দেশের বিদ্যুৎ খাতে আবারও বড় ধাক্কা আসতে পারে সাধারণ মানুষের জীবনে। ছয়টি বিতরণ কোম্পানি প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম সর্বোচ্চ ২ টাকা ৫ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। এই প্রস্তাবকে ঘিরে দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞ, ভোক্তা প্রতিনিধি এবং শিল্প মালিকরা একযোগে এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছেন।
বিইআরসির গণশুনানিতে কী হলো?
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে এক গণশুনানির আয়োজন করে। বিইআরসি চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই শুনানিতে গ্রাহক প্রতিনিধি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিল্পোদ্যোক্তাসহ বিভিন্ন পক্ষ তাদের মতামত উপস্থাপন করেন। উপস্থিত প্রায় সকলেই এই মুহূর্তে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন।
কোন কোম্পানি কত টাকা বাড়াতে চায়?
ছয়টি বিতরণ কোম্পানির প্রস্তাব নিচে তুলে ধরা হলো:
- পিডিবি — প্রতি ইউনিটে ৮৫ পয়সা বৃদ্ধির প্রস্তাব
- আরইবি — প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ৭৭ পয়সা বৃদ্ধির প্রস্তাব
- ডিপিডিসি — প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ৫৪ পয়সা বৃদ্ধির প্রস্তাব
- ডেসকো — প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ৯৮ পয়সা বৃদ্ধির প্রস্তাব
- ওজোপাডিকো — প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ৩৯ পয়সা বৃদ্ধির প্রস্তাব
- নেসকো — প্রতি ইউনিটে ২ টাকা ৫ পয়সা বৃদ্ধির প্রস্তাব
তবে বিইআরসির কারিগরি দল মনে করছে, গড়ে প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ২৫ পয়সা বাড়ানো যেতে পারে। তবে এই সুপারিশও শুনানিতে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে।
লাইফলাইন গ্রাহকদের সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ
বর্তমানে দেশে মোট বিদ্যুৎ গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি ৯৮ লাখ। এর মধ্যে আবাসিক গ্রাহক ৪ কোটি ২৫ লাখেরও বেশি। শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী তথাকথিত লাইফলাইন বা দরিদ্র গ্রাহকের সংখ্যা ১ কোটি ৭৮ লাখ ৮২ হাজারেরও বেশি।
পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) প্রস্তাব করেছে, ৫০ ইউনিট পর্যন্ত একটি ধাপ রেখে বাকি লাইফলাইন সুবিধা অর্থাৎ ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত স্বল্পমূল্যের সুবিধা তুলে নেওয়া হোক। এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছেন বিভিন্ন পক্ষ।
কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স দাবি জানান, লাইফলাইন গ্রাহকদের সুবিধা বাতিল নয়, বরং শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিনামূল্যে সরবরাহ করতে হবে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিতরণ কোম্পানিগুলোর হিসাবে গলদ রয়েছে এবং সেই সুযোগে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের পকেট থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
ক্যাপাসিটি চার্জ: কোটি কোটি টাকার অপচয়
শুনানিতে সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হয়েছে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে না চালিয়েও বিশাল অঙ্কের ক্যাপাসিটি চার্জ প্রদানের বিষয়টি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোসাহিদা সুলতানা জানান, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) প্রতি বছর বিভিন্ন বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানিকে প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে পরিশোধ করছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, পাকিস্তান যদি বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ট্যারিফ কমাতে পারে, তাহলে বাংলাদেশ কেন পারছে না।
বাংলাদেশ স্টিলমিল ম্যানুফ্যাকচারার অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি জাহাঙ্গীর আলম সতর্ক করেন, জাতীয় বাজেটের প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা যদি শুধু ক্যাপাসিটি চার্জেই চলে যায়, তাহলে দেশের অর্থনীতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? তিনি আরও বলেন, উচ্চচাপের বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য স্টিলমিল মালিকরা নিজেরাই শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে সাবস্টেশন স্থাপন করেছেন। সেক্ষেত্রে তাদের কাছ থেকে আলাদাভাবে ডিমান্ড চার্জ আদায় করা যুক্তিসঙ্গত নয়।
দুর্নীতি ও সিস্টেম লস বন্ধের দাবি
ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, বিদ্যুৎ খাতে সিস্টেম লস, দুর্নীতি ও অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পে অর্থের অপচয় এখনো বন্ধ হয়নি। এই অপচয় বন্ধ না করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। তিনি আরও জানান, গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং এখনো নিত্যসঙ্গী। সেক্ষেত্রে গ্রামীণ গ্রাহকদের কাছ থেকে ডিমান্ড চার্জ রাখার কোনো নৈতিক ভিত্তি নেই।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. জেবুন্নেসাও বিদ্যুৎ খাতের গভীরে থাকা অনিয়মের কথা উল্লেখ করে বলেন, এসব দূর করতে পারলে সরকারের বিপুল অর্থ সাশ্রয় সম্ভব এবং বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়েও পরিস্থিতি সামলানো যাবে।
শিল্প খাতে বিরূপ প্রভাবের আশঙ্কা
করোনা পরবর্তী অর্থনৈতিক ধাক্কা এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি দেশের শিল্প খাত। এই পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি পেলে বিশেষত স্টিলমিলসহ ভারী শিল্পগুলো মারাত্মক সংকটে পড়বে বলে আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন উদ্যোক্তারা। শিল্প সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এখন দাম বাড়ানো হলে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে, যা কর্মসংস্থানের উপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বিইআরসির অবস্থান ও পরবর্তী পদক্ষেপ
গণশুনানি শেষে বিইআরসির চেয়ারম্যান জানান, সকলের বক্তব্য রেকর্ড করা হয়েছে। সমস্ত দিক পর্যালোচনা করে কমিশন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। তবে শুনানিতে উপস্থিত বিশেষজ্ঞ ও গ্রাহক প্রতিনিধিরা স্পষ্ট বার্তা দিয়ে গেছেন — দুর্নীতি ও অপচয় বন্ধ না করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে তা হবে সাধারণ মানুষের উপর চাপিয়ে দেওয়া এক অসহনীয় বোঝা।
আরও পড়ুন: বিদ্যুতের দাম ২১ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব পিডিবির — গণশুনানিতে তীব্র বিরোধিতা

