দেশে জুয়া ও অনলাইন বেটিং প্রতিরোধে নতুন আইন করতে যাচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে একটি নতুন বিল উপস্থাপন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে দেড় শতাধিক বছরের পুরনো একটি আইন বাতিল করে যুগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নতুন বিধিমালা চালু করা হবে।
মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে এই বিলটি উত্থাপন করেন। বিলটির নাম দেওয়া হয়েছে “জুয়া প্রতিরোধ বিল, ২০২৬”। উত্থাপনের পর বিলটি বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে পাঠানো হয়েছে এবং কমিটিকে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে এ বিষয়ে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
পুরনো আইন বাতিলের প্রস্তাব
নতুন এই বিলে ব্রিটিশ শাসনামলে প্রণীত “দ্য পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট, ১৮৬৭” সম্পূর্ণরূপে রহিত করার সুপারিশ করা হয়েছে। প্রায় দেড় শ বছর আগে তৈরি হওয়া এই আইনটি বর্তমান যুগের ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর জুয়া ও প্রতারণার ধরন মোকাবিলায় একেবারেই অচল হয়ে পড়েছিল, যে কারণে নতুন আইনের প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিন ধরেই অনুভূত হচ্ছিল।
বিলে মোট ২৪ প্রকার অপরাধমূলক কার্যক্রম সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—সরাসরি জুয়া খেলা, অনলাইন বা দূরবর্তী মাধ্যমে জুয়া পরিচালনা, বাজি বা বেটিং কার্যক্রম, পেশাদার বাজিকরের কার্যক্রম এবং খেলাধুলায় ম্যাচ ফিক্সিং বা স্পট ফিক্সিংয়ের মতো গুরুতর অপরাধ। অপরাধের ভয়াবহতা ও ধরন বিবেচনায় মোট ১৪ ক্যাটাগরিতে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে, যেখানে অর্থদণ্ড, কারাদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডই প্রয়োগ করা যাবে।
কোন অপরাধে কত শাস্তি
বিলের বিধান অনুযায়ী, সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জুয়ার সঙ্গে জড়িত থাকলে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড অথবা দুই লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা, কিংবা দুটিই একসঙ্গে হতে পারে।
এর চেয়ে কঠোর শাস্তি রাখা হয়েছে অনলাইন বা দূরবর্তী জুয়ার ক্ষেত্রে—এখানে সাজা হতে পারে পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং এক কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড। অনলাইন বেটিং কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হলে শাস্তি আরও বাড়বে—সর্বোচ্চ সাত বছরের জেল ও পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানার মুখে পড়তে হবে অভিযুক্তদের। আর খেলার ফলাফল নিয়ে কারচুপি, অর্থাৎ ম্যাচ ফিক্সিং বা স্পট ফিক্সিংয়ের মতো অপরাধে সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড এবং এক কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
কেন এই আইন প্রয়োজন হলো
বিলের সঙ্গে দাখিল করা উদ্দেশ্য ও কারণ সংবলিত বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বিদ্যমান গ্যাম্বলিং আইনটি প্রায় দেড়শ বছরের পুরনো হওয়ায় আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ দমনে তা কার্যকারিতা হারিয়েছে। এ ছাড়া সংবিধানের ১৮(২) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে জুয়া প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া আছে।
প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত জেলা প্রশাসক সম্মেলনে মাঠ প্রশাসন থেকে এই আইনের শাস্তির মাত্রা বাড়িয়ে যুগোপযোগী করার প্রস্তাব এসেছিল। সেই প্রস্তাবের ধারাবাহিকতায় দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর এখন সংসদে নতুন এই বিল উপস্থাপিত হলো।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য
বিল উত্থাপনের সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বর্তমান সময়ে অনলাইন জুয়া, স্পোর্টস বেটিং, ভার্চুয়াল ক্যাসিনো এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি-নির্ভর জুয়ার বিস্তার ঘটেছে, পাশাপাশি ভুয়া সিম কার্ড ও ডিজিটাল আর্থিক জালিয়াতির মাধ্যমে নানা অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, যা মোকাবিলায় বিদ্যমান আইন একেবারেই অপ্রতুল।
তিনি আরও জানান, ভিপিএন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভুয়া মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস অ্যাকাউন্ট, বায়োমেট্রিক জালিয়াতি এবং ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে যে জুয়া, অর্থ পাচার ও প্রতারণা সংঘটিত হচ্ছে, তা দেশের সামাজিক শৃঙ্খলা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, জননিরাপত্তা এবং বিশেষত তরুণ প্রজন্মের জন্য একটি বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
মন্ত্রীর ভাষায়, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জুয়ার বিস্তারে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত হয়েছে। তাই জনশৃঙ্খলা বজায় রাখা, অপরাধপ্রবণতা কমানো এবং এর ফলে সৃষ্ট আর্থিক, সামাজিক ও মানসিক ক্ষতি প্রতিরোধের পাশাপাশি রাষ্ট্রের সামগ্রিক নৈতিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য একটি সুসমন্বিত ও আধুনিক আইন প্রণয়ন করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আইন কার্যকর হলে অনলাইন জুয়া ও বেটিংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত চক্রগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে এবং বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে এই ধরনের ক্ষতিকর কার্যক্রম থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে। সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদনের পর বিলটি আইনে রূপ নেওয়ার পথে এগিয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: বেনজীর আহমেদকে ফেরাতে দুবাইয়ে যাচ্ছে প্রত্যর্পণ প্রস্তাব

