পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী রাজ্যের ক্ষমতায় আসার পরপরই একটি ঐতিহাসিক ও বহুল আলোচিত পদক্ষেপ নিলেন। তিনি ঘোষণা করলেন যে এখন থেকে পশ্চিমবঙ্গে ভারত সরকারের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন অর্থাৎ সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট (CAA) ২০১৯ পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করা হবে। এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই রাজনৈতিক মহলে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের প্রেক্ষাপটেও বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
নবান্নে বিএসএফ বৈঠক থেকে বড় ঘোষণা
বুধবার কলকাতার নবান্নে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সদর দফতরে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের (BSF) উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ওই বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সামনে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন— ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের পরে যারা বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেছে, তাদের প্রত্যেককে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হবে এবং দ্রুত ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, রাজ্য পুলিশ এসব অনুপ্রবেশকারীকে গ্রেপ্তার করে বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করবে। পরবর্তীতে বিএসএফ তাদের বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (BGB)-এর হাতে তুলে দেবে।
কেন্দ্রের নির্দেশিকা উপেক্ষার অভিযোগ তৃণমূলের বিরুদ্ধে
শুভেন্দু অধিকারী এই সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্টভাবে জানান যে, ভারত সরকার ২০২৫ সালের ১৪ মে পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে একটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা পাঠিয়েছিল। ওই নির্দেশিকায় অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে সরাসরি বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ভারত সরকারের আন্ডার সেক্রেটারি প্রতাপ সিং রাওয়াত এই নির্দেশনা পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু তৎকালীন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল সরকার সেই নির্দেশনাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
শুভেন্দু অধিকারী এই বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, “আগের সরকার একদিকে শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেওয়ার বিরোধিতা করেছে, অন্যদিকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের ফেরত পাঠানোর কেন্দ্রীয় নির্দেশও পালন করেনি। আজ থেকে আমরা এই আইন পুরোপুরি কার্যকর করলাম।”
সিএএ আইনে কারা সুরক্ষিত, কারা নন?
নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা CAA মূলত আফগানিস্তান, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে আসা ছয়টি সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়— হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি ও খ্রিস্টানদের নাগরিকত্ব প্রদানের সুযোগ দেয়। এই তিনটি দেশের মুসলমান সম্প্রদায় এই আইনের আওতায় পড়েন না।
২০২৪ সালে এই আইনে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিমার্জন আনা হয়েছে। আগে যেখানে ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ভারতে প্রবেশ করাকে যোগ্যতার শর্ত ধরা হয়েছিল, সেখানে নতুন সংশোধনীতে এই সীমা বাড়িয়ে ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর করা হয়েছে। অর্থাৎ উল্লিখিত ছয়টি সম্প্রদায়ের যে কোনো ব্যক্তি ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ভারতে প্রবেশ করে থাকলে তারা আইনগতভাবে নাগরিকত্বের আবেদন করতে পারবেন এবং পুলিশ তাদের হেনস্তা করতে পারবে না।
তবে এই তারিখের পরে প্রবেশ করা যে কেউ— বিশেষত যারা সিএএর আওতায় নেই, যেমন বাংলাদেশ, পাকিস্তান বা আফগানিস্তান থেকে আসা মুসলমান— তাদের সরাসরি অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে গণ্য করা হবে এবং আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু স্পষ্ট করে বলেছেন, “যারা সিএএর আওতায় পড়েন না, তারা সম্পূর্ণভাবে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী। রাজ্য পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করবে, আটক করবে এবং বিএসএফের হাতে তুলে দেবে। কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।”
এই ঘোষণাকে অনেক বিশ্লেষক একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখছেন। বিজেপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার রাজ্যে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সীমান্ত নিরাপত্তা ও অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার সংকেত দিয়ে আসছিল। এই ঘোষণা সেই অবস্থানকেই আনুষ্ঠানিক রূপ দিল।
বিএসএফকে ২৭ কিলোমিটার জমি হস্তান্তর: সীমান্ত সুরক্ষায় বড় পদক্ষেপ
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের মোট সীমান্তের দৈর্ঘ্য প্রায় চার হাজার কিলোমিটার। এর মধ্যে দুই হাজার দুইশো কিলোমিটার পশ্চিমবঙ্গের ভেতর দিয়ে গেছে। শুভেন্দু অধিকারী জানান, বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী অন্য চারটি রাজ্য— আসাম, ত্রিপুরা, মিজোরাম ও মেঘালয়— আগেই বিএসএফের চাহিদামতো জমি হস্তান্তর করেছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে দুই হাজার দুইশো কিলোমিটার সীমান্তের মধ্যে মাত্র ১৬০০ কিলোমিটারে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া সম্ভব হয়েছে। বাকি প্রায় ৬০০ কিলোমিটার সীমান্ত এখনো অরক্ষিত রয়ে গেছে, যার জন্য তিনি সরাসরি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আগের সরকারকে দায়ী করেছেন।
এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে নতুন সরকারের দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করে শুভেন্দু বলেন, “আমরা দ্রুততার সঙ্গে জমি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করছি। আজকের এই অনুষ্ঠানে আমরা ২৭ কিলোমিটার এলাকার জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি ও বেসরকারি জমি হস্তান্তরের সূচনা করলাম। এই জমি ক্রয়ের সম্পূর্ণ অর্থ বিএসএফ বহন করবে।”
এই পদক্ষেপের ফলে পশ্চিমবঙ্গের অরক্ষিত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের কাজ ত্বরান্বিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ প্রভাব
শুভেন্দু অধিকারীর এই ঘোষণা স্বভাবতই বিভিন্ন মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। বিজেপি সমর্থকরা এটিকে দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত সিদ্ধান্ত বলে স্বাগত জানাচ্ছেন, অন্যদিকে বিরোধী শিবির এই পদক্ষেপকে সাম্প্রদায়িক বিভাজন সৃষ্টির প্রচেষ্টা বলে সমালোচনা করছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছে, আইনটির প্রয়োগে যেন প্রকৃত শরণার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত না হন।
বাংলাদেশের কূটনৈতিক মহলেও এই ঘোষণা নিয়ে নজরদারি বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে চলমান রাজনৈতিক সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে আলোচনার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিতে পারে।
সামগ্রিকভাবে বলা যায়, পশ্চিমবঙ্গে সিএএ কার্যকরের এই ঘোষণা ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হবে।
আরও পড়ুন: ইরানের পাল্টা আঘাতের কৌশল: যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলা করলে কী হবে?

