বিশ্বকাপের মাঠে গোল হোক বা না হোক — জাপানি সমর্থকরা প্রতিবারই একটি আলাদা ‘জয়’ নিয়ে মাঠ ছাড়েন। সেই জয় স্কোরবোর্ডে নয়, মানবিক মূল্যবোধ ও নাগরিক দায়িত্বের মঞ্চে। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ম্যাচ শেষে হাজার হাজার দর্শক যখন দ্রুত বের হওয়ার তাড়ায় ব্যস্ত, তখন নীল-সাদা জার্সি পরা জাপানি সমর্থকরা হাতে প্লাস্টিক ব্যাগ নিয়ে গ্যালারি পরিষ্কার করছেন — এই দৃশ্যই আবার ভাইরাল হয়েছে সারা বিশ্বে।
ডালাসে জাপান বনাম নেদারল্যান্ডস: মাঠের বাইরে অন্য এক লড়াই
যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে জাপান তাদের প্রথম ম্যাচে নেদারল্যান্ডসের মুখোমুখি হয়। ডালাসের স্টেডিয়ামে রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ে ম্যাচটি ২-২ গোলে ড্র হয়। কিন্তু ম্যাচের চেয়েও বড় আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে ম্যাচ-পরবর্তী একটি দৃশ্য।
হুইসেল বাজার পরপরই জাপানি সমর্থকরা পকেট ও ব্যাগ থেকে বের করলেন ছোট প্লাস্টিক ব্যাগ। পানির বোতল, চিপসের প্যাকেট, স্ন্যাকসের মোড়ক — আশেপাশের সব আবর্জনা তুলে নিলেন নিজেরাই। পুরো সেকশন পরিষ্কার না করা পর্যন্ত কেউ আসন ছাড়লেন না। এরপর সংগ্রহ করা আবর্জনা নির্ধারিত বিনে ফেলে তবেই স্টেডিয়াম ত্যাগ করলেন তারা।
এই অসাধারণ দৃশ্যের ছবি ও ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে। X (সাবেক টুইটার), ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকে লক্ষাধিক ব্যবহারকারী শেয়ার করেন এই পোস্টগুলো। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে ফুটবলপ্রেমীরা মন্তব্য করেন — “এটাই প্রকৃত সংস্কৃতি”, “জাপানিরা সত্যিকারের চ্যাম্পিয়ন।”
নতুন ঘটনা নয়, জাপানের দীর্ঘ ঐতিহ্য
জাপানি সমর্থকদের এই স্টেডিয়াম পরিষ্কার করার অভ্যাস কোনো হঠাৎ ঘটনা নয়। এটি দশকের পর দশক ধরে গড়ে ওঠা একটি সাংস্কৃতিক চর্চা।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপ: কাতার বিশ্বকাপে জাপান-জার্মানি ম্যাচসহ একাধিক খেলায় জাপানি সমর্থকরা গ্যালারি পরিষ্কার করে আলোচনায় আসেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল যে, তারা শুধু নিজেদের দলের ম্যাচেই নয়, অন্য দেশের খেলা দেখতে গিয়েও একই কাজ করেছিলেন।
২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপ: সেবারেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছিল। বেলজিয়ামের কাছে হৃদয়বিদারক হারের পরেও জাপানি সমর্থকরা কান্নার মাঝেও গ্যালারি পরিষ্কার করে বেরিয়েছিলেন — সেই ছবি বিশ্বজুড়ে ভাইরাল হয়েছিল।
ঘরোয়া লিগেও একই চিত্র: জে-লিগ (জাপানের পেশাদার ফুটবল লিগ), বেসবল ও অন্যান্য ক্রীড়া আসরেও খেলা শেষে দর্শকরা নিজে নিজেই স্টেডিয়াম পরিষ্কার করেন। স্টেডিয়াম কর্তৃপক্ষকে বাড়তি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করতে হয় না বললেই চলে।
কোথায় শেখে জাপানিরা এই মূল্যবোধ?
এই অভ্যাসের শিকড় খুঁজতে হলে যেতে হবে জাপানের শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক সংস্কৃতির গভীরে।
স্কুল থেকেই শুরু: জাপানের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে কোনো পরিচ্ছন্নতাকর্মী থাকেন না। শিক্ষার্থীরাই প্রতিদিন নিজেদের শ্রেণিকক্ষ, করিডোর ও টয়লেট পরিষ্কার করে। এই “সোজি” (Soji) বা দৈনিক পরিষ্কারের অভ্যাস শিশুকাল থেকেই তাদের মনে দায়িত্ববোধ গেঁথে দেয়।
“মোত্তাইনাই” দর্শন: জাপানি সংস্কৃতিতে “মোত্তাইনাই” (Mottainai) একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা — অর্থাৎ অপচয়ের প্রতি অনুতাপ। এই মানসিকতা থেকেই পরিবেশকে অপরিচ্ছন্ন করাকে তারা নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মনে করেন না।
সামাজিক দায়বদ্ধতা: জাপানি সমাজে ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে সামষ্টিক স্বার্থকে বড় করে দেখা হয়। “নিজের পরিবেশ নিজে রাখো” — এই ভাবনাটি পারিবারিক ও সামাজিকভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বাহিত হয়ে আসছে।
বিশ্ব কী শিখতে পারে জাপানের কাছ থেকে?
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্টেডিয়াম বা মাঠে খেলা শেষে অবস্থা যে কেমন হয়, সেটা অনেকেই জানেন। ছেঁড়া কাপ, ভাঙা বোতল, খাবারের উচ্ছিষ্ট — এগুলো সাফ করতে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়।
অথচ জাপানিরা দেখিয়ে দিচ্ছেন — এটি অসম্ভব নয়। একটু সচেতনতা, একটু দায়িত্ববোধ, এবং “আমিও পারি” এই মনোভাব থাকলে যেকোনো দেশের সমর্থকরাই পারেন স্টেডিয়াম পরিষ্কার রাখতে।
ফুটবল বিশেষজ্ঞ ও সামাজিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জাপানি সমর্থকদের এই আচরণ শুধু পরিচ্ছন্নতার বিষয় নয় — এটি একটি জাতির চরিত্রের প্রতিফলন। মাঠে হার-জিত থাকবেই, কিন্তু মানবিক মূল্যবোধে কখনো হারেন না জাপানিরা।
বিশ্বকাপে জাপানের পথচলা
২০২৬ বিশ্বকাপে জাপান দলটি কেবল মাঠের ভেতরেই নয়, মাঠের বাইরেও নিজেদের শক্তিশালী উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। প্রথম ম্যাচে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ২-২ গোলের ড্র থেকে বোঝা যাচ্ছে, এবারের বিশ্বকাপে জাপান দল প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল খেলতে প্রস্তুত। গ্রুপ পর্বে তাদের পরবর্তী ম্যাচগুলোতে কী হয়, সেটা দেখার অপেক্ষায় কোটি ফুটবলপ্রেমী।
তবে ফলাফল যাই হোক, জাপানি সমর্থকরা যেভাবে বিশ্বের মনে জায়গা করে নিয়েছেন — সেই ইতিহাস মুছে যাওয়ার নয়।
আরও পড়ুন: রামিসা হত্যা মামলার রায়: সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারের ফাঁসির আদেশ

