পবিত্র ঈদুল আজহা যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই উদ্বেগ বাড়ছে গাজীপুরের পোশাক শিল্পাঞ্চলে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় অর্ধশতাধিক কারখানার প্রায় এক লাখেরও বেশি শ্রমিক এখন বেতন ও উৎসব বোনাস পাবেন কি না — সেই অনিশ্চয়তায় দিন গুনছেন। ঈদের আনন্দ উদযাপনের আগে তাদের চোখে-মুখে ভেসে উঠছে দুশ্চিন্তার ছায়া।
গাজীপুরের কোন কোন এলাকায় সংকট সবচেয়ে বেশি?
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ভোগড়া, বোর্ডবাজার, টঙ্গী, কোনাবাড়ী এবং শ্রীপুর ও কালিয়াকৈর এলাকায় পোশাক কারখানার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এই এলাকাগুলোতেই বেতন-বোনাস পরিশোধ নিয়ে অনিশ্চয়তা সবচেয়ে তীব্র। শ্রমিকরা জানাচ্ছেন, সময়মতো পাওনা না মিললে ঈদের আগে গ্রামে ফেরা সম্ভব হবে না। পরিবারের জন্য কেনাকাটা, সন্তানের নতুন পোশাক — সব কিছুই থমকে যাবে বেতন-বোনাসের অভাবে।
কতটি কারখানা ও কত শ্রমিক ঝুঁকিতে?
গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মো. আমজাদ হোসাইন জানিয়েছেন, জেলার ৫২টি কারখানায় প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার শ্রমিক ঈদ বোনাস পাওয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকিতে রয়েছেন। এর মধ্যে ২৭টি কারখানাকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে কিছু কারখানায় ইতোমধ্যে বোনাস পরিশোধের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।
কেন এই সংকট তৈরি হয়েছে?
পোশাক শিল্পের মালিকপক্ষ বলছেন, একাধিক কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। রপ্তানি আদেশ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া, জ্বালানি তেল ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি, এবং সামগ্রিক আর্থিক সংকট — এই তিনটি কারণ একত্রে কারখানার নগদ প্রবাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। ফলে অনেক মালিক ঈদের আগেই শ্রমিকদের পুরো পাওনা মেটাতে পারবেন কি না, সে ব্যাপারে নিশ্চিত নন।
শ্রমিকদের দাবি ও প্রত্যাশা
কারখানায় নিয়মিত কাজ করা শ্রমিকরা বলছেন, তারা সারা বছর পরিশ্রম করেছেন — ঈদের সময় পরিবার নিয়ে একটু আনন্দ করার অধিকার তাদের রয়েছে। শুধু বেতন-বোনাস নয়, সময়মতো ছুটি পাওয়াটাও তাদের বড় দাবি। শ্রমিকরা স্পষ্ট করে বলছেন — ঈদের আনন্দ তাদের কাছে মানে বাড়ি ফেরা, পরিবারের সঙ্গে থাকা এবং সেটা নিশ্চিত করতে হলে আগে নিশ্চিত হতে হবে বকেয়া পরিশোধ।
প্রশাসন ও শিল্প পুলিশের তৎপরতা
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মাঠে সক্রিয় রয়েছে শিল্প পুলিশ। যেসব কারখানায় বেতন-বোনাস পরিশোধ নিয়ে জটিলতা রয়েছে, সেগুলো আলাদাভাবে চিহ্নিত করে মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে। জেলা প্রশাসনও একাধিক বৈঠক করেছে। শ্রমিকদের পাওনা নিয়ে যাতে কোনো ধরনের অস্থিরতা বা সহিংসতা না ঘটে, সে লক্ষ্যে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রয়েছে।
ব্যাংক ও সরকারের ভূমিকা কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ?
গাজীপুরের শিল্প উদ্যোক্তা ও বিজিএমইএ সদস্য মো. সালাউদ্দিন চৌধুরী বলেছেন, সরকার ইতোমধ্যে শিল্পমালিকদের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে। এখন সরকারের নির্দেশনা মেনে ব্যাংকগুলো যদি দ্রুত অর্থের জোগান দেয়, তাহলে নিবন্ধিত কারখানার শ্রমিকরা ঈদের আগেই বেতন-বোনাস হাতে পেয়ে হাসিমুখে বাড়ি ফিরতে পারবেন। ব্যাংকিং সহায়তাই এখন এই সংকট সমাধানের মূল চাবিকাঠি।
প্রতি বছরের পুনরাবৃত্তি: কবে মিলবে স্থায়ী সমাধান?
উল্লেখ্য, ঈদের আগে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে বেতন-বোনাস ইস্যুতে চাপ তৈরি হওয়া প্রায় প্রতিবছরেরই ঘটনা। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য দরকার সুষ্ঠু শ্রম নীতি, কারখানা মনিটরিং জোরদার করা এবং শ্রমিকদের মজুরি তহবিল সুরক্ষার জন্য কার্যকর আইনি কাঠামো। না হলে প্রতিটি ঈদের আগে একই সংকট নতুন রূপে ফিরে আসবে।
উপসংহার
গাজীপুরের লক্ষাধিক পোশাক শ্রমিকের কাছে ঈদের আনন্দ মানে কেবল উৎসব নয় — এটা তাদের ন্যায্য পাওনার স্বীকৃতি। রপ্তানি সংকট বা আর্থিক চাপ যা-ই হোক না কেন, শ্রমিকদের ঘাম-ঝরানো শ্রমের বিনিময়ে তাদের বেতন ও বোনাস সময়মতো নিশ্চিত করা মালিকপক্ষ ও রাষ্ট্র উভয়েরই নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব। প্রশাসন, মালিকপক্ষ ও ব্যাংকিং খাতের সম্মিলিত উদ্যোগেই কেবল এই সংকটের সমাধান সম্ভব।

