বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের চিত্র এখন এতটাই ভয়াবহ যে, প্রতিটি পরিসংখ্যান দেশের বিবেককে নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। একের পর এক শিশু হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনা প্রমাণ করছে — বিদ্যমান আইনি ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা এখনো যথেষ্ট কার্যকর নয়। রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসার নৃশংস ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা যখন দেশজুড়ে আলোড়ন তুলেছে, তখন পরিসংখ্যানের আড়ালে লুকিয়ে থাকা শত শত অজানা শিশুর কান্না যেন আরও জোরালো হয়ে উঠছে।
২০ মাসে ৬৪৩ শিশু নিহত: মানবাধিকার সংস্থার চমকে দেওয়া তথ্য
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)-এর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র ২০ মাসে সারা দেশে ৬৪৩ জন শিশু ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতি মাসে ৩২ জনেরও বেশি শিশু এভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে — যা নিঃসন্দেহে জাতীয় সংকটের পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এই সংখ্যাকে আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:
- ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ৪৭৮ জন শিশু নিহত হয়েছে।
- ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই নিহত হয়েছে ২০৩ জন শিশু।
- একই সময়ে ৫৮০ জন শিশু ধর্ষণ এবং ৩১৮ জন শিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে।
এছাড়া ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত মোট এক হাজার ৮৯০ জন শিশু নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পাঁচ বছরে দুই হাজারেরও বেশি শিশু ধর্ষণ: আসকের পরিসংখ্যান
বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর তথ্য অনুযায়ী, বিগত পাঁচ বছরে (২০২১–২০২৫) দেশে মোট ২ হাজার ৩৩৯টি শিশু ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। বছরওয়ারি বিভাজন করলে দেখা যায়:
| বছর | ধর্ষণের ঘটনা | ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা |
|---|---|---|
| ২০২১ | ৭৭৪ | ১৮৫ |
| ২০২২ | ৫৬১ | ১০১ |
| ২০২৩ | ৩১৪ | ৮৫ |
| ২০২৪ | ২৩৪ | ৬৬ |
| ২০২৫ | ৪৫৬ | ১৬৭ |
| ২০২৬ (এপ্রিল পর্যন্ত) | ৯৪ | ৩৪ |
পাঁচটি পূর্ণাঙ্গ বছরের (২০২১–২০২৫) গড় হিসাব করলে দেখা যাচ্ছে, প্রতি বছর গড়ে ৪৪৯টি শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে এবং প্রতি বছর গড়ে ১২১ জন শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে ঘটনার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম দেখালেও ২০২৫ সালে হঠাৎ ফের সংখ্যা বাড়ার প্রবণতা একটি উদ্বেগজনক সংকেত।
রামিসা হত্যাকাণ্ড: বিক্ষোভের আগুনে পুড়ছে দেশ
সবচেয়ে সাম্প্রতিক ও আলোচিত ঘটনাটি ঘটেছে রাজধানীর মিরপুর-পল্লবী এলাকায়। শিশু শিক্ষার্থী রামিসাকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। পুলিশ মূল আসামি সোহেল ও তার স্ত্রীকে ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। প্রধান আসামি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ নিশ্চিত করেছেন যে, সম্ভাব্য সংক্ষিপ্ততম সময়ের মধ্যে মামলার তদন্ত শেষ করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হবে। কিন্তু দেশবাসীর প্রশ্ন — শুধু গ্রেপ্তার ও চার্জশিট নয়, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা কি সম্ভব হবে?
