হজ মৌসুমে আল্লাহর ঘরের মেহমানদের সেবা করার চেয়ে বড় সৌভাগ্য আর কী হতে পারে? সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সুযোগ এনে দিয়েছে সৌদি আরব সরকার। ২০২৬ সালের হজ মৌসুম উপলক্ষে মদিনার ঐতিহাসিক মসজিদে নববীতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যোগ দেওয়ার আবেদন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ইসলামের দ্বিতীয় পবিত্রতম মসজিদে সরাসরি সেবামূলক কাজে অংশ নেওয়ার এই বিরল সুযোগ কাজে লাগাতে পারেন সৌদি নাগরিক ও বৈধ প্রবাসীরা।
কোন সংস্থা এই কর্মসূচি পরিচালনা করছে?
মসজিদে নববীর ধর্মীয় বিষয়ক জেনারেল প্রেসিডেন্সি (General Presidency for Religious Affairs at the Prophet’s Mosque) এই বিশেষ স্বেচ্ছাসেবী কর্মসূচির আয়োজন করেছে। উদ্যোগটির নাম রাখা হয়েছে — “যে কেউ নেক কাজে স্বেচ্ছাসেবী”। প্রতি বছর হজ মৌসুমে বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমান মক্কা ও মদিনায় সমবেত হন। এই বিশাল জনস্রোতকে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করতে এবং হজযাত্রীদের ইবাদতকে আরও নির্বিঘ্ন করতে সৌদি কর্তৃপক্ষ দক্ষ ও আন্তরিক স্বেচ্ছাসেবীদের সহায়তা নিয়ে থাকে।
কারা আবেদন করতে পারবেন?
এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে দুটি শ্রেণির মানুষের জন্য —
- সৌদি আরবের নাগরিক — জাতীয় পরিচয়পত্রধারী যেকোনো সৌদি নাগরিক।
- বৈধ ইকামাধারী প্রবাসী — সৌদি আরবে বৈধভাবে বসবাসরত যেকোনো বিদেশি নাগরিক যাঁর সক্রিয় ইকামা রয়েছে।
আবেদনের একটি বিশেষ শর্ত হলো, আবেদনকারীর অবশ্যই সক্রিয় আবশার (Absher) অ্যাকাউন্ট থাকতে হবে।
যাঁরা আবেদন করতে পারবেন না
এটি জানা অত্যন্ত জরুরি যে —
- হজের ভিসায় সৌদি আরবে আগত হজযাত্রীরা এই পদের জন্য আবেদনের যোগ্য নন।
- বিদেশ থেকে সরাসরি কোনো ব্যক্তি এই কর্মসূচিতে আবেদন করতে পারবেন না।
অর্থাৎ, আবেদনকারীকে অবশ্যই সৌদি আরবের ভেতরে অবস্থানরত এবং বৈধ পরিচয়পত্রের অধিকারী হতে হবে।
মসজিদে নববীতে কোন কোন ক্ষেত্রে সেবা দেওয়ার সুযোগ আছে?
