সুরা আদিয়াতের শুরুতে আল্লাহতায়ালা শপথ করে বলেছেন, “শপথ তাদের যারা দীর্ঘশ্বাস তুলে দৌড়ায়, খুরের আঘাতে আগুনের ফুলকি ছড়ায়।” (সুরা আদিয়াত, আয়াত ১-২) এই আয়াতে স্পষ্ট করে বলা হয়নি কারা এই দীর্ঘশ্বাস তুলে দৌড়ায়। তাফসিরকারকদের মধ্যে এ নিয়ে মতভেদ আছে। কেউ বলেছেন, এখানে যুদ্ধের ঘোড়ার কথা বলা হয়েছে। কেউ মনে করেন, এটি উটের প্রসঙ্গ। তবে একদল মুফাসসিরের অভিমত হলো, এখানে আসলে মানুষেরই কথা বলা হয়েছে। কারণ শপথের ঠিক পরেই আল্লাহ মানুষের অকৃতজ্ঞতার বিষয়টি তুলে ধরেছেন—”নিশ্চয় মানুষ তার প্রতিপালকের প্রতি অকৃতজ্ঞ। আর সে নিজেও এ ব্যাপারে সাক্ষী। আর সে সম্পদের লোভে ভীষণ আসক্ত।” (সুরা আদিয়াত, আয়াত ৬-৮)
আজকের পৃথিবীর দিকে চোখ মেলে তাকালে মানুষকেই সেই দীর্ঘশ্বাস তোলা ছুটন্ত ঘোড়ার মতো লাগে। রণক্ষেত্রে ঘোড়া যেমন বেগে ছুটতে ছুটতে শত্রুশিবিরে গিয়ে পড়ে, তেমনিভাবে মানুষও দুনিয়ার মোহে ছুটতে ছুটতে অজান্তেই শয়তানের ফাঁদে, লোভের অন্ধকার জগতে প্রবেশ করে ফেলে। এরপর তার মাথায় ঘুরতে থাকে একটিমাত্র চিন্তা—কীভাবে সম্পদের পরিমাণ বাড়ানো যায়, কীভাবে আরও জমিজমা করা যায়, কীভাবে টাকার পাহাড় গড়া যায়। বাস্তবে এই মানুষ দুনিয়ার মোহে এমনভাবে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে যে তার খেয়ালই থাকে না কখন শৈশব পার হয়ে গেল, কখন যৌবনও শেষ হয়ে এলো, কখন সে মৃত্যুর দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। আসলে খেয়াল থাকার কথাও নয়—ছুটন্ত ঘোড়া কি নিচের মাটির দিকে তাকানোর সময় পায়? যে দুনিয়ার মোহে মানুষ এতটা উন্মত্ত হয়ে ছুটছে, এই দুনিয়া আসলে কেমন, তা নিয়ে প্রিয় নবীজি (সা.) তাঁর সাহাবিদের কী বলেছিলেন, চলুন সেই ঘটনাটি জেনে নেওয়া যাক।
একদিনের কথা। রসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের সঙ্গে বসে দুনিয়ার স্বরূপ নিয়ে আলোচনা করছিলেন। কীভাবে দুনিয়া মানুষকে প্রতারিত করে, কীভাবে সংসারের মায়াজালে আল্লাহর প্রতিনিধি এই মানুষকে জড়িয়ে ফেলে—যুক্তি ও হৃদয়স্পর্শী ভাষায় এসব কথা বলছিলেন তিনি। কথার এক পর্যায়ে নবীজি (সা.) সাহাবিদের বললেন, এতদিন তোমাদের মুখে মুখেই দুনিয়ার ভয়াবহতার কথা শুনিয়েছি, এখন কি তা চোখে দেখতে চাও? চলো আমার সঙ্গে। এরপর সাহাবিদের নিয়ে তিনি মদিনার বাজারের দিকে রওনা হলেন এবং বাজারের পেছনের দিকে চলে গেলেন, যেখানে ময়লা-আবর্জনার বিশাল স্তূপ জমে আছে। সেখানে দাঁড়িয়ে তিনি সাহাবিদের দিকে ফিরে তাকালেন। দুর্গন্ধে সবার মুখ কুঁচকে গেছে, কেউ কেউ নাক চেপে ধরেছেন। নবীজি (সা.) মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কেন নাক চেপে আছ? সাহাবিরা জবাব দিলেন, এখানে দুর্গন্ধ অসহ্য রকমের বেশি। তখন নবীজি (সা.) বললেন, জেনে রাখো, দুনিয়ার দুর্গন্ধ এর চেয়েও বেশি।
এরপর নবীজি (সা.) আবর্জনার স্তূপে পড়ে থাকা একটি মৃত বকরির দিকে ইশারা করে প্রশ্ন করলেন, বাজারে একটি জীবিত বকরির দাম কত হতে পারে? ধরা যাক ১০ টাকা। এখন যদি আমি এই মৃত বকরিটিই তোমাদের কাছে অর্ধেক দামে, মানে ৫ টাকায় বিক্রি করতে চাই, তোমাদের কেউ কি কিনবে?