বিচারহীনতার সংস্কৃতি: অপরাধ বাড়ার মূল কারণ
বিশেষজ্ঞ, মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীরা একমত যে, শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধির পেছনে বিচারহীনতার সংস্কৃতি সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে। এই সংকটের বহুমাত্রিক কারণ রয়েছে:
বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের আইনজীবী ফাহমিদা আক্তারের মতে, আইনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন না হওয়া মামলার জট সৃষ্টির অন্যতম প্রধান কারণ। তদন্ত কর্মকর্তারা সঠিক সময়ে মেডিক্যাল রিপোর্ট পান না, পাশাপাশি তাদের একই সাথে অন্যান্য সাধারণ দায়িত্বও পালন করতে হয়।
সাক্ষী হাজির করার সংকট
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী জানান, মামলায় সবচেয়ে বড় দুটি বাধা হলো — পুলিশ রিপোর্ট সময়মতো জমা না পড়া এবং সাক্ষীদের আদালতে উপস্থিত করতে না পারা। অনেক ক্ষেত্রে সাক্ষীরা ভয় বা চাপের কারণে মুখ খুলতে রাজি হন না।
দরিদ্র পরিবারের আইনি লড়াইয়ের অসামর্থ্য
অধিকাংশ ভুক্তভোগী পরিবার অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদী আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। ফলে আসামিপক্ষ আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে বারবার পার পেয়ে যায়।
আলোচনা থেমে যায়, মামলা থেকে যায়
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ঘটনা ভাইরাল হলে কিছুদিনের জন্য হইচই হয়, কিন্তু আলোচনা থিতিয়ে আসার সাথে সাথে মামলাটিও হিমাগারে চলে যায়। মাগুরার আলোচিত শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলা এর জ্বলন্ত উদাহরণ — এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেই পরিবার এখনো চূড়ান্ত বিচার পায়নি।
ঢাকার আদালতে তিন হাজার মামলার বোঝা
আদালতের জিআর শাখার তথ্য বলছে, শুধু ঢাকার বিভিন্ন আদালতেই শিশু ধর্ষণসংক্রান্ত প্রায় তিন হাজার মামলা বিচারের অপেক্ষায় ঝুলে আছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ঢাকার ৫০টি থানায় সব ধরনের ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে নতুন মামলা হয়েছে কমপক্ষে ২১৪টি।
মামলার এই বিশাল স্তূপ একদিকে যেমন বিচার বিভাগের উপর অসহনীয় চাপ তৈরি করছে, অন্যদিকে ভুক্তভোগী শিশু ও তাদের পরিবারের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির পথ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে।
নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতন: সামগ্রিক চিত্র আরও উদ্বেগজনক
এইচআরএসএসের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে দেশে দুই হাজার ৬১৭ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে:
- ১,০১৬ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৫৫৪ জনই (৫৪%) ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু।
- ২৩০ জন গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন।
- ধর্ষণের পর ৩৩ জনকে হত্যা করা হয়েছে।
- ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ১১ জন নারী আত্মহত্যা করেছেন।
- ৫০৪ জন যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, যাদের মধ্যে ২৭০ জনই শিশু।
শুধু ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসেই কমপক্ষে ২৯৪ জন নারী ও কন্যাশিশু বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন — যার মধ্যে ধর্ষণের শিকার ৬৮ জনের ৪৪ শতাংশই শিশু ও কিশোরী।
সমাধানের পথ কোথায়? বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য
এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম স্পষ্টভাবে বলেছেন, ঘটনার পর ঘটনা প্রমাণ করছে যে শিশু সুরক্ষায় বিদ্যমান ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অকার্যকর। পরিস্থিতি পরিবর্তনে তিনি নিম্নলিখিত পদক্ষেপের উপর জোর দিয়েছেন:
- দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা: বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে শিশু নির্যাতন মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে হবে।
- দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি: অপরাধীদের দ্রুত ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত হলে সম্ভাব্য অপরাধীদের মধ্যে ভীতি তৈরি হবে।
- তদন্ত বিভাগের সক্ষমতা বৃদ্ধি: তদন্ত কর্মকর্তাদের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ এবং ফরেনসিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
- ভুক্তভোগী পরিবারকে আইনি সহায়তা: বিনামূল্যে সরকারি আইনজীবী সেবা আরও কার্যকর ও সহজলভ্য করতে হবে।
- সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি: স্কুল, মসজিদ ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শিশু সুরক্ষা বিষয়ে গণসচেতনতা তৈরি করতে হবে।
আইনজীবী ফাহমিদা আক্তার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, মাগুরার আছিয়া হত্যাকাণ্ড ও পল্লবীর রামিসা হত্যা মামলা উভয়েরই বিচারিক আদালত ও হাইকোর্ট উভয় স্তরে দ্রুততার সাথে নিষ্পত্তি করে রাষ্ট্র একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।
উপসংহার: বিচারের দাবি এখন জাতীয় দাবি
শিশু রামিসার বাবা-মায়ের আর্তনাদ শুধু একটি পরিবারের কান্না নয় — এটি হাজারো ভুক্তভোগী পরিবারের সম্মিলিত চিৎকার। ২০ মাসে ৬৪৩ শিশুর মৃত্যু, পাঁচ বছরে ২ হাজারেরও বেশি ধর্ষণের ঘটনা এবং আদালতে ঝুলে থাকা হাজার হাজার মামলা — এই সংখ্যাগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয়, এগুলো হলো রাষ্ট্রের ব্যর্থতার দলিল।
শিশু সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে বিচারহীনতার এই সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে হবে। প্রতিটি মামলার দৃষ্টান্তমূলক ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত না হলে এই ভয়াবহ পরিসংখ্যান থামানো সম্ভব নয়। রামিসার মতো আরও কোনো শিশু যেন এভাবে প্রাণ না হারায় — এটাই এখন সমগ্র জাতির প্রত্যাশা।
আরও পড়ুন: বিদ্যুতের দাম ২১ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব পিডিবির — গণশুনানিতে তীব্র বিরোধিতা

