দেশের প্রায় ৩৯ হাজার বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বর্তমানে এই দায়িত্ব পালন করে আসছে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)। তবে নতুন প্রস্তাবনা অনুযায়ী, এই কর্তৃত্ব সংস্থাটির হাত থেকে সরিয়ে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির কাছে হস্তান্তরের চিন্তাভাবনা চলছে বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
শিক্ষাবিদ ও নীতি-বিশ্লেষকরা এই সম্ভাব্য পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের ভাষ্যমতে, অতীতে যখন কমিটির হাতে সরাসরি নিয়োগের ক্ষমতা ছিল, তখন মেধা ও যোগ্যতার বদলে আর্থিক লেনদেন বা ঘুষের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের ঘটনা ব্যাপকভাবে ঘটেছে। পুরোনো এই ব্যবস্থা পুনরায় চালু হলে রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি ও নিয়োগ-বাণিজ্য বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
জাল সার্টিফিকেট কেলেঙ্কারি সামনে এনেছে পুরনো সমস্যা
সম্প্রতি দেশের ৯৭৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন বিষয়ের শিক্ষকদের জাল সনদ ব্যবহারের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব শিক্ষকের বড় অংশই রাজনৈতিক বিবেচনা কিংবা আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে চাকরিতে প্রবেশ করেছিলেন। বিষয়টি ধরা পড়ার পর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের নেওয়া বেতন-ভাতার পুরো অর্থ ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। এই ঘটনা নতুন করে কমিটিভিত্তিক নিয়োগ পদ্ধতির ঝুঁকি নিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে যেভাবে এলো প্রস্তাব
গত ৩ আগস্ট বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এন্ট্রি লেভেলে শিক্ষক নিয়োগ পদ্ধতি নিয়ে আয়োজিত এক বৈঠকে ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে নিয়োগের প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক কর্মকর্তার বরাতে জানা গেছে, জাতীয় সংসদে আইনমন্ত্রীর একটি বক্তব্যের প্রেক্ষাপটেই এই প্রস্তাব সামনে আনা হয়।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, এনটিআরসিএর কার্যপরিধিতে সরাসরি নিয়োগ সুপারিশ করার এখতিয়ার স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। সংস্থাটির মূল দায়িত্ব নিবন্ধন পরীক্ষা গ্রহণ ও সনদ প্রত্যয়ন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। এই আইনি অস্পষ্টতার কারণে ভবিষ্যতে জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে বৈঠকে আলোচনা হয়।
দূরবর্তী পদায়নের সমস্যা যেভাবে আলোচনায় এলো
বৈঠকে অংশ নেওয়া এক কর্মকর্তা জানান, শিক্ষকদের নিজ এলাকা থেকে অনেক দূরে পদায়নের বিষয়টি নিয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা হয়েছে। এনটিআরসিএর মাধ্যমে সুপারিশ পাওয়া শিক্ষকদের প্রায়ই নিজ জেলা বা উপজেলা থেকে দূরে কর্মস্থলে যোগ দিতে হয়, যা তাদের জন্য বাড়তি ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই সমস্যা সমাধানে বর্তমান পদ্ধতি বাতিল করে কমিটির মাধ্যমে নিয়োগের সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে, যাতে শিক্ষকরা নিজ এলাকাতেই কর্মসংস্থানের সুযোগ পান।
আরেকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, এনটিআরসিএ প্রবর্তনের আগে ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডিই শিক্ষক নিয়োগ করত, তবে প্রার্থীকে অবশ্যই এনটিআরসিএর সনদ অর্জন করে আসতে হতো। ওই পদ্ধতিতে স্থানীয়ভাবে নিয়োগ হওয়ায় শিক্ষকরা নিজ এলাকায় থাকার সুযোগ পেতেন। তবে বিষয়টি এখনো যাচাই-বাছাই পর্যায়ে আছে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন।
এনটিআরসিএর দুই দশকের যাত্রা
২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এনটিআরসিএ শুরুর দিকে কেবল নিবন্ধন পরীক্ষা নিয়ে সনদ প্রদান করত, সরাসরি নিয়োগ সুপারিশের এখতিয়ার ছিল না। ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর থেকে সংস্থাটি নিবন্ধিত প্রার্থীদের সরাসরি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের সুপারিশ কার্যক্রম শুরু করে। এর ফলে ঘুষ ছাড়াই স্বচ্ছভাবে নিয়োগ পাওয়ার পথ তৈরি হয়, যা থেকে উপকৃত হয়েছেন অসংখ্য প্রার্থী। স্বচ্ছতার কারণে সংস্থাটিকে অনেকে “দ্বিতীয় সরকারি কর্মকমিশন” হিসেবেও আখ্যায়িত করেন। ২০২৬ সাল পর্যন্ত এনটিআরসিএ মোট ১ লাখ ৭৭ হাজার ৫৭১ জন শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করেছে।
