মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন এক উত্তেজনার জন্ম হয়েছে। এবার মুখোমুখি দুই ঐতিহ্যবাহী মিত্র — মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক কৌশল ও কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে দুই নেতার মধ্যে মতবিরোধ এখন এতটাই প্রকট যে, তাদের সাম্প্রতিক ফোনালাপ রীতিমতো উত্তপ্ত তর্কযুদ্ধে পরিণত হয়েছে বলে জানা গেছে।
এক ঘণ্টার ফোনালাপ, একগুচ্ছ বিস্ফোরক মতভেদ
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী এক টেলিফোন আলোচনায় ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু ইরান প্রশ্নে পরস্পরের বিপরীত অবস্থান নিয়ে কথা বলেন। সেই আলোচনায় সুর ছিল তীক্ষ্ণ, মেজাজ ছিল উত্তপ্ত।
ঘটনার সূত্রপাত সপ্তাহ দুয়েক আগে। ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে জানিয়েছিলেন, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন বাহিনী ‘অপারেশন স্লেজহ্যামার’ নামে একটি বড় সামরিক হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইসরায়েলের দিক থেকে এই খবর ছিল স্বস্তির। কিন্তু সেই স্বস্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো প্রভাবশালী উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর কূটনৈতিক চাপের মুখে ট্রাম্প হামলা স্থগিত রাখার ঘোষণা দেন।
এই সিদ্ধান্ত নেতানিয়াহুকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। ফোনালাপে তিনি সরাসরি বলেন, এই সিদ্ধান্ত ‘ভুল’ এবং এটি ইরানকে আরও সময় ও সুযোগ দেবে। তিনি ট্রাম্পকে পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়ার জন্য জোর চাপ দেন।
কূটনীতি বনাম সামরিক শক্তি: দুই নেতার দুই দর্শন
এই বিরোধের মূলে রয়েছে দুটি মৌলিকভাবে ভিন্ন কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি। নেতানিয়াহুর অবস্থান: ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বরাবরই বিশ্বাস করেন, ইরানকে কেবল কঠোর সামরিক চাপের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তাঁর দৃষ্টিতে, ইরানের সঙ্গে যেকোনো আলোচনা বা বিলম্বের নীতি তেহরানকে কেবল পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ দেয়। ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের ভাষায়, “ট্রাম্প যেখানে একটি কূটনৈতিক চুক্তির দিকে ঝুঁকছেন, নেতানিয়াহু সেখানে সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু প্রত্যাশা করছিলেন।”
ট্রাম্পের অবস্থান: মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই মুহূর্তে আলোচনার পথ খোলা রাখতে চাইছেন। সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প জানান, ইরানের সঙ্গে আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তাঁর কথায়, “হয় আমরা একটি চুক্তিতে উপনীত হব, নয়তো এমন কিছু করতে হবে যা আমরা কেউ চাই না। আশা করি সেই পরিস্থিতি আসবে না।”
এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট, ট্রাম্প অন্তত এই মুহূর্তে সংঘাত এড়িয়ে একটি কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা উন্মুক্ত রাখতে চাইছেন।
ইসরায়েলি শিবিরে গভীর হতাশা
ট্রাম্পের এই নীতিবদল ইসরায়েলের শাসকগোষ্ঠীতে তীব্র অস্বস্তি তৈরি করেছে। নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ মহল মনে করছে, এই পিছু হটা ইরানের হাতকে আরও শক্তিশালী করছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের নিরাপত্তাকে হুমকিতে ফেলছে।
ইসরায়েলের জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা ইরানের চলমান কূটনৈতিক তৎপরতাকে নিছক ‘সময়ক্ষেপণের কৌশল’ হিসেবে দেখছেন। তাদের বিশ্লেষণে, ইরান আলোচনার ভান করে নিজেদের পারমাণবিক ও সামরিক সক্ষমতা আরও বিস্তার করার সুযোগ নিচ্ছে। এই কারণে তারা যত দ্রুত সম্ভব সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে জোর দিচ্ছেন।
আঞ্চলিক কূটনীতির নতুন সমীকরণ
এই উত্তেজনার মাঝে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক শক্তিগুলো সক্রিয় ভূমিকায় নামছে। পাকিস্তানসহ বেশ কয়েকটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতার নতুন কাঠামো তৈরিতে উদ্যোগী হয়েছে। উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো, বিশেষত কাতার ও সৌদি আরব, ইতিমধ্যেই মার্কিন যুদ্ধবিরতির পেছনে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে।
এই আঞ্চলিক কূটনীতির উদ্দেশ্য একটাই — উপসাগরীয় অঞ্চলে একটি সর্বাত্মক যুদ্ধের সূচনা ঠেকানো, যা গোটা বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে বিপন্ন করতে পারে।
মার্কিন-ইসরায়েল সম্পর্কে নতুন ফাটল?
বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান প্রশ্নে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর এই মতবিরোধ নতুন নয়। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক সামরিক আধিপত্য এবং ইসরায়েলের অস্তিত্বগত নিরাপত্তা প্রশ্নে দুই দেশের কৌশলগত স্বার্থ সবসময় হুবহু মিলে না।
তবে এই মুহূর্তে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই বিরোধ প্রকাশ্যে আসা এবং এর তীব্রতা। দশকের পর দশক ধরে গড়ে ওঠা মার্কিন-ইসরায়েল কৌশলগত অংশীদারিত্বে এই ফাটল মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক সমীকরণকে নতুনভাবে সাজিয়ে দিতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
ট্রাম্প যদি কূটনৈতিক পথে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে পারেন, তাহলে তা তাঁর জন্য বড় কূটনৈতিক জয় হবে। কিন্তু সেটি ইসরায়েলের জন্য কতটা গ্রহণযোগ্য হবে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
সামনের দিনগুলো কোন পথে?
পরিস্থিতি এখন সন্ধিক্ষণে। ইরান আলোচনায় বসেছে ঠিকই, কিন্তু তাদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর কার্যক্রম থেমে নেই। যুক্তরাষ্ট্র একটি চুক্তির স্বপ্ন দেখছে, ইসরায়েল দেখছে বিপদের ছায়া। আর এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির টানাপোড়েনে মধ্যপ্রাচ্য আরও একটি বিস্ফোরণের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে।
আগামী সপ্তাহগুলোতে ট্রাম্পের কূটনৈতিক উদ্যোগ কোনো ফল দেয় কিনা, নাকি সামরিক চাপের পথে ফিরে আসতে হয় — সেটাই নির্ধারণ করবে মধ্যপ্রাচ্যের আগামী অধ্যায়।
আরও পড়ুন: পশ্চিমবঙ্গে কোরবানির আগে গরু বেচাকেনায় নিষেধাজ্ঞা: বিতর্ক ও বিক্ষোভে উত্তপ্ত রাজ্য