নির্বাচিত স্বেচ্ছাসেবীরা মোট ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ সেবা বিভাগে কাজ করার সুযোগ পাবেন। প্রতিটি বিভাগই মুসল্লিদের আধ্যাত্মিক ও ব্যবহারিক অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে পরিচালিত।
১. ধর্মীয় গাইডেন্স ও পরামর্শ সেবা
হজযাত্রী ও দর্শনার্থীদের ইসলামিক বিধিবিধান, হজের আমল এবং মসজিদ সংক্রান্ত যেকোনো ধর্মীয় প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করা।
২. নামাজের কাতার সুশৃঙ্খল রাখা
লক্ষাধিক মুসল্লির উপস্থিতিতে নামাজের সময় কাতার সঠিকভাবে গঠন করা এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সহায়তা করা।
৩. ডিজিটাল স্ক্রিন ও ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবস্থাপনা
মসজিদে নববীর অভ্যন্তরে স্থাপিত ডিজিটাল তথ্যপ্রযুক্তি সরঞ্জাম পর্যবেক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও সুচারু পরিচালনায় সহযোগিতা করা।
৪. বহুভাষিক অনুবাদ সেবা
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মুসল্লিরা ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় কথা বলেন। তাঁদের সঙ্গে সাবলীল যোগাযোগ স্থাপনের জন্য দোভাষী ও অনুবাদ সেবা প্রদান করা।
৫. সচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রম
হজযাত্রীদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও আচরণবিধি সম্পর্কিত সচেতনতামূলক তথ্য মাঠ পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া।
৬. দর্শনার্থীদের সাধারণ সহায়তা সেবা
মসজিদে প্রবেশ, বের হওয়া, স্থান খোঁজা বা যেকোনো প্রয়োজনে মুসল্লিদের সহায়তা করা এবং তাঁদের অভিজ্ঞতাকে যতটা সম্ভব সহজ ও আরামদায়ক করে তোলা।
কীভাবে আবেদন করবেন — ধাপে ধাপে নির্দেশিকা
আবেদন প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ অনলাইনে সম্পন্ন করতে হবে। নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন —
ধাপ ১: সৌদি আরবের National Volunteer Work Platform ওয়েবসাইট nvg.gov.sa-তে প্রবেশ করুন।
ধাপ ২: সৌদি ন্যাশনাল আইডি অথবা ইকামা নম্বর দিয়ে লগইন করুন।
ধাপ ৩: সার্চ বা ক্যাটাগরি অপশন থেকে “Religious” বা ধর্মীয় বিভাগটি নির্বাচন করুন।
ধাপ ৪: তালিকা থেকে “General Presidency for Religious Affairs at the Prophet’s Mosque” অপশনটি খুঁজে বের করুন।
ধাপ ৫: আপনার পছন্দ ও যোগ্যতা অনুযায়ী নির্দিষ্ট স্বেচ্ছাসেবী পদে নিবন্ধন সম্পন্ন করুন।
কেন এই সুযোগটি অমূল্য?
মসজিদে নববী শুধু একটি মসজিদ নয় — এটি ইসলামের ইতিহাস, আধ্যাত্মিকতা ও পবিত্রতার এক অনন্য কেন্দ্র। হজ মৌসুমে এখানে প্রতিদিন লক্ষাধিক মানুষের সমাগম হয়। এই বিশাল আয়োজনে একজন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে অংশ নেওয়া মানে শুধু কাজ করা নয় — এটি একটি আত্মিক সফর।
এই কর্মসূচির মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা —
- সরাসরি হজ ব্যবস্থাপনার ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা লাভ করবেন
- বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মুসলমানদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন
- নেতৃত্ব ও যোগাযোগ দক্ষতা উন্নত করতে পারবেন
- সর্বোপরি, আল্লাহর মেহমানদের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করে অফুরন্ত সওয়াব অর্জন করতে পারবেন
ইসলামিক ঐতিহ্য অনুযায়ী, মসজিদে নববীতে একটি নামাজ আদায় করা অন্য যেকোনো মসজিদে এক হাজার নামাজের সমতুল্য (মসজিদুল হারাম ব্যতীত)। সেই পবিত্র স্থানে সেবাদানকারী হিসেবে থাকার মর্যাদা নিঃসন্দেহে অসাধারণ।
শেষ কথা
হজযাত্রীদের সেবা করার এই মহৎ সুযোগটি সীমিত। তাই দেরি না করে আজই nvg.gov.sa-তে গিয়ে আবেদন সম্পন্ন করুন। সৌদি আরবে বসবাসরত বাংলাদেশিসহ সকল প্রবাসী মুসলমানদের জন্য এটি জীবনের অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা হতে পারে। নিজে আবেদন করুন এবং পরিচিতদের মাঝেও এই খবর ছড়িয়ে দিন — কারণ ভালো কাজের তথ্য শেয়ার করাও একটি সদকা।
আরও পড়ুন: মেসেজে ‘কবুল’ লিখলে কি বিয়ে হয়ে যায়? ইসলামি শরিয়াহ কী বলে জেনে নিন

