ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটা প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকারও বেশি আয় করে নিয়ে যাচ্ছে — অথচ দেশের অর্থনীতিতে তাদের দৃশ্যমান কোনো অবদান নেই। সম্প্রতি রাজধানীতে আয়োজিত একটি উচ্চপর্যায়ের টেলিকম সেমিনারে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে, যা নতুন করে ডিজিটাল অর্থনীতিতে বিদেশি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতার প্রশ্ন সামনে এনেছে।
সেমিনারের পটভূমি ও আয়োজন
গত ১৬ মে, শনিবার রাজধানীর একটি বিশিষ্ট হোটেলে ‘টেলিকম খাতে নতুন সরকারের ভিশন’ শীর্ষক একটি গুরুত্বপূর্ণ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারটি আয়োজন করে টেলিকম অ্যান্ড টেকনোলজি রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (টিআরএনবি)।
সংগঠনের সভাপতি সমীর কুমার দে-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ফকির মাহবুব আনাম। স্বাগত বক্তব্য রাখেন টিআরএনবির সাধারণ সম্পাদক মাসুদুজ্জামান রবি।
মেটার আয়ের হিসাব: ৭০ কোটি ডলারের বিশাল অঙ্ক
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে রবির রেগুলেটরি অ্যান্ড করপোরেট অ্যাফেয়ার্স প্রধান সাহেদ আলম এবং বক্তৃতায় ব্যারিস্টার শাহেদ আলম জানান, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৭ কোটি ৩০ লাখ মানুষ সক্রিয়ভাবে ফেসবুক ব্যবহার করেন।
মেটার নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী, প্রতিটি ব্যবহারকারীর কাছ থেকে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে ১৫ মার্কিন ডলার আয় করে। সেই হিসেবে শুধুমাত্র বাংলাদেশ থেকে মেটার বার্ষিক আয় দাঁড়ায় প্রায় ৭০ কোটি মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৮ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
এই বিশাল অঙ্কের অর্থ দেশ থেকে বের হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু বিনিময়ে কর রাজস্ব বা সরাসরি বিনিয়োগের আকারে দেশের অর্থনীতিতে তেমন কিছু ফিরে আসছে না — এই বিষয়টি নিয়েই বিশেষজ্ঞদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: ৫জি ও এআই গ্রামে পৌঁছানোর লক্ষ্য
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ফকির মাহবুব আনাম জানান, সরকার ইতোমধ্যে ৫জি প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) গ্রামীণ পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত করার লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছে। শুধু শহরকেন্দ্রিক নয়, প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ডিজিটাল সুবিধা নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
পাশাপাশি তিনি জানান, আগামী পাঁচ বছরে টেলিকম ও প্রযুক্তি খাতে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে দেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য বিশাল কর্মক্ষেত্র উন্মুক্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন: ডিজিটাল কর আদায় এখন সময়ের দাবি
সেমিনারে অংশগ্রহণকারী বিশেষজ্ঞরা একমত পোষণ করেন যে, মেটার মতো আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের বাজার ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করলেও ডিজিটাল সেবা কর (Digital Service Tax) বা অন্যান্য নিয়ন্ত্রক কাঠামোর মাধ্যমে তাদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায়ের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)-এর চেয়ারম্যান এমদাদ উল বারী, মোবাইল অপারেটরস সংগঠন এমটব-এর মহাসচিব মোহাম্মদ জুলফিকার, ফিকি-র প্রধান নির্বাহী নুরুল কবীর এবং বুয়েট-এর অধ্যাপক ড. লুৎফা আক্তার সহ আরও অনেকে সেমিনারে বক্তব্য রাখেন।
প্রধানমন্ত্রীর টেলিযোগাযোগ উপদেষ্টা রেহান আসিফ, টেলিটক-এর এমডি নুরুল মাবুদ চৌধুরী এবং বাংলালিংক-এর হেড অব রেগুলেটরি অ্যান্ড করপোরেট অ্যাফেয়ার্স তাইমুর রহমান-ও অনুষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: অন্য দেশ কী করছে?
ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে মেটা, গুগল ও অ্যামাজনের মতো বড় প্রযুক্তি কোম্পানির উপর ডিজিটাল সেবা কর আরোপ করেছে। বাংলাদেশেও এ ধরনের নীতিমালা প্রণয়নের জোরালো দাবি উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ কাঠামো না থাকলে ডিজিটাল অর্থনীতির সুফল দেশেই থাকবে না — প্রবাহিত হয়ে যাবে বিদেশি কর্পোরেট ভল্টে।
উপসংহার: জবাবদিহিতার সময় এসেছে
বাংলাদেশের কোটি কোটি ব্যবহারকারীর তথ্য ও মনোযোগ ব্যবহার করে মেটা যে বিশাল মুনাফা অর্জন করছে, তার বিপরীতে দেশের জন্য ন্যায্য প্রাপ্য নিশ্চিত করা এখন আর বিলম্বের সুযোগ নেই। সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং নীতিনির্ধারকদের সম্মিলিত উদ্যোগেই কেবল এই ডিজিটাল রাজস্ব ফাঁকির সমাধান সম্ভব। মেটার কাছ থেকে ন্যায্য কর আদায় এবং ডিজিটাল বাণিজ্যে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা — এটাই এখন বাংলাদেশের টেলিকম ও প্রযুক্তি খাতের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
আরও পড়ুন: হোয়াটসঅ্যাপ কল রেকর্ড করার সহজ উপায় — Android ও iPhone উভয়েই কাজ করে

