার বিখ্যাত লা মাসিয়া একাডেমিতে। আজকের মেসির আসল জন্ম যেন হয় বার্সেলোনাতেই। মেসির মতো প্রায় সব ফুটবল তারকার আসল উত্থানও শুরু হয় ক্লাব থেকে। বাংলাদেশের ফুটবলকে নতুন প্রাণ দিতে হলে তাই ক্লাব ফুটবলের জাগরণ ঘটাতেই হবে।
মৃতপ্রায় এই খেলাকে এখনো বাঁচিয়ে রেখেছে বসুন্ধরা কিংস একা। দেশের ফুটবলে সত্যিকারের জাগরণ আনতে হলে বসুন্ধরার মতো আরও সম্পূর্ণাঙ্গ ক্লাব গড়ে তুলতে হবে, যেখানে বাফুফে ও সরকারের সহযোগিতা থাকবে অপরিহার্য। একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার ভিত্তিতে পুরো ফুটবল ব্যবস্থাকে নতুন করে সাজাতে হবে, নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড় তৈরি করতে হবে। আর সবচেয়ে জরুরি কথা—খেলাধুলাকে রাজনীতির প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে হবে। কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী মানুষের এই দেশে ফুটবল এমন পিছিয়ে থাকবে, এটা আসলেই মেনে নেওয়ার মতো নয়।
আরও পড়ুন: আবারও স্টেডিয়াম পরিষ্কার করে বিশ্বমঞ্চে প্রশংসা কুড়ালেন জাপানি সমর্থকরা