অতীতে কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ যেভাবে হতো
এনটিআরসিএ চালুর আগে এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের উদ্যোগে জাতীয় বা স্থানীয় পত্রিকায় শূন্যপদের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করত। প্রার্থীরা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানেই সরাসরি আবেদন করতেন, এরপর ম্যানেজিং কমিটি গঠিত বোর্ডের অধীনে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিতেন। চূড়ান্ত নির্বাচন ও নিয়োগের সিদ্ধান্ত কমিটির নিজস্ব বিবেচনায় হতো। এই ব্যবস্থায় স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপে নিয়োগ প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা প্রায়ই ক্ষুণ্ন হতো, ফলে যোগ্য প্রার্থীরা বঞ্চিত হতেন।
নির্বাচিত কমিটির অভাবে দুই বছর ধরে অচলাবস্থা
লক্ষণীয় বিষয় হলো, দেশের অধিকাংশ মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ের এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে গত দুই বছর ধরে কোনো নির্বাচিত ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডি নেই। এসব প্রতিষ্ঠান বারবার অ্যাডহক কমিটি গঠনের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে, এবং শিক্ষা বোর্ডগুলো এখনো নিয়মিতভাবে নতুন অ্যাডহক কমিটি অনুমোদন করে যাচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. জিয়াউল কবির দুলু ইত্তেফাককে জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশজুড়ে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে অ্যাডহক কমিটি বসানো হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী অ্যাডহক কমিটির মেয়াদ ছয় মাস হলেও, বাস্তবে একই ব্যক্তিরা বারবার ছয় মাস পরপর নতুন অ্যাডহক কমিটির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখছেন। তার অভিযোগ, অ্যাডহক কমিটির প্রথম দায়িত্ব নির্বাচনের মাধ্যমে স্থায়ী কমিটি গঠন করা হলেও, শিক্ষা বোর্ডগুলোর অসহযোগিতা ও অনৈতিক সমর্থনের কারণে সেই নির্বাচন প্রক্রিয়া বছরের পর বছর আটকে আছে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোতে সুষ্ঠু মনিটরিংয়ের অভাব দেখা দিচ্ছে, শিক্ষার মান কমছে এবং অনুমোদিত খাতের বাইরে অর্থ ব্যয় করে ফান্ড আত্মসাতের ঘটনাও ঘটছে। জবাবদিহিহীন এই ব্যবস্থার একমাত্র সমাধান হিসেবে দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।
মেধাভিত্তিক নিয়োগ ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা বিশেষজ্ঞদের
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের একজন অধ্যাপকের মতে, শিক্ষক নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব বাড়লে মেধার সঠিক মূল্যায়ন কঠিন হয়ে পড়ে। দলীয় পরিচয় বা রাজনৈতিক আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়া হলে প্রকৃত মেধাবী ও যোগ্য প্রার্থীরা সুযোগবঞ্চিত হন। ফলাফলস্বরূপ অপেক্ষাকৃত কম দক্ষ শিক্ষকদের হাতে শ্রেণিকক্ষের দায়িত্ব চলে যায়, যা শিক্ষার্থীদের পাঠদানের মান এবং সামগ্রিকভাবে প্রতিষ্ঠানের সুনামের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এখনো চূড়ান্ত হয়নি সিদ্ধান্ত
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা স্পষ্ট করে বলেছেন, শিক্ষক নিয়োগ পদ্ধতি পরিবর্তনের বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। বিভিন্ন প্রস্তাব ও আলোচনা চলমান রয়েছে, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলে তা যথাসময়ে জানানো হবে। তবে অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে শিক্ষক সমাজ ও অভিভাবকরা এই পরিবর্তন নিয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখছেন, কারণ নিয়োগ পদ্ধতিতে যেকোনো পরিবর্তনের প্রভাব সরাসরি পড়বে দেশের লাখো শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের ওপর।
আরও পড়ুন: অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডারে যুগান্তকারী পরিবর্তন: এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা এখন থেকে ডিসেম্বরেই!

