আসছে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে বাংলাদেশের সরকারি চাকুরিজীবীদের জীবনে আসতে চলেছে এক বড় পরিবর্তন। নবম জাতীয় পে স্কেল কার্যকর হওয়ার মধ্য দিয়ে লক্ষ লক্ষ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন ও সুযোগ-সুবিধায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে। শুধু সরাসরি সরকারি কর্মচারীই নন, এবারের পে স্কেলের সুফল পৌঁছাবে আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের কাছেও।
সচিব কমিটির সভায় যে সিদ্ধান্ত হলো
গত ২১ মে ২০২৬, বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে নবম পে স্কেল নির্ধারণে গঠিত সচিব কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন পে স্কেল কার্যকর করার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। সভায় বিভিন্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন কাঠামো পর্যালোচনা করা হয় এবং নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত এই পে স্কেলে তুলনামূলকভাবে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের চেয়ে নিচের স্তরের কর্মচারীরা বেশি সুবিধা পাবেন। এই পদক্ষেপটি মূলত সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান বেতন বৈষম্য কমিয়ে আনার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে।
কারা থাকছেন নবম পে স্কেলের আওতায়
নবম জাতীয় পে স্কেলে বেশ বিস্তৃত পরিসরে কর্মচারীদের অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। নিচে যাদের কথা বলা হয়েছে তারা সকলেই এই স্কেলের আওতাভুক্ত থাকবেন:
- সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী — সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ
- শিক্ষক — সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সকল পর্যায়ের শিক্ষক
- পুলিশ বাহিনী — সকল র্যাংকের পুলিশ সদস্য
- স্বাস্থ্যকর্মী — সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মীরা
- মাঠ প্রশাসন — জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী
- বিচার বিভাগ — বিচারিক সেবায় নিযুক্ত সকল কর্মচারী
- আধা-স্বায়ত্তশাসিত ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মী — সমন্বিত নির্দেশনার আওতায়
এটি নিঃসন্দেহে একটি ব্যাপক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পে স্কেল, যা দেশের সরকারি সেবা খাতের বিশাল অংশকে একই ছাদের নিচে আনার প্রচেষ্টা।
আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের জন্য বিশেষ সুখবর
এবারের পে স্কেলের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হলো আধা-স্বায়ত্তশাসিত ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের অন্তর্ভুক্তি। এতদিন এই প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মীরা সরকারি পে স্কেলের সুনির্দিষ্ট কাঠামো থেকে অনেকটা বাইরে ছিলেন। কিন্তু এবার সরকার একটি সমন্বিত নির্দেশনা জারি করার পরিকল্পনা নিয়েছে, যার মাধ্যমে এই কর্মীরাও নতুন পে স্কেল অনুযায়ী বেতন ও সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট গাইডলাইনের আওতায় আসবেন।
এই পদক্ষেপ এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ করবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
পেনশন সুবিধায় আসছে যুগান্তকারী পরিবর্তন
নবম পে স্কেল ২০২৬-এ শুধু বেতন বৃদ্ধিই নয়, পেনশন সুবিধার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের সংস্কারের প্রস্তাব করা হয়েছে। সচিব কমিটির সভায় আলোচিত প্রস্তাব অনুযায়ী:
- যেসব পেনশনার বর্তমানে কম পরিমাণে পেনশন পাচ্ছেন, তাদের পেনশন ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করার প্রস্তাব রয়েছে।
- বিশেষভাবে যারা মাসে ২০,০০০ টাকার নিচে পেনশন পাচ্ছেন, তারা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন।
- পেনশনারদের জীবনমান উন্নয়নকে এই সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে রাখা হয়েছে।
এই প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদের একটি বড় অংশ নতুনভাবে আর্থিক স্বস্তি পাবেন।
বেতন বৈষম্য কমানোই মূল লক্ষ্য
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নবম পে স্কেলের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো গ্রেডভিত্তিক বেতন বৈষম্য কমিয়ে আনার উদ্যোগ। বাংলাদেশের সরকারি চাকরিতে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ ও নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেতনের মধ্যে বিস্তর ব্যবধান বিদ্যমান। এই ব্যবধান কমিয়ে আনতে বিশেষ সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে নতুন এই স্কেলে।
নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন বেশি হারে বাড়ানো হলে তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে বিশ্লেষকরা মত দিচ্ছেন।
১ জুলাই ২০২৬-এর মধ্যে বাস্তবায়নের প্রস্তুতি চলছে
সরকার নির্ধারিত সময়সীমা অর্থাৎ আগামী ১ জুলাই ২০২৬-এর মধ্যে নবম পে স্কেল কার্যকর করতে ইতোমধ্যে প্রশাসনিক প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। সচিব কমিটির সিদ্ধান্তগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো কাজ করছে। সংশ্লিষ্টরা আশাবাদী যে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই নতুন পে স্কেলের গেজেট প্রকাশ ও বাস্তবায়ন সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
উপসংহার
নবম জাতীয় পে স্কেল ২০২৬ শুধু একটি বেতন বৃদ্ধির ঘোষণা নয়, এটি সরকারি চাকরিব্যবস্থায় একটি কাঠামোগত সংস্কারের সুযোগ। নিম্ন আয়ের কর্মচারী থেকে শুরু করে পেনশনভোগী, এবং সরাসরি সরকারি চাকরিজীবী থেকে শুরু করে আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মী — সকলের জন্যই এই পে স্কেল নতুন আশার আলো নিয়ে এসেছে। ১ জুলাইয়ের অপেক্ষায় এখন লক্ষ লক্ষ সরকারি কর্মচারী ও তাদের পরিবার।
আরও পড়ুন: বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব: নিম্ন ও মধ্যবিত্তের উপর নতুন চাপ

