পরীক্ষা নামের এক নীরব যন্ত্রণা
বাংলাদেশে বেড়ে ওঠা একটি শিশুর জীবনে পরীক্ষা শব্দটি কতটা ভারী বোঝা হয়ে দাঁড়ায়, সেটা বাইরে থেকে বোঝানো প্রায় অসম্ভব। এই বাস্তবতা শুধু পরিসংখ্যানের বিষয় নয়, এটি একটি প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রশ্ন। যে শিশুটি সারাদিন স্কুলে কাটিয়ে বাসায় ফিরে আবার বই নিয়ে বসতে বাধ্য হয়, তার শৈশব কোথায় হারিয়ে যায়—এই প্রশ্নটি বহুদিন ধরেই উপেক্ষিত থেকে গেছে।
দুই সন্তানের গল্প, দুই ভিন্ন বাস্তবতা
একদিকে প্রবাসে বেড়ে ওঠা সাত বছর বয়সী এক শিশু, যে সদ্য গ্রেড-থ্রিতে উঠেছে। তার স্কুলব্যাগে থাকে শুধু পানির বোতল আর হালকা একটা জ্যাকেট। হোমওয়ার্কের চাপ নেই বললেই চলে, প্রাইভেট টিউটরের প্রয়োজন নেই, নেই বার্ষিক পরীক্ষার আতঙ্ক কিংবা রোল নম্বরের প্রতিযোগিতা। বরং তার মনোযোগ এখন গ্রাফিক নভেলের দিকে—ডগম্যান, ক্যাটকিড, দ্য ইনভেস্টিগেটরসের মতো সিরিজ একের পর এক পড়ে চলেছে সে, ঘরে জমছে বইয়ের স্তূপ।
অন্যদিকে বাংলাদেশে বেড়ে ওঠা ভাগ্নে-ভাগ্নিদের দিকে তাকালে মনটা ভারী হয়ে আসে। যে চাপের সংস্কৃতিতে নিজে বড় হয়েছেন, সেই একই চক্রে আটকে আছে পরের প্রজন্মও। ক্লাস টু-থ্রির একটি শিশুর জন্য বুয়েটের ছাত্র খুঁজে বেড়ানো, সারাদিন স্কুলের পর বাসায় ফিরে আবার পড়তে বসা, বার্ষিক পরীক্ষা আর রোল নম্বরের জন্য নিরন্তর মানসিক চাপ—এসবই যেন স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভোরবেলা ঘুম ভাঙানোর সেই স্মৃতি
নিজের ছোটবেলার একটি স্মৃতি এখানে প্রাসঙ্গিক। মা প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে তুলে দিতেন এই বিশ্বাসে যে, ভোরবেলা মাথা ঠাণ্ডা থাকে, পড়া মনে থাকে বেশি। বাধ্য সন্তানের মতো দিনের পর দিন ভোরে উঠে পড়তে বসতে হয়েছে। পড়াশোনা ছাড়া অন্য কিছু করার সাহস কিংবা সুযোগ, কোনোটাই তখন ছিল না। এই একই বৃত্তে আজও আটকে আছে একটি পুরো জাতির শিশু-কিশোররা—সকাল থেকে সন্ধ্যা, স্কুলে কিংবা স্কুল থেকে ফিরে বাসায়, শুধু পড়া আর পড়া।
প্রশ্ন থেকে যায়: এত পড়েও কেন পিছিয়ে?
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি উঠে আসে। শিক্ষানীতি নির্ধারণের দায়িত্বে যারা আছেন, তারা কি কখনো ভেবে দেখেন—এত বিপুল সময় আর শ্রম পড়াশোনায় ব্যয় করার পরও কেন বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা বিশ্বমানের উদ্ভাবন বা নেতৃত্বের জায়গায় পৌঁছাতে পারছে না?
স্টকহোমের অভিজ্ঞতা: ভিন্ন এক শিক্ষা-সংস্কৃতি
স্টকহোম ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনার সময় একটি বিষয় স্পষ্ট চোখে পড়েছিল—সেখানকার শিক্ষার্থীরা বাসায় ফিরে খুব বেশি পড়াশোনা করে না। যা পড়ার দরকার, তার বেশিরভাগই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসেই সম্পন্ন হয়ে যায়। নাওয়া-খাওয়া ভুলে দিনরাত বই মুখে গুঁজে বসে থাকার সংস্কৃতি বিদেশে চোখে পড়েনি। জিপিএ বাড়ানোর জন্য পারিবারিক বা সামাজিক যে চাপ বাংলাদেশে স্বাভাবিক ঘটনা, সেটিও সেখানে অনুপস্থিত। মাসব্যাপী পরীক্ষার ধকল নেই, অভিভাবকদের দিনভর দুশ্চিন্তাও নেই। অথচ বিশ্বের বেশিরভাগ যুগান্তকারী আবিষ্কার আর উদ্ভাবনের পেছনে রয়েছে এই দেশগুলোরই অবদান।
জার্মানির উদাহরণ: শৃঙ্খলা থাকলেও নেই অতিরিক্ত চাপ
জার্মানরা সময়ানুবর্তিতার জন্য পরিচিত, পড়াশোনাতেও তারা মনোযোগী। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শত শত বছর ধরে বিশ্বসেরা বিজ্ঞানী, দার্শনিক, গণিতবিদ, শিল্পী কিংবা ক্রীড়াবিদ তৈরির রহস্য কী? জার্মানির শিক্ষার্থীদের ভোরবেলা উঠে পড়তে বসার দৃশ্য চোখে পড়ে না, প্রাইভেট টিউটর বা কোচিং সেন্টারের সংস্কৃতিও সেখানে নেই। স্কুল-কলেজের গেটে কোচিং সেন্টারের বিজ্ঞাপনী পোস্টারে দেয়াল ভরে থাকার দৃশ্যও অকল্পনীয়। তাহলে কীভাবে তাদের সন্তানরা বিশ্ব নেতৃত্ব দেওয়ার মতো মেধাবী হয়ে ওঠে?
সময় এসেছে ভাবার
এই প্রশ্নগুলো নিয়ে গভীরভাবে ভাবার সময় এখনই। যদি শিক্ষাব্যবস্থার এই মৌলিক দিকগুলো নিয়ে পুনর্বিবেচনা না হয়, তাহলে যুগের পর যুগ বাংলাদেশের শিশুরা শুধু বই মুখস্থ করেই যাবে, অথচ ভবিষ্যতের পৃথিবী পরিচালনা করবে সেইসব দেশের সন্তানরাই, যারা চাপমুক্ত পরিবেশে বেড়ে উঠে সৃজনশীলতা আর কৌতূহল নিয়ে বড় হয়েছে। মুখস্থবিদ্যা আর পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার বদলে সৃজনশীলতা, কৌতূহল আর ব্যবহারিক জ্ঞানের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার সময় এসেছে—নইলে প্রতিযোগিতার এই দৌড়ে বাংলাদেশ কেবল পিছিয়েই থাকবে।
লিখেছেন: RAUFUL ALAM (কিছুটা পরিমার্জিত)
তআরও পড়ুন: দলদাসত্ব ও সহমত সংস্কৃতি: জাতির অগ্রগতির সবচেয়ে বড় অন্তরায়