সাহাবিরা সঙ্গে সঙ্গে বললেন, হুজুর! আপনি একে বিনামূল্যেও দিলে আমরা নিতে রাজি নই। তখন বিশ্বমানবতার শিক্ষক মুহাম্মদ (সা.) বললেন, দুনিয়ার অবস্থাও ঠিক এমনই। যাদের অন্তরে আল্লাহর ভয় আছে, যারা প্রকৃতপক্ষে বুদ্ধিমান, তারা বিনামূল্যে পেলেও এই দুনিয়াকে গ্রহণ করবে না। আফসোস তাদের জন্য, যাদের ব্যাপারে আল্লাহ স্বয়ং বলেছেন যে তারা আখেরাতের বদলে দুনিয়াকে বেছে নেয়। হে আমার সাহাবিরা! তোমরা যে মরা বকরিটি বিনামূল্যেও নিতে চাইছ না, ঠিক এই মূল্যহীন বস্তুটিই কেউ কেউ নিজের সাম্রাজ্য বিক্রি করে কিনে নিচ্ছে। একবার ভেবে দেখো, কতটা বেখবর আর অজ্ঞ হলে মানুষ এভাবে নিজের হাতে নিজের পায়ে কুঠার চালাতে পারে!
প্রিয় পাঠক, আমরাও তো প্রতিদিন দুনিয়ার পেছনে দৌড়াচ্ছি, সংসারের মোহসাগরে ডুবে থেকেও বুঝতে পারছি না আসলে কী হারিয়ে ফেলছি। কী ভয়ংকর ক্ষতি নিজের হাতে ডেকে আনছি। আখেরাত বিক্রি করে দুনিয়া কিনে নিচ্ছি, যখন কথা ছিল এই বাজার থেকেই দুনিয়া বিক্রি করে আখেরাতের পাথেয় কিনব। বিখ্যাত কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাঁর একটি কবিতায় দুনিয়াপূজারী মানুষের এক অসাধারণ চিত্র এঁকেছেন। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে একজন মানুষ নিজের বুকপকেটের সম্পদ আগলে রাখতে রাখতেই তার ইহকাল-পরকাল হারিয়ে ফেলে, অথচ একটু গভীরে হাত দিলেই সে পেত নিজের হৃদয়—এক আশ্চর্য রত্ন, যার সন্ধান সে কখনো করলই না। এমনকি জীবনের শেষ মুহূর্তেও সে বুঝতে পারল না কখন তার জীবনটাই হাতের ফাঁক দিয়ে খসে পড়ে গেছে।
বাস্তবেও তো এমনটাই ঘটছে আমাদের সঙ্গে। বুকপকেটের চিন্তায়, মানে সম্পদ আর ভোগবিলাসের চিন্তায় ব্যস্ত থেকেই আমাদের জীবন কেটে যাচ্ছে। কীভাবে আরও অর্থ উপার্জন করা যায়, আরও একটা বাড়ি বা গাড়ি কীভাবে কেনা যায়—এসব ভাবনায় ডুবে থেকেই দিন পার হচ্ছে। কিন্তু নিজের আত্মাকে চেনার, নিজের অস্তিত্বের প্রকৃত উদ্দেশ্য বোঝার কোনো প্রয়াসই আমরা করছি না। সবচেয়ে নিকটতম সত্তা আল্লাহকে পাওয়ার জন্য কোনো সাধনাই করছি না। এভাবেই অবহেলায় দিন কাটাতে কাটাতে একদিন আচমকা মৃত্যু এসে দরজায় কড়া নাড়ে। হে দুনিয়াবি মানুষ, দুনিয়ার পেছনে ছুটো না, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির পেছনে ছুটো। তাহলে দেখবে দুনিয়াই তোমার পেছনে ছুটে আসছে। অন্যথায় একদিন দেখবে, দুনিয়া তোমাকে এমন এক সর্বনাশের মুখে ফেলে দিয়েছে, যার কোনো ক্ষতিপূরণ আর সম্ভব নয়।
আরও পড়ুন: মসজিদে নববীতে স্বেচ্ছাসেবক হওয়ার সুযোগ ২০২৬ — আবেদন করুন এখনই

