ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাইয়ে একটি রহস্যজনক ঘটনায় একই পরিবারের চারজন সদস্যের মৃত্যু হয়েছে। প্রথমে বিষাক্ত তরমুজ খাওয়ার কারণে মৃত্যু বলে সন্দেহ করা হলেও, পরবর্তী ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষায় এমন কিছু তথ্য সামনে এসেছে যা গোটা তদন্তকে সম্পূর্ণ নতুন দিকে নিয়ে গেছে। ঘটনাটি ইতিমধ্যে মুম্বাই পুলিশ ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
কীভাবে শুরু হয়েছিল সেই রাত?
ঘটনার সূচনা গত শনিবার রাতে। স্থানীয় ব্যবসায়ী আবদুল্লাহ দোখাডিয়া তাঁর পরিবার ও নিকটজনদের নিয়ে রাতের খাবারের আয়োজন করেন। সেই নৈশভোজে মাটন পোলাও পরিবেশন করা হয়। খাওয়া-দাওয়া শেষে অতিথিরা যে যার বাড়ি ফিরে যান। তখন পর্যন্ত পরিবারের কেউই অসুস্থ ছিলেন না।
রাত প্রায় একটার দিকে আবদুল্লাহ, তাঁর স্ত্রী নাসরিন এবং দুই কিশোরী মেয়ে জয়নাব ও আয়েশা মিলে তরমুজ খান। কিন্তু ভোর পাঁচটার দিকে হঠাৎ পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটে। পরিবারের সবাই একসঙ্গে তীব্র বমি ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হন এবং দ্রুত শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে।
মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে একে একে মৃত্যু হয় পরিবারের চারজনেরই — ব্যবসায়ী আবদুল্লাহ দোখাডিয়া, তাঁর স্ত্রী নাসরিন এবং দুই মেয়ে জয়নাব ও আয়েশা। এত দ্রুত ও একসঙ্গে চারজনের মৃত্যু স্বাভাবিকভাবেই চারপাশে আতঙ্ক ও বিস্ময়ের ঢেউ তোলে।
ফরেনসিক রিপোর্টে চাঞ্চল্যকর তথ্য
মৃতদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হলে চিকিৎসকরা এমন কিছু দেখতে পান যা তাঁদেরও হতবাক করে দেয়। প্রাথমিক ফরেনসিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, মৃতদের মস্তিষ্ক, হৃদযন্ত্র ও অন্ত্রসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ অস্বাভাবিকভাবে সবুজাভ বর্ণ ধারণ করেছে।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, সাধারণ খাদ্যে বিষক্রিয়া বা ফুড পয়জনিংয়ের ক্ষেত্রে এই ধরনের পরিবর্তন দেখা যায় না। এটি কোনো শক্তিশালী রাসায়নিক বা বিষাক্ত পদার্থের প্রভাব হতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
মরফিনের উপস্থিতি: তদন্তে বড় মোড়
তদন্তে সবচেয়ে বড় চমক আসে যখন পরীক্ষায় আবদুল্লাহ দোখাডিয়ার শরীরে মরফিনের উপস্থিতি ধরা পড়ে। মরফিন একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ওপিওড ব্যথানাশক, যা সাধারণত হাসপাতালে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ব্যবহার করা হয়। সাধারণ মানুষের শরীরে এই ওষুধের উপস্থিতি অত্যন্ত অস্বাভাবিক।
তদন্তকারীরা এখন খতিয়ে দেখছেন — এই মরফিন কি চিকিৎসার প্রয়োজনে গ্রহণ করা হয়েছিল, নাকি অন্য কোনো উপায়ে, সম্ভবত পরিকল্পিতভাবে, তাঁর শরীরে প্রবেশ করানো হয়েছিল? এই প্রশ্নটিই এখন পুরো মামলার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তরমুজের সঙ্গে সম্পর্ক নেই, বলছে খাদ্য প্রশাসন
মহারাষ্ট্র রাজ্যের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (FDA) ইতিমধ্যে জানিয়েছে, মৃত্যুর সঙ্গে তরমুজের সরাসরি কোনো সম্পর্ক এখন পর্যন্ত প্রমাণিত হয়নি। মাটন পোলাও খাওয়ার পরেও পরিবারের সবাই সুস্থ ছিলেন, এই তথ্যটিও উল্লেখযোগ্য। অর্থাৎ রাতের মূল খাবারে কোনো সমস্যা ছিল না বলেই প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে।
তবে তরমুজ সম্পূর্ণ নির্দোষ কিনা, সেটি নিশ্চিত করতে আলাদাভাবে ফলটির নমুনাও পরীক্ষা করা হচ্ছে।
ভিসেরা পরীক্ষার ফলাফলের অপেক্ষা
মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে মৃতদের ভিসেরা (শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গের নমুনা) রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। এই বিশদ পরীক্ষার ফলাফল না আসা পর্যন্ত পুলিশ কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে রাজি নয়।
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, ভিসেরা রিপোর্টেই স্পষ্ট হবে ঠিক কোন বিষাক্ত পদার্থ বা উপাদান এই মৃত্যুর কারণ এবং সেটি কীভাবে শরীরে প্রবেশ করেছিল।
পারিবারিক ও ব্যবসায়িক শত্রুতার দিকও খতিয়ে দেখছে পুলিশ
শুধু খাদ্যে বিষক্রিয়ার দিকটিই নয়, তদন্তকারীরা এখন সামাজিক ও ব্যক্তিগত কোণ থেকেও ঘটনাটি বিশ্লেষণ করছেন। আবদুল্লাহ দোখাডিয়ার পারিবারিক জীবনে কোনো বিবাদ ছিল কিনা বা ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে কারো সঙ্গে শত্রুতা ছিল কিনা, সেই সম্ভাবনাও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।
এছাড়া অতিথিরা চলে যাওয়ার পর থেকে পরিবারের অসুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত সময়কালে কারো আনাগোনা ছিল কিনা বা কোনো বাইরের পদার্থ খাবারে মেশানোর সুযোগ ছিল কিনা — এই প্রশ্নগুলোও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
ইতিমধ্যে মুম্বাই পুলিশ একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করেছে এবং তদন্ত পূর্ণ গতিতে চলছে।
উপসংহার
মুম্বাইয়ের এই ঘটনাটি নিছক খাদ্যে বিষক্রিয়ার ঘটনা নাকি কোনো পরিকল্পিত অপরাধের ছায়া এর পেছনে লুকিয়ে আছে — সেই প্রশ্নের উত্তর মিলবে ভিসেরা রিপোর্ট ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের পরেই। তবে একটি সাধারণ পারিবারিক রাতের খাবার কীভাবে এত বড় ট্র্যাজেডিতে পরিণত হলো, সেই রহস্যের সমাধান এখন লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতীক্ষায় আছেন।

